কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া শিক্ষার্থীর মাধ্যমে এমন উদ্যোগের যাত্রা শুরু হয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল পথশিশু, সুবিধাবঞ্চিত ও দালিত শিশুদের আর্থিকভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করা। ক্ষুধার্তদের খাদ্য কিনে দেওয়া। বেশকিছু সময় এমনটি চলতে থাকে। তার পর তাদের একতাবদ্ধতা এক সময় আরো তীব্রতর হয়। পরিকল্পনায় উঠে আসে এসব শিশুকে পড়াশোনা শেখাতে স্কুল প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
২০১৫ সালে রাজধানীর রবীন্দ্রসরবরে ‘আলোকিত শিশু স্কুল’র কার্যক্রম সর্বপ্রথম চালু হয়। এটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয় ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা)’র কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া বিভাগের শিক্ষার্থী মিথুন দাস কাব্য ও তার সহপাঠীরা। সে সময় তার সঙ্গে কাজের প্রতি আগ্রহ জানায় পাঁচ থেকে সাত জন। (বর্তমানে তার সঙ্গে রয়েছে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে ৭০০ এর অধিক স্বেচ্ছাসেবী।) কিছু পথশিশুকে স্বপ্নবাজ তরুণরা খোলা আকাশের নিচে পড়ানো শুরু করে। তারপর এ থেকে ভালো লাগার জন্ম হয়। তাদের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হয়ে ওঠে, সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে প্রাথমিক শিক্ষার আওতায় আনা। ২০১৬ সালে তাদের নজরে আসে মুন্সীগঞ্জ জেলার বেদেপল্লি। সেখান প্রায় ৫০ জন বেদের সন্তানকে নিয়ে নদীর পাড়ে খোলা আকাশের নিচে শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়। গড়ে তোলা হয় ‘আলোকিত শিশু স্কুল’। তাদের এই কার্যক্রমকে সমর্থন দিয়ে এগিয়ে আসে আর্থিক লেনদেন প্রতিষ্ঠান ‘আইডিএলসির ফাইন্যান্স লিমিটেড’। সম্প্রতি এ প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় একটি স্কুলঘর তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। যেটি উদ্বোধন করেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী শবনম ফারিয়া। দুই জন শিক্ষক দ্বারা স্কুলটিতে চলছে নিয়মিত পাঠদান। জানা গেছে, বেদের সন্তানরা পড়াশোনার সুবিধা পাওয়ায় তারা সেখানে স্থায়ীভাবে জীবনযাপন করছে। এ শ্রেণির মানুষ প্রচলিত সমাজে চলতে না পারায় শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয়। ‘আলোকিত শিশু স্কুল’ তাদের জন্য নিবেদিত হওয়ায় তাদের মধ্যে বাড়ছে সচেতনতা ও শিক্ষার হার।
এর পর নাটোরে দালিত সম্প্রদায়ের সন্তানদের নিয়ে ‘আলোকিত শিশু ফাউন্ডেশন’র আরেকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। নাটোরে গড়ে তোলা হয় ‘আলোকিত শিশু স্কুল’। বর্তমানে সেখানে চলছে নিয়মিত পাঠদান, কাজ করছে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা। ৭০ জন শিশু নিয়মিত স্কুলে আসা-যাওয়া করছে। এই ধরনের উদ্যোগের কথা যখন প্রিন্ট মিডিয়া ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে উঠে আসে, তখন ২০১৬ সালে সারাদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ৫০০ স্বেচ্ছাসেবক যোগ দেয়। কেউ ছাত্র পড়ানোর দায়িত্ব নেয়, কেউ দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার বিষয়ে আহ্বান করে, কেউ আর্থিক সহযোগিতা করে। এভাবেই শত শত স্বপ্নবাজ তরুণকে নিয়ে পথচলা আরো সমৃদ্ধ হতে থাকে ‘আলোকিত শিশু ফাউন্ডেশন’র।
হাজারীবাগের ঝাউচর নামক স্থানে ছোট্ট একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে চলছে স্কুল কার্যক্রম। শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া আছে। এটির ব্যয়ভার বহন করা হচ্ছে শহরের বিভিন্ন দানশীল ব্যক্তির অর্থায়নে। প্রতি মাসে জনপ্রতি ৭০০-১০০০ টাকা দিয়ে স্কুলটি তিন বছর ধরে টিকিয়ে রেখেছে। এখানে প্রায় ৩০ জন সুবিধাবঞ্চিত শিশু নিয়মিত পড়ছে। যাদের সকলের স্বপ্ন শিক্ষিত ও সচেতন মানুষ হওয়া।
‘আলোকিত শিশু ফাউন্ডেশন’র তিনটি স্কুলে সব মিলিয়ে ১৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রতিটি স্কুলেই শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া আছে। সংস্থাটি মূলত নিজেদের টাকায় চলছে। প্রতি মাসে প্রত্যেক স্বেচ্ছাসেবক নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দিয়ে সাহায্য করে। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কিছু কার্যক্রম রয়েছে। যেমন, Be Come a Guardian মানে প্রতিটা বাচ্চার দায়িত্ব সমাজের বিত্তবান মানুষের নেওয়া। মাসিক কিছু অর্থের বিনিময়ে শিশুদের অভিভাবক হওয়া। মূলত এভাবেই সকলের সাহায্যে চলছে আলোকিত শিশু স্কুলগুলো!
