নারী ও শিশু সুরক্ষা প্রসঙ্গে

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০১৯, ২১:৪৭

শাহ্জাহান কিবরিয়া

দেশে সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে। অবিলম্বে এর প্রতিকার করতে না পারলে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের বাঙালি একটি ধর্ষণপ্রবণ জাতি হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। তাত্ক্ষণিক প্রতিকারবিহীন নারী-শিশু ধর্ষণ, হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা প্রতিদিন দেশবাসী অসহায়ভাবে অবলোকন করছে।আমাদের দেশে যে কোনো হত্যাকাণ্ডের শাস্তি হিসাবে অপরাধীকে মৃত্যুদ্ল দণ্ডিত অথবা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলেও শুধু ধর্ষণ, অ্যাসিড নিক্ষেপের কারণে মৃত্যুদণ্ড প্রদানের দৃষ্টান্ত বিরল। অপরাধ করে পার পেয়ে যাবার সুযোগ অপরাধীকে উত্সাহিত করে। তনু, মিতু, নুসরাত, সুবর্ণচরের গণধর্ষণ, যাত্রাবাড়ী বাসে নার্স শাহীনূর এবং অতি সম্প্রতি ঢাকায় ৭ বছরের শিশু সায়েমাসহ অসংখ্য ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা মানুষকে শঙ্কিত করে তুলেছে।

দৈনিক ইত্তেফাক-এ প্রকাশিত ‘বিচারহীনতায় বাড়ছে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা’ শীর্ষক এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ২ হাজার ৮৩ নারী-শিশু র্ধষণ, হত্যা, যৌন নিপীড়ন, উত্যক্ত করাসহ নানান ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছে।’ (২০.০৭.১৯) ‘সাক্ষীর অনুপস্থিতি আর আসামি পক্ষের কারণে বিচার বিলম্বিত’ শিরোনামে ইত্তেফাক-এর অপর এক রিপোটের্ (২০.০৭.১৯) বলা হয়েছে, ‘পাঁচ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ৩৮ হাজার মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। যদিও নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২০ ধারায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচার শেষ করার নির্দেশ রয়েছে। কিন্তু পেরিয়ে গেছে বছরের পর বছর। নিষ্পত্তি হয়নি মামলার।’  বিলম্বিত বিচার বিচারহীনতারই নামান্তর। বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে। বিলম্বিত বিচার ও বিচারহীনতার কারণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্প্রতি সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করে নারী-শিশু নির্যাতন দমন আইন আরো কঠোর করে সংশোধনের প্রস্তাব করেছেন। ‘মহামান্য আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন ধর্ষণ ও ধর্ষণ পরবর্তী হত্যা মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে আইনে নির্ধারিত ১৮০ দিনের মধ্যে শেষ করতে আদেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে আদালত এসব মামলায় সাক্ষীর উপস্থিতি ও নিরাপত্তায় ‘তদারকি কমিটি’ গঠন ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ছয় দফা নির্দেশনা ও অভিমত দিয়েছেন।’

ধর্ষণকে আমরা পাশবিক নির্যাতন বলে উল্লেখ করে থাকি। অথচ আমরা জানি পশুর কোনো যৌন বিকৃতি নেই। যৌন বিকারগ্রস্ত মানুষ পশুরও অধম। এদেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, জটিলতা ও বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ধর্ষক ও দুর্বৃত্তদের উত্সাহিত করে থাকে। তাদের বিকৃত যৌন কামনা, লালসা ও অপরাধপ্রবণতা দ্রুত বিস্তার লাভ করে ক্রমে তা ব্যক্তি থেকে সমাজে সংক্রমিত হয়ে গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাকে অস্থিতিশীল করে তোলে। শুধু যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন’ সংশোধন করলেই দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না। অপরাধীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলে পরবর্তীকালে আইনের ফাঁকফোকর অথবা সরকার পরিবর্তনের সুযোগে তারা কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে  যেতে পারে। মৃত্যুদণ্ড দিলেও দেশে ধর্ষণ বন্ধ হবে না। এতে কেবল ব্যক্তির মৃত্যু হয়। স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে মানুষ ও সমাজ এই শাস্তির কথা অল্প সময়ে ভুলে যায়। যেমন আমাদের অনেকেই ভুলে গেছি একাত্তর সালের রাজাকার ও পাকিস্তানি সৈন্যদের অত্যাচারের কথা। স্বাভাবিক মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এইসব জঘন্য অপরাধী যেন তাদের কৃতকর্মের শাস্তি তিলে তিলে ভোগ করে তার বিধান রাখতে হবে। এই শাস্তি সম্ভাব্য ধর্ষকদের শঙ্কিত করবে।

সম্প্রতি ইউক্রেনের পার্লামেন্টে  নারী ও শিশু যৌন নির্যাতনকারীদের যৌন সক্ষমতা ধ্বংস করার ব্যাপারে একটি আইন পাশ হয়েছে। ‘শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়নকারীদের যৌন সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করে দেওয়ার আইন পাশ হয়েছে ইউক্রেনের পার্লামেন্টে। বিশেষ ইনজেকশনের মাধ্যমে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তাদের যৌন সক্ষমতা ধ্বংস করে দেওয়া হবে যাতে ভবিষ্যতে তারা এ ধরনের অপরাধ আর না করতে পারে। আদালতে অভিযোগ প্রমাণ হলে ১৮ থেকে ৬৫ বছরের পুরুষের ক্ষেত্রে আইনটি কার্যকর করা হবে। ...কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে ধর্ষকরা একই অপরাধ আবার করে। এ কারণে এমন কঠোর সাজার প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, সাবেক সোভিয়েত রাষ্ট্র কাজখাস্তানেও একই শাস্তি প্রচলিত আছে।—ডেইলি মেইল’ (ইত্তেফাক, ১৩.০৭.১৯)

নারী ও শিশু সমাজের সংবেদনশীল অংশ। ধর্ষণের ফলে একজন নারী বা শিশুর সমগ্র জীবন বিপর্যস্ত হয়। সমাজে সে হয় উপেক্ষিত এবং করুণার পাত্র। কোনো অপরাধ না করেও সারা জীবন সে অপরাধের বোঝা বয়ে বেড়ায়। আর নির্লজ্জ ধর্ষক সমাজে বুক ফুলিয়ে চলে, সবার উপর আধিপত্য খাটায়! বাংলাদেশকে একটি সুসভ্য দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করতে হলে নারী ও শিশুর সুরক্ষার বিকল্প নেই।

n লেখক: শিশুসাহিত্যিক; সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি