৪৭ লাখ টাকার দুই নৌ-অ্যাম্বুলেন্স সাত বছরেও চালু হয়নি

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:০৭

চারদিকে থই থই পানি, মাঝখানে ছোট্ট জনপদ। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্নখাতে অনেকটাই পিছিয়ে এলাকাটি। এমনকি সড়কপথে যোগাযোগ না থাকায় প্রায় তিনঘণ্টা নদী পাড়ি দিয়ে যেতে হয় কাছাকাছি থাকা হাসপাতালে। তাই সেই জনপদের বাসিন্দাদের জন্য দেওয়া হয়েছিল দুটি অ্যাম্বুলেন্স। সাত বছরেও সেগুলো একদিনও ব্যবহার হয়নি।

এমনকি সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও এরমধ্যে একটি কথা জানেন না দায়িত্বশীলরা। এই পরিস্থিতিতে রোদ-বৃষ্টিতে ঘাটেই নষ্ট হচ্ছে অ্যাম্বুলেন্স দুটি।

অ্যবস্থাপনা ও অপচয়ের এই চিত্র পটুয়াখালীর নদীবেষ্টিত উপজেলা গলাচিপা এলাকার। যেখানে সড়কপথে যোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। ট্রলারে চড়েই দীর্ঘ দুরুত্ব পাড়ি দেয় সেখানকার বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গলাচিপা উপজেলার দ্বীপের মতো ইউনিয়নের চারপাশে নদী। সড়কপথে যোগাযোগের কোন ব্যবস্থা নেই। দুই তিন ঘণ্টা ট্রলারে নদী পাড়ি দিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আসতে হয়। তাও আবার ৫টা পর্যন্ত ট্রলার চলে। তারপর নদী পাড় হওয়ার জন্য কিছু থাকে না। পাশের উপজেলা রাঙ্গাবালীতে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স না থাকায় ওই উপজেলার বাসিন্দারাও ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা নদীপথ পাড়ি দিয়েই গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন।

মূলত এসব চরাঞ্চলের অসহায় মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসার জন্য সরকার দুটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দিলেও সেগুলো একদিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি। ব্যবহার তো দূরের কথা, চরবাসী সেগুলো চোখেও দেখেনি এবং তারা জানেই না গলাচিপায় দুটি নৌ-এ্যাম্বুলেন্স আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপকূলীয় দুর্গত এলাকার মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতে উপজেলা হেলথ কেয়ার (ইউ. এইচ. সি) প্রকল্পের মাধ্যমে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে গলাচিপা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য একটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স দেওয়া হয়। ব্যবহার না হওয়ার অকেজো হয়ে পড়ে আছে ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে আধুনিক সুযোগ সুবিধা সংবলিত অ্যাম্বুলেন্সটি। অন্যটি ২০১৮ সালে স্থানীয় সরকার বিভাগ ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে দিয়েছিল। সেটিও একদিনের জন্যও ব্যবহার করা হয়নি।

২০১৮ এবং ২০১৯ সালে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দুইটি নৌ-অ্যাম্বুলেন্স পাওয়ার পর থেকে গলাচিপায় পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সুলিজের মসজিদের ঘাটে (ইউ. এইচ. সি) প্রকল্পেও আওতায় দেওয়া নৌ-অ্যাম্বুলেন্সটি পড়ে আছে। গলাচিপা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের লঞ্চঘাটে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেওয়া নৌ-এ্যাম্বুলেন্সটি পড়ে আছে। এতে অ্যাম্বুলেন্স দু’টির মেশিনসহ মূল্যবান যন্ত্রাংশ অকেজো হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গাবালী উপজেলা এবং গলাচিপার চরকাজল-চরবিশ্বাস ইউনিয়নের প্রতি মাসে  হাজারো রোগী গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আসেন। নৌ-এ্যাম্বুলেন্স দুটি দেওয়ার পর চালকও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলায় এবং অ্যাম্বুলেন্সের তথ্য না পাওয়ায় এর সুফল ভোগ করতে পারেনি চরাঞ্চলের মানুষ।

অথচ রাঙ্গাবালী উপজেলায় প্রায় ২ লাখ মানুষ  এবং গলাচিপা উপজেলা ৫০ হাজার বসবাস করেন। যারা জরুরি মুহূর্তে যারা ট্রলার কিংবা অন্য কোনো মাধ্যম ব্যবহার করে নিকটবর্তী হাসপাতালে যান।

চরবিশ্বাস ইউনিয়নের বটতলা এলাকার বাসিন্দা ফাহিম হাওলাদার জানান, ‘নৌ-অ্যাম্বুলেন্স এটা কি জিনিস, সেটাই তো চিনি না, এর সুবিধা কীভাবে পাবো..?’

চরকাজল ইউনিয়নের চর কপাল ভেড়া গ্রামের বাসিন্দা হাতেম আকন জানান, বিকেল ৫টার পরে ট্রলার বন্ধ হয়ে যায়। বর্ষায় ছোট ট্রলার চলাচলের কোনো সুযোগ নেই। হাসপাতালে যেতে সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়। সরকারি নৌ-এ্যাম্বুলেন্স আছে দুইটা, এটা তো কখনো রোগী নিয়ে চলাচল করতে দেখিনি। আমাদের এলাকার কারো উপকারে আসেনি। যদি চালু থাকতো তাহলে আমাদের উপকার হতো।

চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরবাংলার ছালমা খাতুন বলেন, এখান থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যেতে ৫ ঘণ্টা নদীপথে পাড়ি দিতে হয়। নৌ-এ্যাম্বুলেন্স থাকলে হয়তো এক ঘণ্টার মধ্যে যাওয়া যেতে। তাহলে মুমূর্ষ রোগীদের যাত্রাপথেই মারা যাওয়া লাগতো না। 

তরুণ রাজনীতিবিদ ও সমাজ সেবক শাহাদাৎ হোসেন বুলবুল জানান, সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীনতায় নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের সুফল ভোগ করতে পারেনি এলাকার মানুষ। এই খাতে বিপুল পরিমাণ টাকা অপচয় হয়েছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তিনি।

নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালক টিটোন কবিরাজ বলেন, ‘আমি এক দিনের জন্যও নৌ-অ্যাম্বুলেন্স চালাই নাই। ওটার মেশিনে সমস্যা ছিল।’ 

স্থানীয় সরকার বিভাগের উপজেলা ডেভলপমেন্ট ফেসিলিটেটর স্বপন কুমার গনপতি জানান, এই প্রজেক্টটি বাস্তবায়ন করেছে উপজেলা পরিষদ। উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউএনও, উপজেলা প্রকৌশলী এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নৌ-অ্যাম্বুলেন্স কেনা হয়েছে। ফান্ড দিয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগ। 

গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসার ডা. মো. মেজবাহ উদ্দিন জানান, নৌ-অ্যাম্বুলেন্সের চালকের চাকরি ২০২৪ সালের জুলাইতে শেষ হয়েছে। আমাদের দুইটা না একটা নৌ-অ্যাম্বুলেন্স আছে। দুটির কথা আমার জানা নেই। যেটা আছে সেটা আমাদের ইউ. এইচ. সি দিয়েছেন। অন্যটা আমার জানা নেই। যেটা আছে সেটা মেরামতের বরাদ্দও নেই, তেলের জন্য বরাদ্দ নেই। তাছাড়া এটার গতি কম, তেল খায় বেশি। এগুলো মানুষজন পছন্দ করে না। 

পটুয়াখালী জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. খালেদুজ্জামান বলেন, আমি নতুন; তাই বিষয়টি ডিটেইলস জেনে জানাতে হবে। খোঁজ নিয়ে দেখছি।

ইত্তেফাক/এপি