ডাউনিং স্ট্রিটের ৭৭তম বাসিন্দা বরিস জনসন

সাংবাদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ২১:৩১

ছোটো বেলায় রাজা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন ব্রিটেনের ৭৭তম প্রধানমন্ত্রী আলেক্সান্ডার বরিস দে পিফেল জনসন। যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণ করা এই ব্যক্তিটির যেমন সেখানে রাজা হওয়ার সুযোগ ছিল না, তেমনি পরবর্তীকালে ব্রিটেনের নাগরিক হওয়া বরিসের সেখানেও রাজা হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু প্রধানমন্ত্রিত্ব তার কপালে জুটেছে। গত ২৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রিয় ব্যক্তি বরিস জনসন। এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটিয়েছেন সাংবাদিক থেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়া বরিস। স্ত্রী-সন্তানকে ছাড়াই তিনি ডাউনিং স্ট্রিটে কালো দরজা দিয়ে ভেতরে ঢোকেন। এলোমেলো চুলের বরিসকে নিয়ে নানা বিতর্ক এবং প্রধানমন্ত্রী হওয়াটা সুখের হলেও ভবিষ্যত্ কিন্তু নানা শঙ্কার মধ্যেই কাটবে। কারণ থেরেসা মের ভাগ্য তার কপালেও জুটতে পারে। ব্রেক্সিটই থেরেসা মেকে প্রধানমন্ত্রিত্ব এনে দিয়েছিল, আবার সেটিই প্রধানমন্ত্রিত্ব কেড়ে নিয়েছে।

 

g সাংবাদিক থেকে ডাউনিং স্ট্রিটে

ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের সাবেক কনজারভেটিভ এমপি স্ট্যানলি জনসন ও তার প্রথম স্ত্রী চিত্রকর শার্লট ফসেটের সন্তান আলেক্সান্ডার বরিস দে পিফেল জনসনের জন্ম ১৯৬৪ সালের জুনে, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কে। তার দাদার বাবা আলি কামাল একজন তুর্কি। এ কারণে নিজেকে মুসলিম উত্তরাধিকারী হিসাবে বলে থাকেন জনসন। চার ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড়ো জনসনের শৈশব কেটেছে নিউ ইয়র্ক, লন্ডন ও ব্রাসেলসে। কিংস স্কলারশিপ নিয়ে বার্কশায়ারের ইটন কলেজে পড়ার পর অক্সফোর্ডের বেলিওল কলেজ থেকে ল্যাটিন ও প্রাচীন গ্রিক ক্ল্যাসিকসে ডিগ্রি নেন জনসন। তিনি বিতর্ক সংগঠন অক্সফোর্ড ইউনিয়নেরও প্রেসিডেন্ট ছিলেন, বুলিনডং ক্লাবের সদস্য ছিলেন যেখানে তার সঙ্গী ছিলেন ডেভিড ক্যামেরনও।

ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা হিসেবে কিছুদিন কাজ করার পর জনসনের সাংবাদিকতা শুরু হয়। ১৯৮৭ সালে টাইমসে প্রতিবেদক হিসেবে যোগ দেওয়ার পর একজনের উদ্ধৃতি জাল করায় চাকরি হারাতে হয়। ডেইলি টেলিগ্রাফে জনসন ইউরোপ বিষয়ক সংবাদদাতা ছিলেন ৫ বছর। পরে ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ পর্যন্ত তিনি একই প্রতিষ্ঠানের সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯-২০০৫ সাল পর্যন্ত ‘দ্য স্পেকটেটর’ ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। টেলিগ্রাফে থাকার সময় ১৯৯৭ সালে ক্লয়েড সাউথ এলাকা থেকে হাউজ অব কমন্সে নির্বাচন করেন জনসন এবং এরপর ২০০১ সালে হেনলি অন টেমস আসনে বিজয়ী হন। সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে ২০০৭ ও ২০১২ সালে দুই মেয়াদে লন্ডনের মেয়র হন জনসন।

ব্রেক্সিট নিয়ে গণভোটের পর আসা প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবার ব্রেক্সিট নিয়ে বিরোধের জেরেই পদত্যাগ করেন। টেলিভিশন ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হলেও জনসনের রাজনৈতিক উত্থান মোটেও সুখকর ছিল না। স্পেকটেটরের একটি সম্পাদকীয় প্রকাশের জেরে তাকে লিভারপুল সিটির কাছে ক্ষমা চাইতে হয়েছিল; এক সাংবাদিকের সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনে ছায়া শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব থেকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

 

g বিয়ে ও পরিবার

জনসন প্রথমে ১৯৮৭ সালে অ্যালেগ্রা মস্টিন ওয়েনকে বিয়ে করলেও তাদের সংসার বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৯৩ সালে জনসন আইনজীবী ও ভারতের প্রয়াত সাংবাদিক ও লেখক খুশবন্ত শিংয়ের ভাতিজি মেরিনা হুইলারের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন। জনসন-হুইলার দম্পতির দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে। দুই যুগ পর গত বছর এই দম্পতির বিচ্ছেদ হয়। কিন্তু এখনো     পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। বিয়ে না করেই এখন বসবাস করছেন প্রায় ২৫ বছর কম বয়সি বান্ধবী ক্যারি সিমন্ডসের সঙ্গে। বান্ধবী যদি ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করেন তাহলে সেটা হবে অবিবাহিত দম্পতির সেখানে বাস করার রেকর্ড।

 

g চিন্তায় ব্রেক্সিট

৩১ অক্টোবরের মধ্যেই যে কোনো মূল্যে ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বিচ্ছেদ নিশ্চিত করতে চান বরিস জনসন। তিনি বলেছেন, দরকারে কোনো চুক্তি ছাড়াই এটা হবে। থেরেসা মের প্রস্তাব পুরো বাতিল করে নতুন চুক্তির খসড়া করবেন তিনি। কিন্তু ইউরোপীয় কমিশনের নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট অরসুলা ফন ডার লায়ন বলেছেন, সময় বাড়ানো গেলেও বিচ্ছেদের ব্যাপারে নতুন আলাপ হবে না। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলে দেশটিকে রাতারাতি ইইউর একক মুদ্রা বাজার ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

ইইউভুক্ত দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানিতে শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার হলে দাম বেড়ে যাবে। ইউরোপের অন্যান্য দেশে যুক্তরাজ্য কিছু বিক্রি করতে চাইলে তার উপর শুল্ক আরোপ হবে। যুক্তরাজ্যে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। ইউরোপিয়ান আদালত বা ইউরোপিয়ান পুলিশ, এরকম অনেকগুলো সংস্থা থেকে যুক্তরাজ্যকে বের হয়ে যেতে হবে। ইইউর বার্ষিক বাজেটে যুক্তরাজ্যকে কোনো                অর্থ দিতে হবে না। বর্তমানে বছরে ৯০০ কোটি পাউন্ড দিতে হয়।

 

g ঠেকানো সম্ভব?

সদ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে দেশটির পার্লামেন্টে যে চুক্তির প্রস্তাব দিয়েছিলেন সেটি অনুযায়ী বিশাল পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে যুক্তরাজ্য ২১ মাসের একটা সময় পাবে। এই সময়ের মধ্যে যুক্তরাজ্য এজন্য লাভজনক চুক্তি নিয়ে দর কষাকষির সুযোগ পেতো। কিন্তু তার প্রস্তাব পার্লামেন্টে তিন বার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এখন যদি কোনো ধরনের চুক্তি ছাড়াই হঠাত্ বিদায় নেওয়ার সম্ভাবনা এড়াতে হয় তাহলে দেশটির বিচ্ছেদের ব্যাপারে পরিকল্পনা নিয়ে পার্লামেন্টে নতুন আইন পাশ করতে হবে, ইইউর কাছ থেকে সময় নিতে সমর্থ হতে হবে অথবা ব্রেক্সিট বাতিল করতে হবে। পার্লামেন্টে থেরেসা মের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হবার পর ব্রেক্সিটের সময়সীমা ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।