বাংলাদেশের এক গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের তথ্য মোতাবেক, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রতি চার জনের মধ্যে একজন গরিব। দেশে এখন পৌনে ৫ কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করছে। বিশ্বব্যাংক বলেছে, এ বছর আরো ৩০ লাখ মানুষ অতি দরিদ্র হয়ে যাবে। কারণ, মানুষের প্রকৃত আয় কমে যাচ্ছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থবির এবং বিদ্যমান দুর্বল শ্রমবাজার। বেকারত্বের হার বেড়েই চলছে। শ্রমশক্তি জরিপ-২০২৪ অনুযায়ী, দেশে এখন বেকার মানুষ ২৬ লাখ ২৪ হাজার।
উল্লেখ্য, দেশে ২৯ শতাংশ স্নাতক ডিগ্রিধারী এখন বেকার। কর্মজীবীদের ৩৮ শতাংশ ছদ্ম বেকারত্ব অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ কর্মসংস্থানে যুক্ত নেই। সত্য যে, শ্রমশক্তিতে নারীদের অংশগ্রহণের হার অনেক কম। বর্তমানে কর্মক্ষম বয়সের নারীদের মাত্র এক-চতুর্থাংশ কর্মক্ষেত্রে যুক্ত আছেন। দেশের শ্রমবাজার এখন সংকুচিত হয়ে পড়েছে নানা কারণে। দুঃখজনক যে, দেশের শ্রম বাজারের সঙ্গে সঙ্গে বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়লে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। সামষ্টিক অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়বে। রেমিট্যান্স বাড়লে রিজার্ভ বাড়ে, বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকে, আমদানি ব্যয় কম হয় এবং এক পর্যায়ে মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে থাকে। মূল্যস্ফীতি কম থাকলে মানুষের প্রকৃত আয় বাড়ে, ভোগ বাড়ে, উৎপাদন বাড়ে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স হলো নিট বৈদেশিক মুদ্রা। রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতিতে পুরোটাই মূল্য সংযোজন করে। অন্যদিকে রপ্তানি আয়ের মাধ্যমে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় তার ৪০ শতাংশ ব্যয় হয় কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি আমদানি করতে। আবার রপ্তানি আয়ের জন্য একক পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় এখনো। অর্থনীতি এখনো বহুমুখী হয়নি। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের বিকল্প নেই। অথচ বৈদেশিক শ্রমবাজার দিনে দিনে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য মোতোবেক, গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিশর, রোমানিয়া, ব্রুনাই, মালদ্বীপ বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানের শ্রমবাজার বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য সাত বছর বন্ধ ছিল। বাংলাদেশসহ ৯ দেশের ভিসা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। শ্রমিক, পর্যটন এবং ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্যে ভিসার আবেদন করা যাবে না। ২০২৬ সাল থেকে কার্যকর হবে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০২৪-এর মে মাসে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য বন্ধ আছে। মূলত অবৈধ অভিবাসন, মানব পাচার, আইন লঙ্ঘন, দক্ষ শ্রমিকের অভাবের কারণে বৈদেশিক শ্রমবাজার সংকুচিত হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক মানব পাচার সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তলানিতে। এ কারণে শ্রমিক গ্রহণকারী দেশগুলো বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিতে আগ্রহ হারাচ্ছে। এছাড়াও, কূটনৈতিক দক্ষতার একটা ঘাটতি রয়েছে, যার কারণে বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানি করতে এবং শ্রমবাজার সম্প্রসারণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বিএমইটি তথ্য মতে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ১০ লাখ ১১ হাজার ৮৬৯ জন কর্মী বিদেশে গেছে। এর মধ্যে ৯৫ শতাংশ গেছে মাত্র পাঁচটি দেশে। নারী শ্রমিক অভিবাসনের বিষয় নিয়ে অনেক সমালোচনা রয়েছে। এখনো পর্যন্ত বৈদেশিক শ্রমবাজারে নারী শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্ম পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। শারীরিকভাবে নারীশ্রমিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি, নারী শ্রমিকদের কম মজুরি প্রদান নিয়মিত ঘটনা। ওকাপের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, ৯৪ শতাংশ নারী কর্মী নিয়মিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। যৌন হয়রানির শিকার ৪৭ শতাংশ নারী। এ কারণে এখন নারী কর্মী বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নয়। বিএমইটি তথ্য বলেছে যে, ২০১৬ সালে ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ নারী কর্মী বিদেশ যান। এরপর এ বছর সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নারী কর্মী গেছেন মাত্র ৪০ হাজার ৮৮ জন। অর্থাৎ, ২০১৬ সালের পর থেকে নারী কর্মী বিদেশ যাওয়া কমে গেছে ৬৬ শতাংশ। এটা বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুঃখজনক যে, গত ১৪ বছরে অবৈধভাবে ৭০ হাজার বাংলাদেশি ইউরোপে প্রবেশ করেছে। অবৈধভাবে যাওয়ার বেশির ভাগ মানুষ ক্যাম্পে বন্দি হয়ে পড়েন। যার ফলে বিশ্বের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।
সত্য যে, কিছু কিছু দেশে বাংলাদেশের কর্মীদের নেওয়ার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কিন্তু ভাষাগত দক্ষতা এবং চাহিদা মোতাবেক দক্ষতার দিক দিয়ে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনশক্তি রপ্তানি করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমপ্লয়মেন্ট পারমিট সিস্টেমের (ইপিএস) মাধ্যমে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশসহ ১৬টি দেশের কর্মীদের নিয়োগ দিয়ে থাকে। ২০০৮ সালে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাংলাদেশ এই সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না। দক্ষিণ কোরিয়ার এই সুযোগ নেপাল, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া বৃহৎভাবে কাজে লাগিয়েছে। বিগত পাঁচ বছরে ৪০ হাজার কোটার বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মী গেছেন প্রায় ১৫ হাজার। অথচ, ২০২৪ সালে ১৬ হাজার ৪০০ কোটার বিপরীতে নেপাল থেকে কর্মী গেছেন ১৬ হাজার ৩০০ জন। ২০২৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের জন্য কোটা নির্ধারিত আছে ১০ হাজার ৩০০ জন। অথচ এ কোটার বিপরীতে এ বছর সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গেছেন মাত্র ১ হাজার ২৪৪ জন। জাপান টাইমসের প্রতিবেদন বলছে-২০৪০ সালের মধ্যে জাপানে কর্মক্ষম জনসংখ্যার ঘাটতি ১ কোটি ১০ লাখ পৌঁছাতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ সরকার জাপানের শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তি পাঠাতে পারে। নেপালিরা জাপানের শ্রমবাজারে প্রশংসা অর্জন করেছে তাদের দক্ষতা দিয়ে। এছাড়াও, নেপালের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিদেশ গমনে ইচ্ছুদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে থাকে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এসেছে ৩০ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছর থেকে প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি। যেখানে রপ্তানি আয় এসেছে ৪৮ বিলিয়ন ডলার। রপ্তানি আয়ের মধ্যে কাঁচামাল, মেশিনারিজ, মধ্যবর্তী পণ্য আমদানিতে চলে গেছে প্রায় ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলার। এ ব্যাখ্যা থেকে বলা প্রয়োজন যে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের জন্য রেমিট্যান্সের বিকল্প অন্য টেকসই পন্থা নেই। দরকার শুধু শ্রমবাজার সম্প্রসারণ এবং দক্ষ কর্মী সৃষ্টি করা। বাংলাদেশের রপ্তানি আয় একক পণ্যনির্ভর এবং রপ্তানি বাজার কয়েকটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বাংলাদেশ এখন বৈদেশিক ঋণনির্ভর দেশে পরিণত হয়েছে। কারণ, বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের সর্বনিম্ন। সামনের দিনে বৈদেশিক ঋণের পরিশোধ বেড়ে যাবে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের তথ্য মোতাবেক, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে বৈদেশিক ঋণ এসেছে ১১৫ কোটি ডলার, আর আগে নেওয়া ঋণের জন্য পরিশোধ করতে হয়েছে ১২৮ কোটি ডলার। বাংলাদেশ বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে পণ্য রপ্তানি করে থাকে। এর মধ্যে ১০টি দেশ থেকে আসে মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের কাছাকাছি। আবার এর মধ্যে একক পণ্য তৈরি পোশাক থেকে আসে ৮৪ শতাংশ। একটা অর্থনীতিতে পণ্য রপ্তানি এবং জনশক্তি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের আরো কিছু কিছু দিক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ পণ্য রপ্তানি এবং জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে বাজার সম্প্রসারণ করতে পারেনি। অপ্রচলিত বাজারে পণ্য রপ্তানির প্রণোদনা দিলেও রপ্তানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। আবার কিছু শ্রমবাজারে সুযোগ সৃষ্টি হলেও চাহিদা মোতাবেক কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। ঋণ প্রদানকারী সংস্থাগুলো সাধারণত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভনিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে থাকে। রিজার্ভ কমে গেলে অর্থনৈতিক আত্মবিশ্বাস কমে যায়। তখন দুর্বল অর্থনীতি হিসেবে প্রকাশ পায়। এজন্য প্রয়োজন টেকসই বৈদেশিক শ্রমবাজার এবং দক্ষ শ্রমিক প্রেরণ। যে শ্রম বাজারগুলো বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলো পুনরায় চালু করার জন্য প্রয়োজন কূটনৈতিক তৎপরতা। টেকসই শ্রমবাজার স্থাপন করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
লেখক: অর্থনীতিবিদ এবং চেয়ারম্যান, পলিসি থিংক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ সেন্টার
