আজ ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে দেশের বিভিন্ন স্থান শত্রুমুক্ত হয়েছে। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর।
যশোর: প্রাচীন জেলাগুলোর মধ্যে যশোরেই প্রথম উড়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। ৬ ডিসেম্বর শত্রুমুক্ত হওয়ার পরদিন মুক্তিবাহিনী মুক্ত বীরের বেশে শহরের মাটিতে পা রাখেন। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে শহরবাসীও বিজয়োল্লাসে নেমে আসেন রাস্তায়। ‘জয় বাংলা’ ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ শ্লোগানে মুখর করে তোলে চারদিক।
৭ ডিসেম্বর যশোর মুক্ত দিবস পালন করা হয়ে আসছিল দীর্ঘদিন। ২০১০ সাল থেকে হঠাত্ তা একদিন পিছিয়ে ৬ ডিসেম্বর করা হয়। এ প্রসঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট রবিউল আলম বলেন, আমরা জাসদের উদ্যোগে সর্বপ্রথম ৭ ডিসেম্বর যশোরমুক্ত দিবস পালন শুরু করি। পরবর্তীতে ব্যাপকভাবে দিনটি পালন শুরু হয়। এক পর্যায়ে আমরা উপলব্ধি করি ৬ ডিসেম্বর যেহেতু পাকবাহিনী যশোর ছেড়ে চলে গিয়েছিল, সে কারণে এই তারিখটিই মুক্ত দিবস হওয়া উচিত। জেলা প্রশাসনসহ সকল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সভায় ঐক্যমতের ভিত্তিতে আমরা তারিখটি সংশোধন করেছি।
মুক্ত দিবস উপলক্ষে জেলা প্রশাসন আজ বর্ণাঢ্য র্যালির আয়োজন করেছে।
মেহেরপুর: মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা হামলায় দিগিবদিক হারিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর শেষ দলটি ৫ ডিসেম্বর বিকেল থেকে গোপনে মেহেরপুর ছাড়তে থাকে। পরের দিন ৬ ডিসেম্বর রাজনৈতিক মর্যাদাপূর্ণ মেহেরপুর জেলা হানাদার মুক্ত হয়।
২ ডিসেম্বর গাংনী হানাদারমুক্ত হলে শিকারপুরে (ভারত) অবস্থিত মুক্তিবাহিনীর অ্যাকশন ক্যাম্পের তত্কালীন মেহেরপুর মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) তৌফিক ইলাহী চৌধুরী হাটবোয়ালিয়ায় এসে মুক্তিবাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করেন। মিত্রবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী সম্মিলিতভাবে ৫ ডিসেম্বর মেহেরপুরে প্রবেশ করে। সীমান্তে পাকবাহিনীর পুঁতে রাখা অসংখ্য মাইন অপসারণের মধ্য দিয়ে মেহেরপুর পুরোপুরিভাবে হানাদারমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। এদিকে মেহেরপুর মুক্ত দিবস উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন ও জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ।
ঝিনাইদহ: দক্ষিণ-পশ্চিম রণাঙ্গনে যশোর সেনানিবাসের পর পাক সেনাদের দ্বিতীয় ডিফেন্স লাইন ছিল ঝিনাইদহ। ক্যাডেট কলেজে তারা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু কোনো কিছুই কাজে লাগাতে পারেনি পাক হানাদার ও তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকাররা। ৬ ডিসেম্বর দুপুরে থালা ভর্তি খাবার ফেলে পালিয়ে যায় পাক সেনারা। এদিন ঝিনাইদহ হানাদার মুক্ত হয়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিজয় উল্লাস করতে থাকে।
কুড়িগ্রাম: স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধারা ২৩০ দিন পাকবাহিনীর সঙ্গে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও এদেশিয় রাজাকারদের পরাজিত করে ৬ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত করে অবরুদ্ধ কুড়িগ্রামকে। এদিন পাকবাহিনী গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ট্রেনযোগে কুড়িগ্রাম শহর ছেড়ে রংপুরের দিকে চলে গেলে শত্রুমুক্ত হয় কুড়িগ্রাম। বিকাল সাড়ে ৩টায় কোম্পানি কমান্ডার আব্দুল হাই সরকারের নেতৃত্বে ৩৩৫ জন মুক্তিযোদ্ধা শহরে প্রবেশ করে ওভারহেড পানির ট্যাংকের উপর স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন।
লালমনিরহাট: ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর ৬নং সেক্টরের মিলিটারি ফোর্স (এমএফ) সশস্ত্র গেরিলা বাহিনী (এফএফ) ও মিত্রবাহিনীর ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী, এদেশীয় রাজাকার, আলবদর ও তাদের সহযোগীরা বিপর্যস্ত এবং ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। গভীর রাতে ও ভোরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সৈন্য ও অবাঙালিরা ট্রেনযোগে রংপুর, সৈয়দপুর ও পার্বতীপুরে পালিয়ে যায়। এতে শত্রুমুক্ত হয় লালমনিরহাট। ৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে লালমনিরহাট জেলাকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করা হয়। দিবসটি পালনে জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
হবিগঞ্জ: আজকের এই দিনে পাকবাহিনীর কবল থেকে হবিগঞ্জ মুক্ত হয়। সুবেদার (অব.) আব্দুস শহীদের নেতৃত্বে ৩৩ সদস্যের মুক্তিযোদ্ধা দল বিজয়ীর বেশে হবিগঞ্জ শহরে প্রবেশ করেন। মুক্তিযোদ্ধা দলটি পুরো শহর প্রদক্ষিণ করে হবিগঞ্জ সদর থানা প্রাঙ্গণে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। একই দিন হবিগঞ্জের চুনারুঘাট ও নবীগঞ্জও মুক্ত হয়।
কুলাউড়া (মৌলভীবাজার): কুলাউড়া এই দিনে সর্ম্পূণরূপে শত্রুমুক্ত হয়। এই খবরে ওইদিন শহর ও শহরতলিতে ছাত্র জনতার স্লোগানে মুখর হয়ে উঠে পুরো শহর। এরপর থেকে ওই দিনটিকে কুলাউড়াবাসী শত্রুমুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে আসছে।
দুর্গাপুর (নেত্রকোনা): এই দিনে বাংলার দামাল ছেলেরা ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহযোগিতায় সশস্ত্র রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দুর্গাপুরকে মুক্ত করেন।
১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর বিকাল থেকেই মুক্তিযোদ্ধারা দুর্গাপুর উপজেলার চারদিক ঘিরে ফেলে এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সহায়তায় রাতভর যুদ্ধ করে হানাদার বাহিনীর বিরিশিরি শক্তিশালী ঘাঁটির পতন ঘটায়। ভোর হওয়ার আগেই হানাদার বাহিনী পালিয়ে যায়। ৬ ডিসেম্বর সকাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জয় বাংলা ধ্বনিতে আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হয়। ঝাঁকে ঝাঁকে ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে মুক্তিপাগল জনতা। হানাদারদের ঘাঁটিতে উড়ানো হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা। দিবসটি উপলক্ষে স্বজন সমাবেশ, উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল বিজয় র্যালি, আলোচনা সভাসহ দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে।
কচুয়া (চাঁদপুর): আজকের এই দিনে কচুয়াও শত্রুমুক্ত হয়। দিবসটি পালন উপলক্ষে আয়োজন করা হয়েছে নানা কর্মসূচির।
বড়লেখা (মৌলভীবাজার): ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণে নাকাল পাকহানাদার বড়লেখা ছাড়তে বাধ্য হয়। এদিন ভোরে বড়লেখা সম্পূর্ণ শত্রুমুক্ত হলে বর্তমান উপজেলা পরিষদের সামনে বিজয় সমাবেশ করা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হলেও ওইদিন বড়লেখায় উদিত হয় লাল সবুজের পতাকা।
হানাদারমুক্ত দিবস উপলক্ষে উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড ও সন্তান কমান্ড যৌথভাবে বড়লেখা মুক্ত র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে।
ছাতক (সুনামগঞ্জ): মুক্তিবাহিনীর তীব্র প্রতিরোধের মুখে পাকহানাদার বাহিনী পিছু হঠে বিশ্বনাথের লামাকাজী এলাকায় চলে গেলে মুক্তিযোদ্ধারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ছাতক শহরকে হানাদারমুক্ত ঘোষণা করেন।
