এবার ওষুধের ডোজ (মাত্রা) বাড়িয়ে মশা মারার চেষ্টা করছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এর পাশাপাশি মশক নিধন কর্মীদের হাঁটার গতি আগের চেয়ে কমানো হয়েছে। তাদের ধীর গতিতে ওষুধ ছিটানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যাতে অল্প জায়গায় বেশি পরিমাণ ওষুধ দেওয়া সম্ভব হয়। তবে পরিবেশবিদ ও নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, যেখানে সরকারি সংস্থার গবেষণায় উঠে এসেছে মশার ওষুধ অকার্যকর, সেখানে ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে কতটা কাজে আসবে—এটাই প্রশ্ন। অন্যদিকে, বেশি মাত্রায় ওষুধ দিলে পরিবেশের ক্ষতি হবে। এর প্রভাবে উপকারী কীটপতঙ্গ মারা যাবে। পাশাপাশি শিশু, বয়োবৃদ্ধসহ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি রয়েছে।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, হাইকোর্টের নির্দেশে ওষুধের মাত্রা বাড়িয়ে মশা মারার কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। শুক্রবার থেকে দুই সিটির উদ্যোগে শুরু হয়েছে ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। এ পদ্ধতিতে মশা মরে কি না, চারদিন পর আগামীকাল মঙ্গলবার হাইকোর্টে রিপোর্ট জমা দেবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, শুক্রবার থেকে ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে মশা মারার ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হয়েছে। চারদিন পর এর ফলাফলের রিপোর্ট হাইকোর্টে জমা দেওয়া হবে। এরপর হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম চলবে। ওষুধের ডোজ বাড়ালে পরিবেশের ক্ষতি হবে কি না—সেটা মহামান্য হাইকোর্ট বলতে পারবেন। তারা যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন সেভাবে আমরা কাজ করছি।
তিনি আরো বলেন, ওষুধের কার্যকারিতা শতভাগ না হলেও ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ কার্যকারিতা আছে। স্থান, কাল পাত্রের উপর ওষুধের কার্যকারিতা নির্ভর করে। সব ওষুধ সব জায়গায় কাজ করবে না। পুরান ঢাকায় কার্যকর হলেও সেটি নতুন ঢাকায় সেরকম নাও হতে পারে।
জানা যায়, রাজধানীতে দুই পদ্ধতিতে মশা নিধন করে সিটি করপোরেশন। প্রথমত, এডাল্টিসাইড দিয়ে ফগিং মেশিনে নির্দিষ্ট মাত্রায় ওষুধ কেরোসিন তেলের সাথে মিশিয়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলি ছেড়ে মশা তাড়ানো হয়। আগে এ পদ্ধতিতে মশা মরলেও এখন সেটা কার্যকারিতা হারিয়েছে। অন্যদিকে লার্ভিসাইড দিয়ে ঝোপঝাড়, নালা-নর্দমা, ময়লা-আবর্জনা, জমে থাকা পানিসহ যেসব স্থানে মশার উত্পত্তি বা জন্ম ঘটে সেসব স্থানে মশার লার্ভা ধ্বংস করা হয়ে থাকে। তবে বর্তমানে এটারও কার্যকারিতা হারিয়েছে। ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছে ঢাকার মশা।
ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে রাজধানীর রমনা, ধানমন্ডি, কলাবাগান, শুক্রাবাদ এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১ এর নির্বাহী কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, ওষুধের ঘনত্ব আগের চেয়ে বাড়ানো হয়েছে। সাথে সাথে এর কার্যকারিতা বোঝা না গেলেও আশা করি ফলাফল পাবো।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক নগরপরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, ডোজ বাড়ানো মানে এর ক্ষতিকর প্রভাব আছে। সাধারণভাবেই বোঝা যায়, যে কোনো ওষুধের মাত্রাতিরিক্ত হলে সেটার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। আর সেটা যদি কীটনাশাক হয়, তাহলে শুধু কীটই মারবে না। এর প্রভাব পড়বে শিশু, বয়োবৃদ্ধ অথবা অসুস্থ মানুষের উপর।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মাহমুদ খান বলেন, ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে দিলে জীব বৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কারণ সবকিছুর সহনীয় মাত্রা আছে। এর সাথে পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্যের সম্পর্ক রয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্তের আগে অবশ্যই বৈজ্ঞানিক গবেষণার দরকার আছে। অন্যদিকে, সরকারি সংস্থার গবেষণায় যেখানে দেখা গেছে, মশার ওষুধ কাজ করছে না। সেখানে ওষুধের মাত্রা বাড়িয়ে কতটা কাজে আসবে সেটাই প্রশ্ন। যতদ্রুত সম্ভব কার্যকর ওষুধ এনে ছিটাতে হবে।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে এই মুহূর্তে করণীয় সম্পর্কে স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, মশা প্রতিরোধ করতে হলে প্রথমেই এর উত্স ধ্বংস করতে হবে। মশা প্রতিরোধের কার্যক্রম শুধু সিটি করপোরেশন-কেন্দ্রিক না হয়ে সমাজের সব শ্রেণির মানুষের গণআন্দোলনের মতো এগিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে কাউন্সিলরের নেতৃত্বে রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিদের নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে মশার লার্ভা ধ্বংস করতে হবে। এজন্য মাঠপর্যায় সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই।
