জাতীয় নির্বাচন ২০২৬

রাঙামাটি ২৯৯ আসনে লড়াই হবে বিএনপি-পিসিজেএসএস, ইতিহাস সৃষ্টির চেষ্টায় জামায়াত

আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:৪৮

আয়তনের দিক দিয়ে দেশের সবচেয়ে বড় জেলার নাম রাঙামাটি। যার আয়তন ছয় হাজার ১১৬ দশমিক ১৩ বর্গকিলোমিটার। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনী ভোটের হাওয়া বইছে পাহাড়ি এ জনপদে। ১০টি উপজেলা, ৫০টি ইউনিয়ন এবং দুইটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ২৯৯ নামের একটি মাত্র আসন। জেলার জনসংখ্যা ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৬ জন। মোট ভোটার ৫ লাখ ১ হাজার ৯৫২ জন। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৯ হাজার ৫৫৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ৪২ হাজার ৩৯৯ জন। 

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫৪ জন। এবার ২৭ হাজার ৫৯৮ জন ভোটার বেড়েছে। ভোটকেন্দ্রের সংখ্যা ২১৩ এবং বুথের সংখ্যা ৯৯৩। গত নির্বাচনে ১৩৬টি কেন্দ্রকে গুরুত্বপূর্ণ এবং দূরত্বের কারণে ১৮টি কেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে রাঙামাটি আসনটি বেশির ভাগ পতিত আওয়ামীলীগের দুর্গ হিসেবে বেশি পরিচিত। এরশাদ সরকারের পতনের পর পঞ্চম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে ১৯৯১ সালে আওয়ামীলীগের প্রার্থী বিজয়ী লাভ করেছিলো। এরপর সপ্তম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে ১৯৯৬ সালে আবারো আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী লাভ করে। মাঝে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির প্রার্থী বিজয় লাভ করে।

২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফের বিজয়ী হয়। এরপর ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হেরে যান অনিবন্ধিত আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রার্থীর কাছে। এরপর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ফের হারানো আসন আবারো ফিরে পান। সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে এ আসনে কোন রাজনৈতিক দল অংশ না নিলে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় লাভ করে। 

অর্থাৎ রাঙামাটি ২৯৯ আসনে পাঁচবার আওয়ামী লীগ, একবার বিএনপি এবং একবার আঞ্চলিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমর্থিত প্রার্থী বিজয়ী হয়। যে কারণে এ আসনটি আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাটি হিসেবে পুরো দেশে পরিচিত। 

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারায় রাঙামাটি ২৯৯ আসনটি পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন দীপেন দেওয়ান।

বিএনপির প্রার্থী দীপেন দেওয়ান নির্বাচনী প্রচারণাকালে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছি। যেখানের যাচ্ছি মানুষ আমাদের সাথে কথা বলছে। আমরা এটা বলতে চাই জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের মানুষের উন্নয়নে কাজ করবে।

অপরদিকে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে জামায়াত এ আসনে তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা ও শক্তি অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বহুগুণ বাড়িয়েছে। এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন রাঙামাটির জৈষ্ঠ আইনজীবি মোখতার আহম্মদ। 

শুরু থেকে দলটি পুরো জেলায় সাধারণ ভোটারদের কাছে টানতে ব্যতিক্রমধর্মী প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অতীতে দলটি রাঙামাটি ২৯৯ আসনে ১৯৮৬ সাল এবং ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী দিয়েছিলেন। তবে এ আসনে দলটির প্রার্থী তেমন কোন সুবিধা করতে পারিনি।

জামায়াতের প্রার্থী এ্যাডভোকেট মোখতার আহম্মদ বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে জনগণ আমাদের সুযোগ দিলে রাঙামাটির পাহাড়ি ও সমতল সকল মানুষের সমান অধিকার নিশ্চিত করা হবে। এলাকার দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন,শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সুযোগ বৃদ্ধিসহ বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।’

২৯৯ আসনে ভোটের সকল হিসেব যারা বদলিয়ে দেন সেই আঞ্চলিক সংগঠনটির নাম সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)। সংগঠনটির প্রার্থী ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন। তবে সেই সময় সংগঠনটির পাশে আরেকটি আঞ্চলকি স্বশস্ত্র সংগঠন তাদের চিরচেনা শত্রু  প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)-কে পাশে পেয়েছিলেন। 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৯৯ আসনে সন্তু লারমার পিসিজেএসএস’র কোন প্রচার-প্রচারণা দেখা যাচ্ছে না। তবে সংগঠনটির উদ্যোগে চলতি বছরের ২ ডিসেম্বর শান্তিচুক্তি বর্ষপূর্তি অনুষ্ঠানে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি অংশ নিবেন বলে জানান দলটির নেতা সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার। 

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদীয় নির্বাচনে রাঙামাটি ২৯৯ আসনে নির্বাচনী যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সংগঠনটির জেলা কমিটির সভাপতি জসিম উদ্দিন। তিনি হাত পাখা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন। তিনি বলেন, ‘আমার দলের নেতাকর্মীরা মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। আমরা ভাল সাঁড়া পাচ্ছি। সাধারণ মানুষ আমাদের আহ্বানে যেভাবে সাঁড়া দিচ্ছে তাতে আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’

তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ তো আছে। বিভিন্ন উপজেলায় গিয়ে প্রচারণা চালানোর সময় একটি দলের নেতাকর্মীরা তার দলের নেতাকর্মীদেরকে হুমকির মাধ্যমে নিভৃত করতে চাচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন।’ তবে সে দলটার নাম বলতে চাননি তিনি। এছাড়াও নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকবে কিনা সে ব্যাপারে তারা দ্বিধাগ্রস্থ। নির্বাচনে আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনগুলোতো আছেই বলে যোগ করেন এই প্রার্থী। 

ওই আসনে বিপ্লবী ওয়াকার্স পার্টির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও সংগঠনটির সাত দলীয় জোটের গণতন্ত্র মঞ্চের হয়ে একমাত্র নারী প্রার্থী জুঁই চাকমা কোদাল প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছেন। তিনি এর আগে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

গণতন্ত্র মঞ্চের প্রার্থী জুঁই চাকমা বলেন, ‘আমরা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির দল। আমরা মেহেনতি মানুষের ভাগ্যর উন্নয়নে জন্য কাজ করি। আশাকরছি সাধারণ মানুষ এইবার পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলবে। ঝুঁকিপূর্ণ দুর্গম ভোট কেন্দ্রগুলোতে নিরাত্তার স্বার্থে সেনাবাহিনী মোতায়েনের জোর দাবি জানান এ সংসদ সদস্য প্রার্থী।’

এইদিকে এই আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) জেলা কমিটির সদস্য প্রিয় চাকমা শাপলা কলি প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবেন।  

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি দলটির বিশাল কর্মী ও সমর্থক বাহিনী রয়েছে। জামায়াতও এইবারের নির্বাচনে রাঙামাটি আসনে বড় শক্তির দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে দলটি দ্রুত সময়ের মধ্যে রাঙামাটিতে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি করেছে। পাহাড়ি জনগণ ভিত্তিক সংগঠন পিসিজেএসএসও বড় শক্তির দল। ভোট যুদ্ধের মূল লড়াইটা হবে বিএনপি-পিসেজেএসএস প্রার্থীর মধ্যে। বর্তমান প্রেক্ষাপট, শক্ত অবস্থান, শক্তিশালী সংগঠন তৈরি করায় জামায়াত এ আসনটা ছাড় দিবে না। যদি জামায়াত এ আসনে জিতে যায় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ইত্তেফাক/কেএইচ