নিয়ম অনুসরণে সচেতনতা আবশ্যক

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৯, ২১:২৯

মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ী ১ নম্বর ফেরিঘাটে নড়াইলের কালিয়া উপজেলার ১১ বছর বয়সি স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যু দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তাহার মৃত্যুর পিছনে নিহিত যে কারণের কথা পত্রপত্রিকায় উল্লেখ করা হইয়াছে তাহার মধ্য দিয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের একটি পুরোনো ক্ষতের দিকে আমাদের চোখ পড়িয়াছে। পত্রিকার রিপোর্টে বলা হইয়াছে, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত তিতাসকে আইসিইউ সংবলিত একটি অ্যাম্বুলেন্সে ঢাকায় উন্নত চিকিত্সার জন্য আনা হইতেছিল। সেই সময় ১ নম্বর ঘাটে অবস্থান করিতেছিল কুমিল্লা নামের একটি ফেরি। কিন্তু ফেরিটি ছাড়িতে বিলম্ব করিতেছিল। দ্রুত ঢাকায় নেওয়ার তাগিদ অনুভব করে ছেলেটির স্বজনরা ফেরি ছাড়তে অনুনয়বিনয় করেন।  কিন্তু একই সময়ে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ঘাট কর্তৃপক্ষকে বার্তা পাঠিয়েছেন, সরকারি একজন উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা ফেরিতে পদ্মা পার হবেন; সুতরাং  ১ নম্বর ঘাটের ফেরিটি যেন ছাড়িয়া না যায়। এই বার্তা পাইয়া ফেরিটি ঘাটে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে। এ সময় রক্তক্ষরণে ছেলেটির মৃত্যু ঘটে। উল্লেখ্য, যে কর্মকর্তার জন্য ফেরিটি অপেক্ষা করিতেছিল তিনি একসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পের একজন যুগ্মসচিব।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যাইবেন সেই কারণে ফেরি, স্টিমার, রেল অপেক্ষা করিবার এই সংস্কৃতি দীর্ঘকাল ধরিয়াই চালু আছে। যদিও ইহা একটি অসুস্থ প্র্যাকটিস। কিন্তু আধুনিক যুগে এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা মানুষের মনে দাগ কাটিয়াছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও ঝড় উঠিয়াছে। সকলে অনুভব করিতেছে, ইহার ব্যত্যয় প্রয়োজন। বিশেষ করিয়া একটি ব্যস্ত ফেরিঘাটে একজন যুগ্মসচিবের জন্য তিন ঘণ্টা একটি ফেরি অপেক্ষা করা কেবল অগ্রহণযোগ্যই নহে, অবিবেচনাপ্রসূতও বটে। নৌ পরিবহন সচিব দৈনিক ইত্তেফাককে জানাইয়াছেন,  মন্ত্রী, এমপি, সচিব কাহারো জন্য এক সেকেন্ডও ফেরি আটকাইয়া রাখা যাইবে না—এমন নির্দশনা রহিয়াছে। তাহা হইলে কেন এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করিবার নিয়ম ভাঙিয়া তিন ঘণ্টা ফেরিটি দাঁড়াইয়া রহিল, ইহার জোর তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। বর্তমান এই ঘটনাটি আলোড়ন সৃষ্টি করার কারণে তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হইয়াছে। ইহার মধ্যে যেই কর্মকর্তার বার্তায় ফেরিটি অচল হইয়াছিল তাহার নির্দেশেও একটি কমিটি গঠন করা হইয়াছে!

বিচ্ছিন্নভাবে ছেলেটির মৃত্যুর কারণে এই ঘটনা জনসম্মুখে উঠিয়া আসিয়াছে। কিন্তু ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারণে জনদুর্ভোগের বিষয়টি আমাদের দেশে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নহে। ইহা একটি চলমান দৃশ্য। রাস্তায় হাজার হাজার মানুষকে আটকাইয়া রাখিয়া ভিআইপি চলাচলের দৃশ্য নিত্যদিনের। যতদিন শিক্ষা না আসিবে, সচেতনতা না আসিবে ততদিন এই ধরনের সমস্যার কোনো সুরাহা হইবে বলিয়া মনে হয় না।  সেই সঙ্গে সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের, সব বিভাগের নিজের দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন করিবার বিষয়ে সতর্ক হইতে হইবে। নির্দেশ যদি আইনপরিপন্থি হয়, নিয়মবহির্ভূত হয় তাহা হইলে সেই  নির্দেশ অনুসরণ না করিবার একটি সংস্কৃতি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে গড়িয়া উঠা এখন জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।