যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী বেশ কিছু অপরাধের জন্য ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া অর্থাত্ তাকে ইমপিচ করা যেতে পারে। এসব অপরাধের মধ্যে রয়েছে, রাষ্ট্রদ্রোহিতা, ঘুষ নেওয়া অথবা অন্য কোনো বড় ধরনের কিংবা লঘু অপরাধ। আবার বিচার প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অভিযোগেও তাকে ইমপিচ করা যেতে পারে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অভিশংসনের বিষয়টি যেন জোরেশোরেই শোনা যাচ্ছে। গত বছরও তাকে ইমপিচ করার উদ্যোগ নিতে দেখা গিয়েছিল। যদিও সেটা বেশিদূর এগোয়নি। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে এটি আবারো আলোচনায় এসেছে। গত শুক্রবার ডেমোক্র্যাট নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসের বিচারবিভাগীয় কমিটি মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের বিষয়ে তদন্তকারী স্পেশাল কাউন্সেলর রবার্ট মুলারের তদন্তের বিভিন্ন অপ্রকাশিত তথ্য চেয়ে ফেডারেল আদালতে মামলা করেছে। গোপনীয়তা রক্ষার্থে জুরিবোর্ডে আলোচিত হয়েছে এমন সব তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিচারবিভাগীয় কমিটি তাদের আবেদনে বলেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরুর জন্য এ তথ্য লাগবে। আর এসব তথ্য চাওয়ার অধিকার কংগ্রেসের রয়েছে। যদিও মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল বলছেন, ঐ সব ডকুমেন্ট কংগ্রেসের কাছে যাওয়া উচিত হবে না।
বিশ্লেষকরা বলছেন, কংগ্রেস কমিটির এই আবেদনের অর্থ হলো ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর কথা ভাবছে। হাউস জুডিশিয়ারি কমিটির চেয়ারম্যান জেরি ন্যাডলার জানিয়েছেন, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু না হলেও তাদের উদ্যোগ সে লক্ষ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। প্রসঙ্গত, রবার্ট মুলার তার তদন্ত প্রতিবেদনে নির্বাচনে ট্রাম্প টিমের রুশ যোগসাজশের অভিযোগ থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অব্যাহতি দিয়েছেন। তবে বিভিন্ন সময় প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্তের অভিযোগ থেকে ট্রাম্পকে অব্যাহতি দেননি, আবার তাকে অভিযুক্তও করেননি।
জুডিশিয়ারি কমিটির উদ্যোগের মাত্র দুই দিন আগেই কংগ্রেসের বিচার ও গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির শুনানিতে বক্তব্য রাখেন রবার্ট মুলার। এরপর ভাবা হয়েছিল, ট্রাম্পকে অভিশংসনের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু ডেমোক্র্যাট দলের একাংশ মনে করে, মুলার তার সাক্ষ্যে এমন অনেক কথাই বলেছেন, যার ভিত্তিতে অভিশংসন শুরু করা যায়। বিশেষ করে, দলের বামপন্থি অংশ মনে করে, এ প্রক্রিয়া এখন শুরু না করলে আর কখনোই করা যাবে না। তারা খোলামেলাভাবেই হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিকে অহেতুক কালক্ষেপণের জন্য অভিযুক্ত করেছেন। পেলোসি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, তখনই এ প্রক্রিয়া শুরু করব, যখন এটি শুরু করা দরকার হবে। তার মতে, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অপরাধের যথাযথ প্রমাণ ও জনগণের সমর্থন সাপেক্ষে এই পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। এখন পর্যন্ত প্রায় ১০০ জন ডেমোক্র্যাট নেতা ট্রাম্পকে অভিশংসন করার পক্ষে সমর্থন দিয়েছেন। তবে কংগ্রেস কমিটির শুনানিতে মুলারের বক্তব্য দেওয়ার পর ট্রাম্প বিজয় দাবি করেন। তার মতে, মুলারের বক্তব্যে নতুন কিছুই পায়নি ডেমোক্র্যাটরা।
ট্রাম্পকে অভিশংসন করার বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ করা সহজ বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত একজন প্রেসিডেন্টকেও ইমপিচ করা সম্ভব হয়নি। কারণ এর প্রক্রিয়া। ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদ বা হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভস থেকে। এটি মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ। এই প্রক্রিয়া শুরুর জন্য প্রস্তাবটি সেখানে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় পাশ হতে হবে। আর সেটা পাশ হলে পরের ধাপে যাবে সিনেটে। কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট অনেকটা আদালত কক্ষের মতো, যেখানে সিনেটররা বিচারক বা জুরি হিসেবে কাজ করবেন। তারাই সিদ্ধান্ত নেবেন প্রেসিডেন্ট দোষী কি নির্দোষ।
প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দিতে হলে এই সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সিনেটরকে ইমপিচমেন্টের পক্ষে ভোট দিতে হবে। বর্তমানে হাউজ অব রিপ্রেজেনটেটিভসে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকানদের। সিনেটে বর্তমানে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩ অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটদের রয়েছে ৪৭টি। এ কারণে সিনেটে ইমপিচমেন্টের প্রস্তাব পাস হওয়ার সম্ভাবনা কম। এখন পর্যন্ত দুই জন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচমেন্ট প্রক্রিয়ার মুখে পড়তে হয়েছে। সর্বশেষ যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে এই প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। গ্রান্ড জুরির সামনে মিথ্যা হলফনামা আর বিচারকাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে। মনিকা লিউনাস্কির সঙ্গে তার গোপন প্রণয়ের কথা অস্বীকার করেছিলেন তিনি। এমনকি মনিকাকে মিথ্যা বলতেও বলেছিলেন। হাউজে ইমপিচমেন্টের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পড়েছিল। কিন্তু সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট পড়েনি। যে কারণে বেঁচে যান ক্লিনটন। অল্পের জন্য ইমপিচমেন্টের হাত থেকে রেহাই পেয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জনসন। তাকে ইমপিচমেন্টের মুখে পড়তে হয়েছিল কারণ তার প্রশাসনের যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী প্রেসিডেন্টের নীতির সঙ্গে একমত ছিলেন না। যে কারণে ঐ মন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়েছিল। এই ঘটনার সঙ্গে এফবিআইয়ের সাবেক প্রধান জেমস কোমির বরখাস্তের বিষয়টি অনেকখানি মিলে যায়। হাউজের পর সিনেটে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের ক্ষেত্রে মাত্র একটি কম পড়েছিল। যে কারণে ইমপিচমেন্টের হাত থেকে বেঁচে যান জনসন।
তবে একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছিল। তিনি রিচার্ড নিক্সন। ১৯৭৪ সালে তার বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্টের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই তিনি পদত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, প্রক্রিয়াটি শুরু হলে তাকে হয়তো প্রেসিডেন্টের পদ থেকে শেষপর্যন্ত সরিয়ে দেওয়া হতো। এই ধাপে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ইমপিচ করার ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে পূর্ণ মতৈক্য দেখা দেয়নি। যে কারণে তাকে ইমপিচ করার প্রক্রিয়া কতদূর এগোবে সেটা এখনই বলা কঠিন হচ্ছে।
