সেশনজটে বিপাকে ১১ হাজার শিক্ষার্থী

ঘোষণার ৯ মাসেও হয়নি সাত কলেজ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২৫, ০৫:০০

রাজধানীর সাত কলেজ নিয়ে সংকট যেন পিছু ছাড়ছে না। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে কলেজগুলোর জন্য নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। যার নাম দেওয়া হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি)। নাম নির্ধারণ করার পর দীর্ঘ ৯ মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো জারি হয়নি সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন, তথা অধ্যাদেশ। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়টি কোন কাঠামোতে হবে সেটাও চূড়ান্ত করা হয়নি। এসব কিছু চূড়ান্ত হওয়ার আগেই ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি নেওয়া হয়েছে ১১ হাজারেরও অধিক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আগে ভর্তি নেওয়া এসব শিক্ষার্থীর এখন পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় তৈরি হয়নি। ফলে এক ধরনের ‘পরিচয় সংকটে’ ভুগছেন ভর্তি ইচ্ছুক এসব শিক্ষার্থী। অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন ২০২৫-২০২৬ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী ভর্তির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করছে, তখন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটিতে এখনো ২০২৪-২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরু হয়নি। দীর্ঘ সেশনজটে পড়ে উদ্বেগ আর হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ক্লাস শুরুর দীর্ঘ অপেক্ষায় ১১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

ভর্তি কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে ক্লাস শুরুর দাবিতে গতকাল রবিবার দুপুর দেড়টা থেকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্বর্তী প্রশাসকের কার্যালয় ও ঢাকা কলেজের প্রশাসনিক ভবন অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থীরা। এ সময় শিক্ষার্থীরা ‘শিক্ষা টালবাহানা, চলবে না, চলবে না; ভর্তি নিয়ে টালবাহানা, চলবে না, চলবে না; শিক্ষা না সিন্ডিকেট, শিক্ষা শিক্ষা; সিন্ডিকেটের গদিতে, আগুন জ্বালাও একসাথে’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ২০২৪-২৫ সেশনের শিক্ষার্থী ফুয়াদ বলেন, ‘আমরা ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অন্তর্ভুক্ত হয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি এবং সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। পরবর্তীকালে আমাদের বারবার তারিখ দেওয়া হচ্ছে যে, ভর্তি কার্যক্রমের কাগজপত্র জমা দেওয়ার জন্য। কিন্তু কোনো রকমভাবে প্রশাসন আমাদের কাগজপত্র নিচ্ছে না। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার শেষ হয়ে দ্বিতীয় সেমিস্টার শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের কোনো কিছুই হচ্ছে না। এজন্যই আমরা সবাই আজকে এখানে জড়ো হয়েছি আমাদের ভর্তি কাগজপত্র জমাদান ও ক্লাস শুরুর দাবিতে।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেক শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবক নিয়ে ভর্তি কার্যক্রম নিশ্চিত করার জন্য কাগজপত্র জমা দানের জন্য উপস্থিত হয়েছেন, তবে প্রশাসন কাগজপত্র জমা নিচ্ছে না। তারই পরিপেক্ষিতে আমাদের অবস্থান ও বিক্ষোভ কর্মসূচি।’ ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধীনে ইডেন কলেজে সদ্য ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী শান্তা বলেন, ‘গতকাল ভর্তির কাগজপত্র জমা নেওয়ার কথা ছিল। ইডেনে কাগজ জমা দিতে গেলে তারা বলে ঢাকা কলেজে যেতে। এখন এখানেও কাগজ জমা নিচ্ছে না। আমরা হয়রানির শিকার হচ্ছি। আমাদের ভবিষ্যত্ নিয়ে এভাবে তামাশা বন্ধ করার জন্য শিক্ষক ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

মতামত দেওয়ার জন্য ডাক পেলেন ২৬ জন :প্রস্তাবিত ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’র খসড়া অধ্যাদেশের ওপর অংশীজনদের মতামত নিতে মতবিনিময় সভা ডেকেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আজ সোমবার সকাল সাড়ে ১০টায় মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সভাকক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন শিক্ষা উপদেষ্টা প্রফেসর ড. সি আর আবরার। গতকাল রবিবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব নাঈমা খন্দকারের সই করা এক চিঠিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। বৈঠকে অংশ নিতে সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষানীতি-বিশেষজ্ঞ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের পাশাপাশি জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলাম লেখকসহ মোট ২৬ জনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানউল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ হাসান নকীব, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইয়াহ্ইয়া আখতার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামরুল আহসান এবং জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রেজাউল করিম। এছাড়া শিক্ষাবিদ মানজুর আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এডুকেশনাল অ্যান্ড রিসোর্সের পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম, ব্যানবেইসের ডিএলপি বিভাগের চিফ ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এ এম সারওয়ার উদ্দিন চৌধুরী বৈঠকে যোগ দেবেন। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা), অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ববিদ্যালয়) ও বিশ্ববিদ্যালয় অধিশাখা-২-এর যুগ্মসচিবও সভায় থাকবেন। পাশাপাশি অংশ নেবেন জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক মাহফুজুর রহমান মানিক (সমকাল), শরীফুল হক (দ্য ডেইলি স্টার), সাবিদিন ইব্রাহিম (বণিক বার্তা), জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক হাসান মামুন, কলাম লেখক ও বিশ্লেষক শহীদুল্লাহ ফরায়জী, শুভ কিবরিয়া, লেখক ও গবেষক ড. কাজল রশীদ শাহীন। এছাড়া শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন মো. মুর্তুজা সুমন (খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়), ড. মো. শহীদুল্লাহ (বিইউপি) এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ। সাত কলেজের অ্যালামনাই প্রতিনিধিত্বে সভায় আমন্ত্রণ পেয়েছেন মাহমুদুর রহমান মান্না, মীর সরফত আলী সপু এবং হেলেন জেরিন খান।

চলতি বছরের ২৬ মার্চ সরকার রাজধানীর সাত সরকারি কলেজকে পৃথক করে নতুন একটি বিশ্ববিদ্যালয় গঠনের ঘোষণা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রস্তাবিত নাম নির্ধারণ করে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’। কলেজগুলো হলো ঢাকা কলেজ, ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, মিরপুর বাঙলা কলেজ এবং সরকারি তিতুমীর কলেজ। ক্লাস শুরুর দাবিতে শিক্ষার্থীরা বারবার স্মারক লিপি, আন্দোলন ও অনশন করলেও মিলছে না সমাধান। শিক্ষার্থীরা দাবি করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো তৈরির আগ পর্যন্ত অন্তত কলেজের নিয়মে ক্লাস নেওয়ার।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়টি অধ্যাদেশের খসড়ার ওপর মতামত যাচাই-বাছাইয়ে পর্যায়ে রয়েছে। এর মডেল নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে মতানৈক্যের পাশাপাশি মৌলিক বিভাগগুলোকে বাদ দেওয়াসহ নারী শিক্ষা সংকোচনের আশঙ্কায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষকরা বলছেন, ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা এখন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই নেই, ফলে তাদের ক্লাস নেওয়া এক্তিয়ার-বহির্ভূত। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন তারা। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সব ধাপ সম্পন্ন না করেই শিক্ষার্থী ভর্তি করাকে হঠকারী সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন অনেক শিক্ষাবিদ। দ্রুত সরকারকে এই শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পরিচয় নিশ্চিত করার পরামর্শ জানিয়েছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, ‘এখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলো না, তার কাঠামো কী হবে, রূপরেখা কী হবে, শিক্ষক কারা হবেন, ক্যাম্পাস কোথায় হবে? এসব কিছু ঠিক না করে শিক্ষার্থী ভর্তি করা কেবল ভুল না, রীতিমতো অপরাধ।’ এ ব্যাপারে ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্বর্তী প্রশাসক অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস সাংবাদিকদের বলেন, ‘নতুন শিক্ষাবর্ষের ক্লাস শুরুর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার ওপর নির্ভর করছে। আশা করি খুব দ্রুতই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। সবকিছু প্রস্তুত হয়ে গেলে শিগিগরই ক্লাস শুরু হবে।’

ইত্তেফাক/এমএএম