বিষাক্ত ধোঁয়া উড়ছে কেমিক্যাল গোডাউনে, বন্ধ আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৫, ২১:১০

রাজধানীর রূপনগরের শিয়ালবাড়িতে অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে যাওয়া কসমিক ফার্মার গোডাউনে থাকা কেমিক্যালের স্তূপ থেকে ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। এই ধোঁয়া বিষাক্ত হওয়ায় আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। স্থানীয়দের নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে এবং মাস্ক পরিধান করার অনুরোধ করেছে ফায়ার সার্ভিস। অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শন করেছেন কেমিক্যাল কর্পোরেশনের বিশেষজ্ঞ টিম। সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ।

এদিকে, নিহত ১০ মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিন মেডিসিন বিভাগের প্রভাষক ডা. আয়েশা পারভীন। এসময় সাথে ছিলেন সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব পরীক্ষক শুভ জয় বৈদ্য। এর আগে, বুধবার ৬টি লাশের ময়নাতদন্ত হয়েছে।

এদিকে তবে পুড়ে অঙ্গার স্বজনের লাশ বুঝে পেতে বৃহস্পতিবারও মর্গে এসেছেন পরিবারের লোকজন। লাশ বুঝে না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা। তবে সিআইডি বলছে, ডিএনএ পরীক্ষা শেষে এবং নমুনা ম্যাচ করার পর মরদেহগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। 

সিআইডির ফরেনসিক ল্যাব পরীক্ষক শুভ জয় বৈদ্য বলেন, বৃহস্পতিবার ১০টি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য হাড় ও টিস্যু সংগ্রহ করা হয়েছে। বুধবার ৬টি মরদেহের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিলো। এছাড়া মরদেহ দাবিদাররা মালিবাগ সিআইডি ল্যাবে গিয়ে নমুনা জমা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মর্গ থেকে নমুনা বুঝিয়ে দেয়ার পর ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে। পরিচয় শনাক্তে সিআইডি’র ফরেনসিক ল্যাবে কর্মরতরা দিনরাত কাজ করছেন।

আজ শুক্রবার বন্ধ থাকার কথা থাকলেও শুধুমাত্র ১৬টি লাশের পরিচয় শনাক্তের জন্য আমাদের ল্যাব চালু থাকবে। অন্যান্য কাজ বন্ধ রেখে লাশের পরিচয় শনাক্তকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তবে কতদিন সময় লাগতে পারে সেটি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। অনেকেই পায়ের নুপুর দেখে মেয়েকে শনাক্ত করেছেন, কেউ বা অন্য উপায়ে শনাক্ত করেছেন, তাদের লাশ বুঝিয়ে দিতে সমস্যা আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এভাবে একমাত্র জেলা প্রশাসক লাশ দিতে পারেন। কেউ নিতে চাইলে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন। কিন্তু আমরা (সিআইডি) ডিএনএ নমুনা পরীক্ষার পর এবং সেটি নমুনা নেয়া স্বজনদের সঙ্গে ম্যাচ করার পর নিশ্চিত হয়ে হস্তান্তর করবো।

ময়নাতদন্তের আগে মরদেহগুলোর সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন রূপনগর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মুখলেসুর রহমান লস্কর। তিনি বলেন, ১০ মরদেহের মধ্যে ৭ জন অজ্ঞাতনামা। যাদের বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত। অজ্ঞাতদের মধ্যে ১ জন নারী ও ৬ জন পুরুষ। বাকিরা হলেন- শরিয়তপুরের নড়িয়ার উপজেলার পূর্ব হালইসার গ্রামের মুছাই দেওয়ানের মেয়ে মুক্তা বেগম (৩০)। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার রাজাপুর গ্রামের রতন মিয়ার মেয়ে ফারজানা আক্তার (১৫)। নেত্রকোনার মদন উপজেলার পদমশ্রী গ্রামের সনু মিয়ার মেয়ে ফারজানা আক্তার (১৬)। এছাড়া ২/৩টি মরদেহের একাধিক দাবিদার পাওয়া গেছে। সব মরদেহ ও দাবিদার থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। 

পুড়ে অঙ্গার প্রিয়জনের লাশ বুঝে নিতে বৃহস্পতিবারও ঢামেক মর্গে এসেছেন স্বজনরা। তাদের মধ্যে একজন নাঈম। তার স্ত্রী মুনা আক্তারের (১৬) লাশ নিতে মর্গে আসেন তিনি। সঙ্গে আসেন অন্যান্য আত্মীয় স্বজনও। সারাদিন ঘুর ঘুর করতে থাকেন মর্গে। মর্গ কর্তৃপক্ষ, সেখানে দায়িত্বে থাকা পুলিশ সহ যাকে পাচ্ছেন তাকেই জিজ্ঞাস করছেন, আজ (বৃহস্পতিবার) লাশ দিবে না? কবে দিবে, আর কতদিন লাগতে পারে? কিন্তু এর সদুত্তর কেউ তাকে দিতে পারেননি। এতেই বিচলিত, বিমূঢ় ও ক্লান্ত শ্রান্ত নাঈম।
 
ক্ষোভ প্রকাশ করে নাঈম বলেন, তিন দিন হয়ে গেলো এখনো লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি। কবে নাগাদ শনাক্ত হবে এবং আমরা লাশ বুঝে পাবো, এর সুনির্দিষ্ট তারিখও জানাতে পারছে না কেউ। বর্তমান প্রযুক্তির যুগে লাশ শনাক্তেই এত সময় লাগে!

এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন নিহত মাহিরা আক্তারের (১৪) বড় বোন সানজিদাও। তিনিও পরিবারের অন্যান্য স্বজনদের নিয়ে মাহিরার লাশ বুঝে পেতে ঘটনার দিন থেকে মর্গে আসছেন। আসলেই বলা হচ্ছে, এখনো পরিচয় শনাক্ত হয়নি। হইলে কল দিয়ে জানানো হবে। এদিকে অস্থিরতায় আমাদের দিন কাটছে। একে মর্মান্তিক ঘটনায় বোনকে হারালাম, এর মধ্যে লাশ পেতে জটিলতা। 
মেয়ে আসমার লাশ নিতে আসেন বাবা নয়ন মিঞা ও অন্যান্য স্বজনরা। পরে তাদের জানানো হয়, মালিবাগ সিআইডি কার্যালয়ে গিয়ে নমুনা দিতে। এরপর সেখান থেকে সিআইডিতে ছুটে যান তারা। এসময় নয়ন মিঞা বলেন, ভাই, আজই কি লাশ দিবে? তখন তাকে উপস্থিত লোকজন বুঝিয়ে বলেন এবং সিআইডিতে পাঠান।

এদিকে কেমিক্যাল গোডাউনের আগুন একদিন পর নিয়ন্ত্রণে আসলেও ৪৮ ঘণ্টা পরও সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা সম্ভব হয়নি। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত গোডাউন থেকে ধোঁয়ার কু-লী বের হতে দেখা গেছে। পুরোপুরি নির্বাপণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইউনিট। 
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা জানান, বুধবার বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে প্রায় ২৮ ঘণ্টা পর কেমিক্যাল গোডাউনের আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ করা যায়নি। বৃহস্পতিবারও ঘটনাস্থল থেকে ধোঁয়ার কু-লী উড়ছে। আগুন সম্পূর্ণ নির্বাপণ আনতে চারটি ইউনিট কাজ করছে। তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নতুন করে আগুন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা নেই। 
সরজমিনে দেখা যায়, সুনশান নীরবতা বিরাজ করছে এলাকাটিতে। নেই বাণিজ্যিক হাকডাক। বন্ধ রয়েছে আশপাশের দোকানপাট। কেমিক্যালের বিষাক্ত গ্যাসে যাতে অন্যদের ক্ষতি না হয় তাই আশপাশের দোকানপাট আপাতত বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। তবে স্থানীয় উৎসুক মানুষের এখনো কিছুটা ভিড় রয়েছে। তারা জানার আগ্রহ করছেন, ভেতরে (অগ্নিকান্ডস্থল ভবনের) কি অবস্থা। তবে সেখানে কাউকে যেতে দিচ্ছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা বলছেন, কেমিক্যাল বিস্ফোরণে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে। গোডাউনে কেমিক্যালের ঝাঁঝালো গন্ধ এখনো রয়েছে। ভেতরে কেমিক্যাল রাখার পাত্র, বিভিন্ন জিনিসপত্র এবং কেমিক্যাল পুড়ে ভস্মীভূত হয়ে গেছে। পোড়া কেমিক্যালের লাভা স্তূপ আকারে জমা হয়েছে। সেখান থেকে বিষাক্ত ধোঁয়া বের হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞ টিমের ঘটনাস্থল পরিদর্শন

বৃহস্পতিবার অগ্নিকান্ডস্থল পরিদর্শন করেছেন তিন প্রতিষ্ঠানের একটি বিশেষজ্ঞ টিম। তারা হলেন- বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সিনিয়র জিএম মনজুর রেজা নেতৃত্বে ৪ জনের টিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের অধ্যাপক জিল্লুর রহমান এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সৈয়দ আহমেদ কবীরসহ ২ জন। বিশেষজ্ঞ দল ফায়ার সার্ভিসের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে। 

পরিদর্শন শেষে ঘটনাস্থলে সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কেমিকেল ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন (বিসিআইসি) সিনিয়র জিএম মনজুর রেজা বলেন, গার্মেন্টসেও পোশাক তৈরির কেমিক্যাল ছিল। কেমিক্যাল গোডাউন থেকে ধোঁয়া বের হলেও পরিমাণ কমে আসছে। কাছাকাছি গেলে কেমিক্যালের গন্ধ এখনো পাওয়া যায়। ফায়ার সার্ভিস দ্বিতীয় তলা পরিষ্কার করেছে। নিচ তলাও পানি দিয়ে পরিষ্কার করছে। তিনি বলেন, এটি মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ। এটি আবাসিক এলাকা। এখানে যে ধরনের শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, সেগুলো এই আবাসিক এলাকায় হওয়ার কথা নয়। এদের ছাড়পত্র আছে বলেও মনে হয় না। ঢাকা শহর পরিকল্পনা মাপিক হয়নি। হইলে এমন ঘটনা ঘটতো না। এখান থেকে উত্তরণে সময় লাগবে। বর্তমানে নতুন বিল্ডিং হলে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র নিতে হয়। কিন্তু আগে বহু বিল্ডিং গড়ে উঠেছে সেগুলোতে দুর্ঘটনার ফলে ভয়াবহ দুর্ঘটনার ঘটনা ঘটছে। এক্ষেত্রে সতর্ক না হলে দিন দিন দুর্ঘটনা বাড়বে। এছাড়া কেমিক্যাল গোডাউনে উদ্ধার অভিযানে ফায়ার সার্ভিসের সাথে যোগ দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিশেষায়িত টিম। 

ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা জোনের সহকারী পরিচালক মো. নজমুজ্জামান বলেন, কেমিক্যালের আগুন অন্যান্য আগুনের মতো নয়। আমাদের টিম কিছুক্ষণ পর পর ভেতরে ঢুকছে এবং কেমিক্যাল বের করার চেষ্টা করছে। সাধারণ আগুন নির্বাপণের মতো নয়, কেমিক্যালের আগুন যেভাবে নির্বাপণ করা উচিত সেভাবে কাজ করা হচ্ছে। যে অবশিষ্টাংশ আছে সেখান থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। এই ধোঁয়া অত্যন্ত বিষাক্তকর। তাই এলাকাবাসীসহ সকলকে নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখার অনুরোধ করা হয়েছে। 

তদন্ত কমিটি

এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল তাজুল ইসলামকে প্রধান করে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) রাসায়নিক প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ডঃ মোঃ ইয়াছির আরাফাত খানকেও রাখা হয়েছে। গঠিত কমিটি অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাতসহ সবকিছু তদন্ত করে বের করবেন। তবে কমিটিকে কত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে সেটি জানানো হয়নি। এর আগে, বুধবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব লস্কার তাজুল ইসলামকে আহ্বায়ক করে অগ্নিকাণ্ডে কারণ নির্ণয়, দায়দায়িত্ব এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের জন্য সাত সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

ইত্তেফাক/এমএএস