বর্তমানে মোহাম্মদপুরে ২০ ফুট সড়কের পাশের ৫ কাঠা জমিতে ৯ হাজার ৭২০ বর্গফুট আয়তনের ভবন করা যায়। ফ্ল্যাটের সংখ্যা হয় ৮ থেকে ৯। সর্বশেষ সংশোধিত ড্যাপের প্রজ্ঞাপন জারি হলে সেই একই জমিতে ১১ হাজার ৭০০ বর্গফুট আয়তনের ভবন নির্মাণ করা যাবে। দাবির মুখে ২০২৩ সালে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) সংশোধনের পর আবারও আরেক দফা সংশোধনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
রাজধানী ঢাকাকে বাসযোগ্য করার উদ্দেশ্য নিয়ে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) ২০২২ থেকে ২০৩৫ সালের জন্য করা মহাপরিকল্পনাটি ২০২২ সালের আগস্ট থেকে কার্যকর হয়। কিন্তু এতে ভবনের উচ্চতা ও আয়তন কমে গেলে চাপে পড়ে ড্যাপের সংশ্লিষ্টরা। বারবার ড্যাপ সংশোধনের দাবি ওঠে। তবে ড্যাপ প্রণয়নকারীরা বলছিল, নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত না করে শুধু ভবনের উচ্চতা বাড়িয়ে ভারসাম্যহীন জনবসতি গড়ে উঠলে ঢাকা আরও অবাসযোগ্য হয়ে যাবে। যার কারণে ফ্লোর এরিয়া র্যাশিও (এফএআর) কমিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি এটি আবার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ১৯ অক্টোবর ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) সংশোধনীর প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেয় সরকার, যা গেজেটের অপেক্ষায় রয়েছে।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক আদিল মোহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার অবকাঠামো ও নাগরিক পরিষেবা এখনই চরম চাপের মুখে। এমন অবস্থায় ভবনের উচ্চতা ও ফার বাড়ানো হলে ইউটিলিটি পরিষেবা, ট্রাফিক, জলাবদ্ধতা, আলো-বাতাসের প্রবাহ সবকিছুই আরও বিপর্যস্ত হবে। সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ও উদ্ধার ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নগরের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা স্পষ্ট করে দিয়েছে। ভূমিকম্প বা বড় দুর্ঘটনায় এই অতি ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকা ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
ড্যাপের এই নতুন সংশোধনীর ফলে এখন রাজউক এলাকার প্রায় সব জায়গাতেই ভবনের উচ্চতা বাড়ছে। সংশোধিত ড্যাপ এবং ‘খসড়া ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা ২০২৫’ অনুযায়ী বহু এলাকায় ফ্লোর এরিয়া রেশিও (এফএআর) দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো হয়েছে। ফলে আগে যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ তলা ভবন নির্মাণের সুযোগ ছিল, এখন সেখানে ১০ থেকে ১১তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণ করা যাবে।
এছাড়া, নতুন বিধিমালায় একটি প্রণোদনা যুক্ত হয়েছে। যেমন কোনো প্লটে যত বেশি খোলা জায়গা রাখা হবে, ভবনের উচ্চতা তত বেশি করার জন্য অতিরিক্ত ছাড় দেওয়া হবে। অর্থাৎ, যদি কোনো এলাকায় এফএআরের মান ২.৫ হয়, তাহলে ন্যূনতম ফাঁকা জায়গা রেখে ৪ থেকে ৫ তলা ভবন নির্মাণ করা যাবে। কিন্তু, জমির মালিক যদি আরও বেশি জায়গা খালি রাখেন, তবে একই স্থানে ৭ থেকে ৮ তলা পর্যন্ত ভবন নির্মাণের অনুমতি পাওয়া যাবে।
বিদ্যমান ড্যাপে মিরপুর এলাকায় ফার ২ দশমিক ৮। কোনো জমির আয়তন এক হাজার বর্গফুট হলে সেখানে দুই হাজার ৮০০ বর্গফুট আয়তনের অবকাঠামো তৈরি করা যেত। সেটা সংশোধন করে ফার করা হয়েছে ৩ দশমিক ৪। ফলে এখন জমির মালিক একই আয়তনের জায়গায় ৩ হাজার ৪০০ বর্গফুট আয়তনের ফ্লোর পাবেন। এতে ভবনের আশপাশের উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ কমে যাবে।
যেসব এলাকায় এফএআর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে তার মধ্যে শেওড়াপাড়ায় ২ থেকে ৩, কড়াইলে ২ পর্যন্ত, মহাখালীতে ২.২ থেকে ৩.৩, মোহাম্মদপুরে ২.৭ থেকে ৩.৪, পুরান ঢাকায় ২.৬ থেকে ৩.৩, খিলগাঁওয়ে ২ থেকে ৩.৪, মিরপুরে ২.৮ থেকে ৩.৪, দক্ষিণখানে ২ থেকে ৩.১, টঙ্গীতে ২.৪ থেকে ৩.২, রূপগঞ্জে ২ থেকে ৩.২, সাভারে ২ থেকে ৩.৪, মিরপুর ডিওএইচএসে ২.৫ থেকে ৪.৮ এবং খিলক্ষেত আবাসিক এলাকায় ২ থেকে বাড়িয়ে ৪.৪ করা হয়েছে। একই সঙ্গে বারিধারা, মোহাম্মদপুর, পান্থপথ, ডেমরা, বসুন্ধরা, কচুক্ষেত, উত্তরা, লালমাটিয়া, মগবাজারসহ আরও বেশকিছু এলাকায় বিদ্যমান এফএআরের মানের তুলনায় সর্বোচ্চ ১.৫ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। শুধু এফএআরের মান বাড়ানো নয়, যদি ব্লকভিত্তিক উন্নয়নে একাধিক প্লট একীভূত করা হয়, তাহলে নির্ধারিত এফএআরের ওপর অতিরিক্ত ০.২৫ থেকে ০.৭৫ পর্যন্ত বোনাস দেওয়া হবে।
এলাকাভেদে আবাসন ইউনিটের হার মূল ড্যাপের তুলনায় বাড়ায় সব এলাকায় ফ্ল্যাটের সংখ্যা বাড়বে। যেমন মূল ড্যাপে পুরান ঢাকায় আবাসন ইউনিটের হার ছিল ১.২, যা এখন দ্বিগুণেরও বেশি বাড়িয়ে ৩.১ করা হয়েছে। ফলে পুরান ঢাকার পাঁচ কাঠা জমিতে আগে যেখানে সর্বোচ্চ ছয়টি ফ্ল্যাট তৈরি করা যেত, এখন সেখানে ১৩টি পর্যন্ত ফ্ল্যাট নির্মাণের সুযোগ থাকবে। এছাড়া, ‘খসড়া ঢাকা মহানগর ইমারত বিধিমালা-২০২৫’ এ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অকুপ্যান্সি সার্টিফিকেট নবায়ন বাধ্যতামূলক থাকলেও, নতুন বিধিমালায় একবার সার্টিফিকেট নিলেই তা আজীবনের জন্য কার্যকর থাকবে। পাঁচ কাঠা বা তার বেশি জমির প্লটে স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজউকের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ আশরাফুল ইসলাম বলেন, সবার কথা বিবেচনা করেই ড্যাপের সংশোধন করা হয়েছে। পাঁচ কাঠার প্লটে ভবন নির্মাণে স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (এসটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এই সংশোধনীতে।
