মানুষ শহরে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করলেও, ইউনিভার্সিটি অফ জুরিখের বিবর্তন নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক কলিন শ এবং লাফবোরো ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল লংম্যানের নতুন গবেষণা বলছে, আমাদের দেহের গল্প সম্পূর্ণ আলাদা।
বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল বায়োলজিক্যাল রিভিউস-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় উঠে এসেছে, মানব বিবর্তনের চেয়ে আধুনিক জীবনের গতি অনেক দ্রুত এগিয়েছে, যার ফলে বর্তমানের অনেক স্বাস্থ্য সমস্যা ও ক্রমাগত মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে বিবর্তনের জন্য উপযোগী প্রাকৃতিক পরিবেশ এবং আমাদের বর্তমান শিল্পায়িত পরিবেশের মধ্যে গভীর অমিলের কারণে।
গবেষকরা বলছেন, মানব সভ্যতার কিছু বড় সাফল্য আসলে চুপিসারে আমাদের দেহের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, মস্তিষ্ক, শরীর ও প্রজনন স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে।
কয়েক হাজার বছর ধরে শিকারী-সংগ্রাহক হিসেবে মানুষের জীবনযাপন শারীরিকভাবে কঠোর হলেও তা গাছপালা, খোলা মাঠ, নির্মল বাতাস, সূর্যের আলো ও ঋতুভিত্তিক ছন্দে ভরা আনন্দময় এক প্রাকৃতিক পরিবেশে কাটত। সেই সময়ে চাপ বা স্ট্রেস থাকলেও তা ছিল ক্ষণস্থায়ী; বিপদ চলে গেলে শরীর আবার শান্ত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসত।
তবে আধুনিক জীবনে শোরগোল, স্থায়ী আলো, দূষণ, রাসায়নিক, প্রক্রিয়াজাত খাবার, প্লাস্টিক, যানজট, ফোনের স্ক্রিন ও দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকা ভরপুর। এই পরিবর্তন বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে অসম্ভব দ্রুত ঘটেছে, কিন্তু আমাদের দেহ প্রায় অপরিবর্তিত থেকে গেছে। সমস্যা হচ্ছে, আমাদের শরীর এখনও মানসিক চাপের প্রতি প্রাচীনভাবেই প্রতিক্রিয়া দেখায়।
জোরালো যানজট বা কাজের চাপের মুখোমুখি হলে শরীর এমনভাবে সাড়া দেয় যেন কোনো বিপজ্জনক প্রাণীর মুখে পড়েছে; কিন্তু আধুনিক জীবনে প্রকৃত বিশ্রামের সময় মেলে না, যা মাস ও বছরের পর মাস ধারাবাহিক জীবনযাপনের উত্তেজনা শরীরের জন্য ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই অমিল আমাদের স্বাস্থ্য ও প্রজনন সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্বের নানা দেশে নারীদের প্রজনন সক্ষমতা কমছে এবং মানবদেহে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত রোগ, যেমন অটোইমিউন সমস্যার প্রকোপ বেড়েছে। বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১৯৫০-এর পর থেকে বিশ্বজুড়ে শুক্রাণুর সংখ্যা ও গুণমান কমেছে।
গবেষকরা এই প্রবণতাকে কীটনাশক, প্লাস্টিকের রাসায়নিক এবং খাদ্য ও পানির দূষণের মতো পরিবেশগত কারণের সঙ্গে মিলিয়েছেন। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জৈবিক পরিবর্তনে হাজার হাজার বছর লাগায় মানুষ সহজে এ সমস্যা থেকে বিবর্তনের মাধ্যমে নিজেকে মুক্ত করতে পারবে না। তাই আমাদের পরিবেশকে আমাদের শরীরের উপযোগী করে সাজাতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিক জায়গা রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করা, ঘরের বাইরে আরও সময় কাটানো এবং এমন শহর তৈরি করা, যা নির্মল বাতাস, সবুজ জায়গা, শান্ত এলাকা এবং আরও প্রাকৃতিক আলো দিয়ে মানুষের সুস্থতার খেয়াল রাখবে। গবেষণার মূল বার্তাটি হলো, আধুনিক জীবনে সুস্থ থাকতে মানুষকে সেই প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গেই পুনরায় সংযোগ স্থাপন করতে হবে, যার জন্য আমাদের দেহ বিবর্তিত হয়েছে।

