দুর্ভিক্ষরা ‘দুই ভাই’!

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০১৯, ২১:৩৫

বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা ভারতের এক প্রত্যন্ত রাজ্য মিজোরাম। এই রাজ্যের খবরাখবর আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খুব কমই আসে। এলেও তা হয়তো নেতিবাচক ঘটনার কারণে। ভারতের সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাত রাজ্যের এই একটি অবশ্য কিছুটা হলেও ব্যতিক্রম— অন্যগুলোর ন্যায় এখানে এখন বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দৌরাত্ম্য নেই। শান্তিচুক্তির বদৌলতে সত্যিই শান্তি বিরাজ করছে। এ রাজ্যের বিশেষ খ্যাতি বাঁশরাজ্য হিসেবে। মোট ভূমির প্রায় ৯১ শতাংশই বন। এর সিংহভাগ জুড়েই গাছ বলতে বাঁশের আধিক্য। মিজোরামের সংস্কৃতিই বলতে বাঁশনির্ভর। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সর্ব দক্ষিণের এ রাজ্যে অধিকাংশ ঘরই বাঁশের। এমনকি অনেক জায়গায় পানি সরবরাহের জন্যও বেছে নেওয়া হয় বাঁশের নলকে। ভারতের দ্বিতীয় কম ঘনবসতিপূর্ণ এই রাজ্যের অর্থনীতিই বলতে গেলে বাঁশনির্ভর। তবে এই প্রাকৃতিক বস্তুটি প্রায় ১১ লাখ অধিবাসীর জন্য একদিকে যেমন আশীর্বাদস্বরূপ, অন্যদিকে এ বাঁশ আবার জনগণের জন্য অভিশাপ হয়েও দাঁড়ায়। এটিকে কেন্দ্র করেই আবার মাঝে মধ্যে মুখোমুখি হতে হয় ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের। সেই দুর্ভিক্ষ আবার নিয়ন্ত্রণ করে এখানকার রাজনীতিকে। দুর্ভিক্ষের কারণ স্পষ্ট হলেও তা প্রতিহত করতে গেলে আবার মিজোরামের অর্থনীতিই ভেঙে পড়বে। বননিধন অর্থাত্ বাঁশ নির্মূল ছাড়া দুর্ভিক্ষ ঠেকানোর অন্য কোনো পন্থা এখন পর্যন্ত কেউ বাতলাতে পারেনি। গবেষণা, সেমিনার ও সিম্পোজিয়াম কম হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক গবেষকরাও সেখানে সামিল হয়ে দায়িত্ব শেষ করেন; হাঁটেন না সমাধানের পথে।

মনে প্রশ্ন জাগাটাই স্বাভাবিক যে, বাঁশ ুআবার দুর্ভিক্ষ ডেকে আনে কীভাবে? বিস্মিত করার মতোই তথ্য হচ্ছে, এই বাঁশ কিন্তু সরাসরি দায়ী নয়। খোলাসা করে বললেই বোঝা যাবে সবকিছু। প্রতি ৪৮ থেকে ৫০ বছর অন্তর মিজোরাম দুই ধরনের দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়, যার একটির নাম মাউতাম, অপরটি থিঙ্গতাম। মাউতাম নামে বিশেষ প্রজাতির বাঁশে (বৈজ্ঞানিক নাম Melocanna baccifera) বিরল ফুল ফুটলেই এমন দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। এই ফুল আবার একপ্রকার ইঁদুরের কাছে অমৃততুল্য। এর অমোঘ আকর্ষণে আশপাশের সমস্ত ইঁদুর সমবেত হয় এবং হামলে পড়ে সেসব ফুলের ওপর। যতোদিন ফুল থাকে ততোদিন তারা অন্য কিছু খাওয়ার কথা আর চিন্তাও করে না। তখন প্রজনন ক্ষমতাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। নারী ইঁদুর হালি হালি বাচ্চা দেয়। এদের সংখ্যার বিস্ফোরণের তুলনা টানলে ম্যালথাস বর্ণিত জ্যামিতিক গতিও যেন ফেল। এতেও কোনো সমস্যা হতো না, যদি মাউতামের ফুল সারাবছর ফুটত। ফুল ফোটার সময় শেষ হয়ে গেলেই বিপত্তিটা ঘটে। রাক্ষুসে ক্ষুধা নিবারণের জন্য খেতের ফসল নির্মূলের পাশাপাশি রাতারাতি নিঃশেষ করে দেয় জনগণের সঞ্চিত সব খাদ্যশস্য। ফলশ্রুতিতে যা ঘটার তাই ঘটে। বাঁশ ফলের দিকে অবশ্য এদের তেমন একটা আকর্ষণ নেই, সেগুলোয় উদরপূর্তি করে অন্য বীবররা। মিজোরামে সর্বশেষ মাউতাম ঘটেছিল ২০০৭-২০০৮-এ।

ভয়াবহ থিঙ্গতাম দুর্ভিক্ষের বিষয়টি অবশ্য আঁচ করা যায় কয়েক বছর আগেই। পাঁচ-সাত বছর আগে সিনামন বিটল বা দারুচিনি পোকা নামে খ্যাত এক ধরনের পোকার প্রাদুর্ভাব ঘটে, যেটি এখন ঘটছে। বাংলাদেশ ও ভারতের আরেক রাজ্য ত্রিপুরা সংযুক্ত মিজোরামের পশ্চিমাঞ্চলে এখন দারুচিনি পোকার রীতিমতো আগ্রাসন চলছে। মিজোরামের অধিবাসী মিজোরা এই পোকার কাছ থেকে এক ধরনের তেল সংগ্রহ করে ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহার করে। স্থানীয়রা ওষুধরূপেও এটিকে কাজে লাগায় বলে বাজারে বিক্রিও হয়। মিজোদের দৃঢ়বিশ্বাস, এই পোকা উপকারী হলেও দুর্ভিক্ষের অগ্রদূত। আগমনী বার্তা নিয়ে আসার কয়েক বছর পর রথিঙ্গ (বৈজ্ঞানিক নাম Bambusa tulda) বাঁশে ফুল আসার ফলশ্রুতিতে নেমে আসে থিঙ্গতাম দুর্ভিক্ষ। মাউতামের মতো এখানেও আসামি তীক্ষদন্তর বর্গভুক্ত প্রাণী বৃহদাকারের কালো মুষিক, যারা পুনঃস্মরণ করিয়ে দেয় হ্যামিলনের বাঁশি নামক সেই গল্পটির কথা, যেখানে মুষিকরা তছনছ করে ফেলতো সবকিছু। শেষ থিঙ্গতাম ঘটেছিল ১৯৭৭ সালে। পরবর্তীটির জন্য নির্ধারিত হয়ে রয়েছে ২০২৫ সাল কিংবা এর আশপাশের কোনো সময়।

মিজোরামের রাজনৈতিক ভাগ্যও যেনো মাউতাম ও থিঙ্গতাম দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মিজোরামের বর্তমান প্রধান বিরোধী দল সূচিত হয়েছিল ১৯৫৯ সালে, তখন যার নাম ছিল মিজো ন্যাশনাল ফ্যামিন ফ্রন্ট। ঐ বছরই মিজো হিলস (মিজোরামের তখনকার নাম) মাউতামের মুখোমুখি হয়েছিল। ভারত ও আসাম সরকারের (আসামের অধীনে মিজোরাম ছিল তখন মিজো জেলা) ঔদাসীন্যের অভিযোগ তুলে কিংবদন্তি লালদেংগার নেতৃত্বে সশস্ত্র বিদ্রোহে নেমেছিল মিজোরা। টানা ২০ বছর বিপ্লব চালিয়ে যাওয়ার পর রাজ্যের স্বীকৃতি পায় মিজোরাম। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক দল হিসেবে মেনে নেওয়া হয় মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টকে। রাজ্যের প্রথম সরকার গঠন করেছিল তারাই আর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জনগণের নিকট দেবতুল্য লালদেংগা।