ঢাকার রাস্তায় রিকশার বহুল ব্যবহারের কারণে ঢাকাকে বলা হয় রিকশার রাজধানী। কিন্তু কজন মানুষ আছেন, যাঁদের চোখ রিকশার পেছনে আঁকা চিত্রকর্মের ওপর পরে, কিন্তু অনেক ভিনদেশির চোখেই তা ভিন্নধর্মী নান্দনিক এক শিল্প। এমনই একজন মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ সাংবাদিক ও ভ্রমণবিদ অ্যান্ডি ইসাকসন। রিকশাচিত্রের সৌন্দর্য আর রসবোধ দারুণভাবে ধরা দিয়েছে তাঁর চোখে। আর এই আকর্ষণ থেকেই তিনি রিকশা নিয়ে ভিন্ন এক উদ্যোগ নিয়েছেন। ঢাকার রিকশাকে তিনি নিয়ে গেছেন নিউইয়র্কের রাস্তায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলাপচারিতায় সংস্কৃতি বিনিময়ের এই অনন্য গল্প জানিয়েছেন অ্যান্ডি ইসাকসন। লিখেছেন শুভ এম. তৌসিফ
ইসাকসন পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। বিশ্বখ্যাত অনেক গণমাধ্যমে কাজ করেছেন। লেখালেখির পাশাপাশি ছবি তোলা, প্রাণী ও দূরদূরান্তের স্থান সম্পর্কে বই সংগ্রহ আর ভ্রমণ তাঁর নেশা। তিনি বেড়ে উঠেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিনে। ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে। এক বছর যাবত পুরো এশিয়াতে চষে বেড়িয়েছেন। ২০১২ সালে বাংলাদেশে আসেন এই তরুণ সাংবাদিক। এখানকার প্রকৃতি, সংস্কৃতি, মানুষের জীবনযাপনের ধরন তাঁকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করে। তবে সবচেয়ে যে জিনিসটা তাঁকে ভাবায়, সেটি হলো রিকশা। যেহেতু ছবি তোলা তাঁর নেশা, তাই তিনি রিকশার পেছনে আঁকা চিত্রকর্ম ক্যামেরাবন্দি করেন। এই চিত্রকর্মে সুনিপুণভাবে ফুটে ওঠা আবহমান বাংলাদেশের সংস্কৃতি দেখে তিনি মুগ্ধ হন।
অ্যান্ডি ইসাকসন বলেন, ‘২০১২ সালে সাংবাদিকতার কাজে বাংলাদেশে প্রথম সফরে আসি। এদেশের ঝলমলে সুন্দর রিকশা আমার নজর কেড়ে নেয়। এ সুন্দর বাহনটির স্বতন্ত্রতা থেকে শুরু করে শিল্পী ও চালকের নিজস্ব ভাবাবেগ ও অভিব্যক্তি আমাকে আলোড়িত করে। সেই থেকে স্বপ্ন দেখেছি, আমার নিজের একটি রিকশা থাকবে। কোলাহল মাখা শহরের বুকে এমন সৃজনশীল শিল্পের দিকে একবার তাকালে চোখ ফেরানো কঠিন। তবুও শত ব্যস্ততার এই শহরে আর ডিজিটাল মিডিয়ার ভিড়ে এই শিল্প ও শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বড়ই উপেক্ষিত ও অবহেলিত।’
সেই পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আজ অবধি অক্লান্ত পরিশ্রম আর গভীর শিল্পজ্ঞানের মিশেলে এই শিল্পীরা আজো বাঁচিয়ে রেখেছেন এই চিত্রকর্মটিকে। মূলত আলাউদ্দীন, আবুল, আর কে দাশ প্রমুখ ওস্তাদের হাত ধরেই এর চর্চার শুরু। আশির দশকে কোন চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে, তা রিকশার পেছনে আঁকা পোস্টারের দিকে তাকালেই অনায়াসে বলা যেত। অ্যান্ডি লক্ষ করলেন, এই অসাধারণ চিত্রকর্ম বাংলাদেশের সংস্কৃতিকে প্রতিফলিত করছে। গ্রাম-বাংলার মেঠো পথ, ধানের আইল, নদী-নালা, দুরন্ত কৈশোরের ছুটে চলা কিংবা শহুরে যান্ত্রিকতায় ঘেরা ব্যস্ত জীবন—সবই ধরা দিয়েছে শিল্পীর কল্পলোকের তুলির আঁচড়ে আঁচড়ে। অবশেষে অ্যান্ডি রিকশার পেছনে যাঁরা এমন চিত্রকর্ম করেন, তাঁদের খোঁজ করা শুরু করলেন। এমন দুর্লভ প্রান্তিক শিল্পীদের পেয়ে তিনি খুশিতে ফেটে পড়েন। এর পূর্বে রিকশার এমন সৌন্দর্য দেখে তিনি মনে মনে একটি রিকশার অভাব বোধ করেছিলেন। তাঁর মাথায় চিন্তা আসে একটি রিকশা এখান থেকে তৈরি করে তিনি নিউইয়র্কে নিয়ে যাবেন। যেই ভাবা সেই কাজ, গ্যারেজ থেকে তৈরি করে নিলেন রিকশা। স্থানীয় সৃজনশীল শিল্পীদের দিয়ে তাঁর স্বপ্নের রিকশার পেছনে করালেন অসাধারণ এক চিত্রকর্ম। এই প্রকল্পের নাম দিলেন রিকশা এনওয়াইসি।
অ্যান্ডি তাঁর এই রিকশাকে দুই দেশের সংস্কৃতি বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে দেখেন। তিনি ভাবছিলেন, এটিকে কিভাবে মানুষের মধ্যে সংস্কৃতি আদান-প্রদানের মাধ্যম হিসেবে একটি বিশ্বজনীন বাহন হিসেবে দাঁড় করানো যায়। অবশেষে একটা বুদ্ধি এল তাঁর মাথায়, তিনি নিউইয়র্কের রাস্তায় তাঁর রিকশা ছেড়ে দেন। যাত্রীরা সেখানে বিনা ভাড়ায় রিকশায় ওঠেন। যাত্রীদের বলা হতো, তাঁরা রিকশায় ওঠার পর তাঁদের জীবনের না-বলা গল্পগুলো বলতে পারবেন। এভাবেই ইসাকসন নিউইয়র্ক শহরের রাস্তায় তাঁর স্বপ্নের রিকশা এনওয়াইসির মাধ্যমে মানুষের জীবনের বিচিত্র গল্প শোনার ও বলার অন্যরকম এক ক্ষেত্র তৈরি করেছেন। ইসাকসনের এই রিকশা বর্তমানে ব্রুকলিনবাসীর কাছে বেশ পরিচিত একটি বাহন।
নিউইয়র্ক টাইমস, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, স্মিথসোনিয়ান, ডিসাবেলিটি রাইটস ফান্ড ও ডব্লিউডব্লিউএফে ইসাকসনের সাতটি মহাদেশযাত্রার অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করেছে। সেখানেও উঠে এসেছে এই রিকশার গল্প। কবি সুনির্মল বসুর লেখা ‘বিশ্বজোড়া পাঠশালা মোর/সবার আমি ছাত্র/নানান ভাবে নতুন জিনিস শিখছি দিবারাত্র’ এই ছন্দগুলো যেন ইসাকসনের জীবনের মূলমন্ত্র। তিনি এশিয়া, আফ্রিকা, নর্থ আমেরিকা চষে বেড়িয়েছেন। নিজের তোলা ছবি দিয়ে ফুটিয়ে তুলিয়েছেন বিভিন্ন দেশের বিচিত্র সংস্কৃতি। যা তাঁকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করে। তেমনি বাংলাদেশের সংস্কৃতিও তাঁকে আকৃষ্ট করেছে ভীষণভাবে।
