কাপাসিয়ায় টিআর-কাবিখা বাস্তবায়নে অনিয়ম!

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৯, ০০:১৪

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সদ্যসমাপ্ত (২০১৮-১৯) অর্থবছরে গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কার (কাবিখা/কাবিটা) এবং গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (টিআর) উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে বরাদ্দ দেওয়া ৩ কোটি ১৮ লাখ টাকার বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ফলে লক্ষ্য অনুযায়ী উপজেলার গ্রামীণ জনপদের উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়ন না হওয়ায় চলতি বর্ষায় উপজেলাবাসীকে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।

জেলা ত্রাণ কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলায় ১১টি ইউনিয়নের অধীনে ২৩৪টি গ্রামের কাবিখা/কাবিটা এবং টি.আর উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় সদ্য সমাপ্ত (২০১৮-১৯) অর্থবছরে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দুই খাতে সর্বমোট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৩ কোটি ১৮ লাখ ৭ হাজার ২৮৮ টাকা। এর মধ্যে কাবিখা/কাবিটা উন্নয়ন প্রকল্প বাবদ গত বছরের ২১ অক্টোবর ১ম পর্যায়ে ২১টি এবং চলতি বছরের ২৯ এপ্রিল ২য় পর্যায়ে ১৭টি প্রকল্পে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে মোট ১৬০ দশমিক ৫৫ মে. টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়, সরকারি দর অনুযায়ী যার বর্তমান বাজার মূল্য ১ কোটি ৫ লাখ ৯৬ হাজার ৬৩০ টাকা। অপরদিকে, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দুইপর্যায়ে যথাক্রমে ১৫টি ও ১৩টি প্রকল্পে মোট ৮৯ দশমিক ৭৮ মে. টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়, সরকারি দর অনুযায়ী যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৫৯ লাখ ২৬ হাজার ১১৩ টাকা। অপরদিকে, একই অর্থবছরে টি.আর উন্নয়ন বাবদ ১ম ও ২য় পর্যায়ে যথাক্রমে ৯৬টি ও ৬৫টি প্রকল্পে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মাধ্যমে মোট ৫২ লাখ ৬৭ হাজার ৫২০ দশমিক ৮৩ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের মাধ্যমে দুই পর্যায়ে যথাক্রমে ৩৮টি প্রকল্পে ২৩ লাখ ৭৪ হাজার ১৬৪ দশমিক ৪৩ টাকা করে ও ৩৬টি প্রকল্পে ২৩ লাখ ৭৫ হাজার ৩৩৯ দশমিক ২১ টাকা করে বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু অভিযোগ পাওয়া গেছে যে, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি (পিআইসি) ও তাদের সঙ্গীদের সঙ্গে যোগসাজশে নীতিমালা অনুযায়ী কাজ না করে প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা কোথাও বরাদ্দের পরিমাণ গোপন রেখে, কোথাও সম্পূর্ণ প্রকল্প যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না করে কিংবা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করে অথবা প্রকল্পে কোনো কাজ না করে, আবার কোথাও একই প্রকল্পের নামে দুইবার পৃথকভাবে বরাদ্দ করাসহ বিভিন্ন কৌশলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

এসব প্রকল্প থেকে দ্বৈবচয়নের ভিত্তিতে ১১টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০টি প্রকল্প সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, অধিকাংশ প্রকল্পেই বরাদ্দকৃত অর্থ যথাযথভাবে খরচ করা হয়নি এবং প্রকল্প পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে নামমাত্র কাজ করা হয়েছে। আবার কোথাও একই এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন নামে একাধিক প্রকল্প দেখানো হয়েছে। কোথাও আবার একই প্রকল্পে দুইবার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আবার কোথাও জেলা পরিষদের মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পকে টি.আর অথবা কাবিখা/কাবিটায় স্থান দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও প্রকল্পের নামে টাকা উত্তোলন করা হলেও প্রকল্পগুলো এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি অনেক অস্তিত্বহীন, কাল্পনিক প্রকল্পে বর্ণিত নাম স্থানীয় লোকজন কোনোদিন শোনেনি এবং তার অস্তিত্বও খুঁজে পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্ট প্রকল্প এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, উপজেলার কড়িহাতা ইউনিয়নের ‘ইকুরিয়া পূর্বপাড়া ফোরকানিয়া মাদ্রাসা থেকে মোশারফ মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তার ইটের সলিং’ প্রকল্পে টি.আর প্রকল্প থেকে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছে। এ প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন বলেন, এ প্রকল্পে বরাদ্দের পরিমাণ আমাদের জানানো হয়নি বরং ইউপি সদস্য আমাদের বলেছেন, পি.আই.ও অফিসের খরচ ও অন্যান্য খরচ বাদে সর্বোচ্চ ৭০ হাজার টাকা খরচ করা যাবে। তাই এখানে ৫৬ হাজার টাকার ইট, ৩ হাজার ৬০০ টাকার বালু এবং নির্মাণ শ্রমিকদের ৮ হাজার টাকা দেওয়া হয়। টি.আর থেকে ‘আড়াল ঈদগা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টয়লেট নির্মাণ’ প্রকল্পে ৫০ হাজার টাকা এবং ‘কোটামনি বাজার মসজিদের টয়লেট নির্মাণ’ প্রকল্পে ৬০ হাজার টাকা বরাদ্দ হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। কাল্পনিক ‘টোকনগর বনফুল আদর্শ গ্রামের পুকুরের পাড় প্যালাসাটিং করণ’ প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে ৫০ হাজার টাকা, যার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এসব অভিযোগের ব্যাপরে গত ২৮ জুলাই উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা বাকি বিল্লাহের বক্তব্য জানার জন্য তার কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, তিনি বদলিজনিত কারণে বিদায় নিয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। পরে এ ব্যাপারে জেলা ত্রাণ কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কাপাসিয়া উপজেলার সব প্রকল্পের বরাদ্দকৃত টাকা ও চাল উত্তোলন করা হয়েছে এবং কোনো কিছুই ফেরত যায়নি। তবে আমি এখনো কাজ সমাপ্তির প্রতিবেদন পাইনি। প্রতিবেদন পেলে অভিযোগের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।