আ জ ম সাইফুর রহমান
অ্যাডিস মশা, ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে গণমাধ্যমে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে, আর নতুন করে কিছু আলোচনা করার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। কিন্তু এত আলোচনা সত্ত্বেও ডেঙ্গুর বিস্তার এবং মৃত্যুহার বেড়েই চলেছে। অতএব, আর উপদেশ নয়, অ্যাডিস মশার নিধনযজ্ঞে প্রায়োগিক দিক নিয়েই বেশি আলোচনা করা আবশ্যক। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানী শহর ঢাকায় ডেঙ্গু প্রতিরোধের প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো শতভাগ কার্যকর করা সত্যি বড়ো কঠিন। মনে করা হয়, ঢাকা শহরে ভাসমান মানুষকে নিয়ে প্রতিদিন প্রায় তিন কোটি লোকের সমাগম ঘটে। ফলে, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব এসবে স্বচ্ছ পানি দূর করা প্রায় অসম্ভব। বাড়ির মালিক, ভাড়াটিয়া সকলেই শতভাগ সচেতন হননি। ফলে, পরিত্যক্ত টায়ার, ডাবের খোসা দূর করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাসা থেকে ময়লা পরিষ্কার করা হলেও বাড়ির পাশে, চিকন গলিতে পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের দিয়ে পরিচ্ছন্ন ঢাকা নগরী গড়ে তোলা এখনো সম্ভব হয়নি। সরকারের সহযোগিতা তাদের আরো প্রশিক্ষণ প্রদান একান্ত জরুরি। এদিকে শোনা যাচ্ছে, সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে ফগিং মেশিনে যে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে- তাতেও নাকি ভেজাল। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে তাহলে পথে পথে কেরোসিন ছিটিয়ে কী লাভ? যারা এসব দুষ্কর্মের সঙ্গে জড়িত তাদের কঠোর শাস্তিবিধান এবং প্রকৃত ওষুধ নিয়মিত ছিটানোর ব্যবস্থা করা নগরপিতাদের নৈতিক কর্তব্য। আমরা চাই না আর এক জন নাগরিকও ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যুবরণ করুক। কারণ, দেশের ভবিষ্যত্ আমাদের যুব সমাজ। তাদের অনেকেই মেধাবী সন্তান। এসব তরুণ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হোক এটা আমাদের কাম্য নয়। এখন আসি বাসার ভেতরের সতর্কতা সম্পর্কে। মশার কয়েল জ্বালানো, ওষুধ স্প্রে করার ক্ষেত্রেও আতঙ্ক। দুটো ব্যবস্থাই নাক দিয়ে বিষ টানার মতো। এবার আসা যাক, মশারি টানানোর কথা। যেহেতু অ্যাডিস মশা দিনেও কামড়ায় সেহেতু দিন-রাত মশারির ভেতরে থাকা—এটা কি সম্ভব? আমাদের তো হাটবাজার, শিক্ষালয়, অফিস-আদালতে, এমনকি ওয়াশ রুমেও যেতে হবে। মশারি নিয়ে তো এসব স্থানে যাওয়া যাবে না। অতএব, সমস্যাগুলোর সমাধান তিনটি।
প্রথমত- ফগিং মেশিনে মশক নিধনকল্পে জরুরি ভিত্তিতে নির্ভেজাল ওষুধ সরবরাহ করা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, বাসা-বাড়ি, অফিস-আদালতের চারদিকে স্প্রে করা।
দ্বিতীয়ত- পরিচ্ছন্ন কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি করা, তাদের আরো প্রশিক্ষিত করা, বাড়ি এবং ব্যবসায়ীদের আরো সচেতন করা এবং অবহেলাকারীদের শাস্তির বিধান রাখা। মহল্লাগুলোতে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপন করা।
তৃতীয়ত- বাসার ভেতরে কোন ওষুধটি স্প্রে করা নিরাপদ—তা জনগণকে অবহিত করা। আমার শেষকথা একটাই, আমরা চাই না ডেঙ্গু জ্বরে আর একটি প্রাণও ঝরে যাক। আমার উদ্বেগ দেশের তরুণ সন্তান তথা আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য। কারণ, ওরাই তো দেশের ভবিষ্যত্ কর্ণধার। একসময় দেশে কলেরা, বসন্ত, ম্যালেরিয়া মহামারি রূপ ধারণ করত। এখন আর তা নেই। অতএব, আশাকরি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অ্যাডিস মশাও নির্মূল হতে বাধ্য।
মনে করি, মশা নির্মূলে সহায়ক এমন একটি স্প্রে বাসার অভ্যন্তরে ছিটানোর জন্য জনগণকে অবহিত করা এবং দিন-রাতে কয়বার এবং কোন কোন সময়ে স্প্রে করলে নাগরিকগণ নিরাপদ থাকতে পারেন—সে সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করা প্রতিটি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর (ওয়ার্ড কমিশনার) ভবন থেকে এ ওষুধগুলো স্বল্পমূল্যে বিক্রয় করা এবং ব্যবহার বিধি সম্বলিত লিফলেট বিলি করা। আমাদের প্রাণপ্রিয় রাজধানী ঢাকা সম্পূর্ণ মশকমুক্ত হোক—এটাই আমাদের একান্ত কামনা। এ প্রক্রিয়ার বাস্তবায়ন কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। এক সময় আমাদের দেশে মশকবাহী ম্যালেরিয়া মহামারিরূপে দেখা দিত। আশা করা যায়, আমরা অ্যাডিস মশা নির্মূল করে ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া ঝেটিয়ে তাড়াতে পারব। তাই, ঢাকা উত্তর এবং ঢাকা দক্ষিণের মেয়রদ্বয় নগরবাসীকে মশকমুক্ত নগরী উপহার দেবেন এবং নগরবাসীর অন্তরে নিজেদের আসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন—একজন নাগরিক হিসেবে এটাই আমার কাম্য।
আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন এ কারণে যে, এবারের ডেঙ্গু পূর্ববর্তী সময়ের ডেঙ্গুর উপসর্গ থেকে ভিন্ন আঙ্গিকে আবির্ভূত হয়েছে। আমরা জানতাম প্রচণ্ড হাড় ব্যথা, উচ্চ মাত্রার জ্বর (১০৫-১০৬ ডিগ্রি পর্যন্ত), দ্রুত রক্তের প্লাটিলেট কমা, মাথার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলার অনুভূতি, চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করা, অস্বাভাবিক শারীরিক দুর্বলতার কারণে হাত কাঁপা, জিহ্বায় মারাত্মক রকমের অরুচি, এগুলোই ডেঙ্গু জ্বরের লক্ষণ বা উপসর্গ। কিন্তু এবছর এক দিনের জন্য ১০০ ডিগ্রি জ্বর থেকেও ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু পাওয়া যাচ্ছে। এমতাবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার সময়-সুযোগ মোটেও থাকছে না। আমরা দেখেছি ইতিমধ্যে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং দেশের ভবিষ্যত্ কর্ণধার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এ কারণে আমরা নগরবাসী অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা এবং মৃত্যুর হার ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে। অ্যাডিস মশার বিস্তার ঠেকানো প্রয়োজন একথা নিঃসন্দেহে সত্য। কিন্তু ইতিমধ্যে অ্যাডিস মশার বংশবিস্তার যতটা ঘটেছে, তার ফলে অ্যাডিস মশার ধ্বংস সাধনে যুদ্ধ ঘোষণা করা একান্ত জরুরি।
সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত একটি খবর হচ্ছে, চীন তার দেশের দুটি দ্বীপের অ্যাডিস মশা শতকরা ৯৫ ভাগ ধ্বংস করতে পেরেছে। গণমাধ্যমের আর একটি খবর হচ্ছে আফ্রিকা ডেঙ্গু জ্বরের একটি ভ্যাক্সিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে—যা প্রয়োগ করলে পূর্বে যাদের ডেঙ্গু জ্বর হয়েছে তাদের আর এই জ্বর হবে না। আমরা আশা করি সরকার এদিকে অবশ্যই নজর দেবে। আমাদের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারগণকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশ পাঠিয়ে অথবা বাইরে থেকে বিশেষজ্ঞ ডাক্তার আমাদের দেশে আমন্ত্রণ জানিয়ে আমাদের দেশের ডাক্তারদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেবেন—যাতে করে মশামুক্ত বাংলাদেশ এবং মশামুক্ত রাজধানী ঢাকা দেশবাসীকে উপহার দেবেন। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আমাদের দেশের মেধাবী ডাক্তারগণ সহজেই বিদেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের মেধা যুক্ত করে উন্নততর ভ্যাক্সিন তৈরি করতে পারবেন এবং দেশকে ডেঙ্গুমুক্ত করতে পারবেন।
n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা
