চা-শ্রমজীবী নারীদের অধিকার নিশ্চিতে মাঠে নেমেছেন গীতা

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ২১:৩০

দেশের চা-বাগানের শ্রমজীবী সবাই নারী। চা শিল্পের চালিকা শক্তি হিসেবে  সঞ্চার করেছে নারীর শ্রমের দ্বারা। অথচ চা শিল্পের বাইরে বহু মানুষ বিভিন্ন ধরণের সুযোগ-সুবিধা ও ব্যবসাপাতি গড়ে লাভবান হলেও, মূল ধারার চা-শ্রমজীবী নারীরা শূন্য হাতে পরে আছে। নারীর শ্রমের মূল্যায়ন করা হয় না। ওদের সেবায় নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের জন্য কাজ করে যাচ্ছি। এমনি ব্যক্ত করেছিলেন মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের ইসলামপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা গীতা রানী কানু।

তিনি নিজেও একজন চা জনগোষ্ঠী। কুরমা চা বাগানে বাসিন্দা গীতা তেতাল্লিশ বসন্তে এসেও বিয়ে করেননি। গরীব-দুঃখীদের ঘরে ঘরে খাবার নিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন। কখনও অসুখ-বিসুখের ক্ষণে চিকিৎসা সেবা করে দিয়েছেন। আবার কখনো নারীদের শ্রমের অধিকার নিশ্চিত করতে সংগ্রামী আন্দোলনে ফুঁসে উঠেছেন। প্রয়োজনে গীতা রাণী নারীর অধিকার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উপজেলা ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন করেছিলেন দুইবার। গড়ে তুলেছেন শক্ত সংগঠন  ‘বাংলাদেশ চা- শ্রমিক নারী ফোরাম’। যেখানে রয়েছে ৫ হাজারের অধিক চা-জনগোষ্ঠীর নারী।  

কথা হলে সমাজসেবী গীতা রানী কানু মহিলা অঙ্গনকে বলেন, আমি শৈশবে দেখেছি আমার বাবা কিভাবে মানব সেবায় নিজেকে জড়িয়ে ছিলেন। বাবা তার কোম্পানির খাদ্য গোপনে নিয়ে আসতেন অনাহার মানুষদের জন্য। তার এমন চিন্তা কাজ-কর্ম আমাকে প্রকৃত মানুষ হতে প্রভাবিত করেছে। আর মা নারীর অধিকারের নিশ্চিত করতে কিভাবে রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়াতে হয় তারও প্রভাব আমার উপরে ছিলো। 

তিনি বলেন, কিশোরী বয়স থেকে প্রায় ১৭ বছর নিজে দোকানদারী করেছি। সেই সময় মানুষের অভাব কি বুঝতে পেরেছি। এক পর্যায়ে আমি অনাহারে অভাবের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে খাবার দিয়েছি। অসুখ-বিসুখে  সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করে দিয়েছি। যখন দেখলাম চা জনগোষ্ঠীর নারীরা এতো শ্রম দিয়ে সঠিক মজুরি পাচ্ছে না। সেই থেকে এলাকার মানুষের সাথে পরামর্শ করে সংগঠন সৃষ্টি করি। নাম রাখা হয়েছিল  ‘বাংলাদেশ চা - শ্রমিক নারী ফোরাম’। এই সংগঠনের নারীদের কিভাবে নিজেদের অধিকার আদায়  নিশ্চিত করতে হয়, কীভাবে দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নে রুখে দাঁড়াতে হয়। এসব ছাড়াও স্ব নির্ভরশীল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিভিন্ন ধরণের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। 

গীতা বলেন, ২০১৪ সনে আমি উপজেলা নির্বাচনে ভাইস চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে ৪১ হাজার ভোট পেয়েও ষড়যন্ত্রে শিকার হয়েছি। এরপর ২০২৪ সনে আবার নির্বাচন করেছিলাম, কিন্তু সেখানে একই রকম দশা। এর আগে  ২০০৭-২০০৮ সালে আমি চা জনগোষ্ঠী নারীদের নিয়ে থাল-বাসনের হরতাল ডেকেছি। আমার এমন উদ্যোগে প্রায় ৭০/৮০ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছিল। তখন প্রতিকূলতার ডালপালা শুরু হলো। 

আমার বিপক্ষ লোকেরা বলল যে, নারী নেতৃত্ব মানি না। তবুও আমি দমে যায়নি। দেশের প্রথম চা শ্রমিকদের নিয়ে ২০১৮ সনে আমি নির্বাচন করেছি। সেখানে আমি বাংলাদেশ চা শ্রমিক সংগঠনে প্রথম নির্বাচিত সম্পাদক হয়েছি। ভবিষ্যতে ইচ্ছে আছে, নারীদের নিয়ে তাঁত শিল্পের কর্মসংস্থানের প্রতিষ্ঠিত করার। 

এক প্রশ্নের জবাবে গীতা আরও বলেন, আমি ক্ষোভে সব ছাড়তে চেয়েছিলাম। কিন্তু মানুষের কান্না আবার আমাকে কাছে টেনে নিলো, গরীব মানুষ না খেয়ে ধুকে ধুকে মারা যাবে। আর আমি এটা কিভাবে দেখবো। চা শিল্পের নাম ভাঙিয়ে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান বহু অর্থ গড়ে তুলেছে। রেমিট্যান্স পাচ্ছে। অথচ এই শিল্প চা শ্রমিকের রক্তে-মাংসের পরিশ্রমের ফল। আমরা কী আজীবন শূন্য হাতে পরে থাকবো?  এজন্য আমি শুধু ওদের জন্য ফের নির্বাচনে অংশ নেবো।

 
ইত্তেফাক/এনএ

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন