নতুন পরাশক্তির উত্থান এবং ট্রাম্পের রাজনীতি

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৬

বোরহান উদ্দীন

বিশ্বরাজনীতি একটি প্রবহমান পানির ধারার মতো। এ রাজনীতির এক দিকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে নিজের স্বার্থে সে অবশ্যই তার সর্বাধিক কল্যাণের পথে যাত্রা শুরু করবে। ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্ব রাজনীতিতে এভাবে নানামুখী প্রবাহ ও মেরুকরণের সৃষ্টি করেছে। তবে সুপারপাওয়ার দেশ হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্প তার শক্তি বৃদ্ধিতে কতটুকু সফলতা অর্জন করেছে সেটার থেকেও বড় ব্যাপার হলো ট্রাম্প যুগে তার প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো ক্ষমতা বৃদ্ধিতে কতটা সহায়তা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে বিভিন্ন দেশের ওপর একটার পর একটা নিষেধাজ্ঞা জারি করছে, তাতে নয়াশক্তির উত্থানে মুখিয়ে থাকা রাষ্ট্রগুলো সুযোগ গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক।  মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ট্রাম্প যে নোংরা রাজনীতির খেলা শুরু করেছে, সেটা যে নয়া বিশ্ব ভালোভাবে নিচ্ছে না—তা দিন দিন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বেশ কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার চালানো ধ্বংসলীলা ও বর্তমানে ইরানের ওপরে নিষেধাজ্ঞার মতো বিবেচনাহীন নীতির বিপরীতে চীন সৌহার্দের হাত বাড়িয়ে তার ‘সিল্ক রোড’কে একেবারে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত করে চলেছে। অপরদিকে, এশিয়া খুব দ্রুত বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হতে যাচ্ছে, এটাতে কোনো সন্দেহ নেই। এশিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মূল শক্তির লড়াইয়ে থাকবে চীন, ভারত, পাকিস্তান ও জাপান। জাপান যুক্তরাষ্ট্রের ছায়াতলে থাকায় তারা প্রভাব বিস্তারের দৌড়ে সফল হবে বলে মনে হয় না। অপরদিকে, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপসহ অন্যান্য রাষ্ট্রের ওপর ভারতের রাজনৈতিক প্রভাব পরিলক্ষিত হলেও অর্থনৈতিক রাজনীতিতে চীন নিশ্চিত এগিয়ে থাকবে। সাম্প্রতিক সময়ে মিয়ানমারের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব বেশ স্পষ্ট। দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের যে প্রচ্ছন্ন প্রভাব পরিলক্ষিত হতো, ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পরেই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের মাধ্যমে তার পরিসমাপ্তি ঘটেছে। ভারতকে কব্জা করতে তাকে এখন বেশ বেগ পোহাতে হবে। কারণ, ভারত যেখানে বিশ্বে নিজেদের পরাশক্তি বলে জানান দিতে প্রস্তুত, সেখানে ‘কথিত বন্ধু’ পরাশক্তির উপস্থিতি কেন সহ্য করবে? সাম্প্রতিক সময়ে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ক্রয় করেছে। যার মধ্যে আছে সাবমেরিন, জেট বিমান, জাহাজ ও ট্যাংকসহ অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র। যেখানে শুধুমাত্র আকাশ প্রতিরক্ষার জন্য এস ফোর হান্ড্রেড কিনতে ভারতের খরচ পড়ছে ৫০০ কোটি ডলার, যা লেনদেন হবে দেশীয় মুদ্রায়। ফলে ডলারের ব্যবহার থাকছে না। আমেরিকা এটা কখনোই ভালো চোখে দেখবে না। ভারত খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় পড়তে পারেন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য হটিয়ে দক্ষিণ এশিয়াকে আরো নিরাপদ করে তুলল আসন্ন পরাশক্তির জন্য। আর এসব যেন চীনের কাছে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি পাওয়ার মতো। আমেরিকার প্রভাব থেকে দক্ষিণ এশিয়া মুক্ত হলো। সুতরাং, দক্ষিণ এশিয়ায় চীন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে।

এ কথা মনে রাখতে হবে যে, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র সক্ষমতার দিক দিয়ে যতই সমান্তরালে পৌঁছে যাবে, ততই যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। যা ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ডলারের আধিপত্য রুখতে এবং নিজেদের মুদ্রামান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে চীন পেট্রো ডলারের আদলে পেট্রোইউয়ান চালু করতে যাচ্ছে। বিশ্ব তেল বাজারের বড় ভোক্তা এখন তারাই। রাশিয়া তাতে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে আসছে এবং চীন ইতিমধ্যেই তাদের নিজস্ব মুদ্রা ইউয়ান দিয়ে আন্তর্জাতিক লেনদেন শুরু করেছে। তেল বাণিজ্যে বিশ্বব্যাপী তারা ‘নন-ডলার ইনভায়োরনমেন্ট’ সৃষ্টি করার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবে। যদিও ডলারে আধিপত্য খর্ব করাটা খুব সহজ হবে না, তবুও চীন যে হারে পৃথিবীব্যাপী বাণিজ্য সমপ্রসারণ শুরু করেছে, তাতে ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যেই তারা বিশ্ব অর্থব্যবস্থাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। সাম্প্রতিক চীনের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞায় সর্বশেষ কে জিতবে এই লড়াইয়ে, সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চীন চাইবে যুক্তরাষ্ট্র যাতে এ সমস্যা সমাধানে একটি চুক্তিতে আসে। এই বাণিজ্য যুদ্ধে চীন যদি হার না মানে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে যদি চুক্তিতে বসতে বাধ্য করে, তবে পরবর্তী সময়ে এমন কোনো নিষেধাজ্ঞা দিতে গেলে খোদ আমেরিকাই নয়, সব দেশকে ভাবতে হবে। ফলাফল যা হোক, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিশ্চিতভাবে ট্রাম্প বিশ্বের দরবারে চীনের প্রভাব বাড়ালেন। এসব ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ব্যস্ত হয়ে পড়লে অন্যান্য পরাশক্তি তাদের সামনে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে, এবং একই সঙ্গে যখন কয়েকটি পরাশক্তি সামনে চলে আসবে, তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব কমতে শুরু করবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

n লেখক: শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়