রবীন্দ্রনাথের ভাষাচিন্তা

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৯, ১৯:৪৫

ঔপনিবেশিকতা ও রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) জীবন কেটেছিল ব্রিটিশ ভারতে। তাঁর জন্মের বছর তিনেক আগেই ভারতে রানির শাসন জারি হয়। বলা যায়, তাঁর জন্ম হয়েছিল ঔপনিবেশিক শাসনের স্বর্ণযুগে। পারিবারিক অভিজ্ঞতার মধ্যে—প্রধানত পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর আর অগ্রজ সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কল্যাণে—ব্রিটিশ শাসনের আর্থিক-প্রশাসনিক চালচিত্র খুব কাছে থেকে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন তিনি। আবার কলকাতায় জাতীয়তাবাদী চিন্তাচেতনা ও কর্মকাণ্ডের সূচনাপর্বেই এর সঙ্গে তিনি যুক্ত হয়ে যান—প্রধানত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সূত্রে। আমৃত্যু তিনি উপনিবেশিত কলকাতার উত্পাদন-বণ্টন থেকে শুরু করে রাজনীতি-সংস্কৃতির কেন্দ্রভাগে সক্রিয়ভাবে উপস্থিত ছিলেন। এই সক্রিয়তার পরিচয় মুদ্রিত হয়ে আছে তাঁর বিপুলসংখ্যক প্রবন্ধে। সৃজনশীল রচনায়ও তার প্রত্যক্ষ ছাপ পড়েছে। ইংরেজশাসন সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের একধরনের মোহ ছিল। মোহটা এসেছে পশ্চিমা সভ্যতার সংস্পর্শের সুযোগ আর এর ফলে কলকাতায় বিকশিত নতুন চিন্তাচেতনার বরাতে। আবার এ সম্পর্কে তাঁর একধরনের দ্বিধাও ছিল। ঔপনিবেশিক শাসনের প্রত্যক্ষ নানা অভিজ্ঞতা—প্রধানত শাসকগোষ্ঠীর বর্ণবাদী আচরণ আর দমন-নিপীড়ন—সেই দ্বিধার উত্স। ১৩৪৮ সালের পয়লা বৈশাখ জন্মোত্সবে পঠিত ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধে ঔপনিবেশিক শাসনে তাঁর আকাঙ্ক্ষার রূপ আর হতাশার চিত্র সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। 

রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কৈশোর কেটেছে এমন এক ভারতবর্ষে যেখানে অন্তত শিক্ষিত ভদ্রসমাজ ইংরেজশাসনকে স্বাভাবিক বলেই মেনে নিয়েছিলেন। ফলে তাঁদের আকাঙ্ক্ষা ছিল মূলত শাসিতের প্রতি শাসকের সদয় আচরণ। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসন স্বভাবতই বর্ণবাদী আর নিপীড়ক। এ অবস্থায় উপনিবেশিতের উচ্চারণ প্রায়শই অভিমানে রূপ নিয়েছে। ‘রাজা প্রজা’ গ্রন্থের ‘ইংরাজ ও ভারতবাসী’ (১৩০০) প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথের মন্তব্যে সেই অভিমানেরই প্রকাশ ঘটেছে :

মানুষের অত্যন্ত কাছে যাইবার যে ক্ষমতা সে একটা দুর্লভ ক্ষমতা। ইংরাজের বিস্তর ক্ষমতা আছে, কিন্তু সেইটি নাই। সে বরঞ্চ উপকার করিতে অসম্মত নহে, কিন্তু কিছুতেই কাছে আসিতে চাহে না। কোনোমতে উপকারটা সারিয়া ফেলিয়া অমনি তাড়াতাড়ি সরিতে পারিলে বাঁচে। (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/৫: ৬৭৭)

  কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের নানা প্রত্যক্ষ চিহ্ন শাসিতের বিশ্বাসে চিড় ধরাতে থাকে। বিশেষত যখন সুশাসন বা ন্যায়বিচারের মতো ঔপনিবেশিক শাসনের মূল দোহাইগুলোও বর্ণবাদী আচরণ থেকে রেহাই পায় না। রবীন্দ্রনাথ আইন ও বিচারের ক্ষেত্রে এরূপ বর্ণবাদী দ্বিরাচারের উল্লেখ করেছেন। ‘রাজা প্রজা’ গ্রন্থের ‘অপমানের প্রতিকার’ (১৩০১) প্রবন্ধে লিখেছেন :

স্বজাতীয় প্রাণের পবিত্রতা তাঁহারা মনে মনে অত্যন্ত অধিক করিয়া উপলব্ধি করেন। একজন ইংরাজ ভারতবর্ষীয়কে হত্যা করিলে নিঃসন্দেহে তাঁহারা দুঃখিত হন। ... কিন্তু তাই বলিয়া তাহার শাস্তিস্বরূপে য়ুরোপীয়ের প্রাণ হরণ করা তাঁহারা সমুচিত মনে করিতে পারেন না। ... যে জাতিকে নিজেদের অপেক্ষা অনেক নিকৃষ্টতর বলিয়া বিবেচনা করা যায় সে জাতি সম্বন্ধে আইনের ধারায় অপক্ষপাতের বিধান থাকিলেও বিচারকের অন্তঃকরণে অপক্ষপাত রক্ষিত হওয়া কঠিন হইয়া উঠে। সে স্থলে প্রমাণের সামান্য ত্রুটি, সাক্ষ্যের সামান্য স্খলন এবং আইনের ভাষাগত তিলমাত্র ছিদ্রও স্বভাবতই এত বৃহত্ হইয়া উঠে যে, ইংরাজ অপরাধী অনায়াসে তাহার মধ্যে দিয়া গলিয়া বাহির হইয়া যাইতে পারে। (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/৫: ৬৯৮-৯৯)

এখানে ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তর্গত বর্ণবাদ সম্পর্কে তাঁর নিরাসক্ত কিন্তু পরিচ্ছন্ন মত প্রকাশিত হয়েছে। অন্যত্র, সাম্রাজ্যবাদকে তিনি দেখেছেন ভাবাদর্শ হিসাবে। ‘সাহিত্যের পথে’ বইয়ের ‘বাস্তব’ (১৩২১) প্রবন্ধে লিখেছেন :‘বর্তমান সময়ে কতকগুলি বিশেষ কারণে হিন্দু আপনার হিন্দুত্ব লইয়া ভয়ংকর রুখিয়া উঠিয়াছে। ... অন্য দেশেও এমন ঘটে। ইংলন্ডে ইম্পীরিয়ালিজেমর জ্বরোত্তাপ যখন ঘণ্টায় ঘণ্টায় চড়িয়া উঠিতেছিল তখন একদল ইংরেজ কবির কাব্যে তাহারই রক্তবর্ণ বাস্তবতা প্রলাপ বকিতেছিল’ (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/১২: ৪৪৭)। বোঝা যায়, সাম্রাজ্যবাদকে তিনি ভাবাদর্শ হিসেবে দেখেছেন, কিন্তু উপনিবেশের সঙ্গে একে কোনো আবশ্যিক-সম্পর্কে সম্পর্কিত করেননি। অর্থাত্ সাম্রাজ্যবাদী না হয়ে নীতি ও নিষ্ঠার সঙ্গে পরদেশ শাসন করা, তাঁর মতে, সম্ভবপর। সাম্রাজ্যবাদকে ভাবাদর্শ-আকারে বোঝার ও ব্যাখ্যা করার গভীর অন্তর্দৃষ্টি ফুটে উঠেছে ‘রাজা প্রজা’ গ্রন্থের ‘ইম্পীরিয়ালিজ্ম্’ (১৩১২) প্রবন্ধে :

বিলাতে ইম্পীরিয়লিজমের একটা নেশা ধরিয়াছে। অধীন দেশ ও উপনিবেশ প্রভৃতি জড়াইয়া ইংরেজ-সাম্রাজ্যকে একটা বৃহত্ উপসর্গ করিয়া তুলিবার ধ্যানে সে দেশে অনেকে নিযুক্ত আছেন। ... ভারতবর্ষের মতো এতবড়ো দেশকে এক করিয়া তোলার মধ্যে একটা গৌরব আছে। ইহাকে চেষ্টা করিয়া বিচ্ছিন্ন রাখা ইংরেজের মতো অভিমানী জাতির পক্ষে লজ্জার কথা।

কিন্তু ইম্পীরিয়লিজ্ম্-মন্ত্রে লজ্জা দূর হয়। ব্রিটিশ এম্পায়ারের মধ্যে এক হইয়া যাওয়াই ভারতবর্ষের পক্ষে যখন পরমার্থলাভ তখন সেই মহদুদ্দেশ্যে ইহাকে জাঁতায় পিষিয়া বিশ্লিষ্ট করাই ‘হিয়ুম্যানিটি’! (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/৫: ৭১২-৭১৪)

১৩১২ সালে লেখা এ প্রবন্ধে লেখক সাম্রাজ্যবাদের ভাবাদর্শ সম্পর্কে গভীর প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন। এই আদর্শ যে বড় অন্যায় বৈধ করার অজুহাত হিসাবে বড় বড় বুলি তৈরি করে, সেকথাও পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। প্রবন্ধের শেষে গ্রিক ইতিহাসবেত্তা থুকিদিদিসের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন :‘ইম্পীরিয়লিজ্ম্তত্ত্ব য়ুরোপে [অতি] প্রাচীন এবং যে পলিটিকেসর ভিত্তির উপরে ইয়ুরোপীয় সভ্যতা গঠিত তাহার মধ্যে... নিদারুণ ক্রূরতা প্রচ্ছন্ন আছে’। (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/৫: ৭১৪) 

   অবশ্য শেষ পর্যন্ত এই মতাদর্শকে কেন্দ্রের কিছু লোকের মতাদর্শ হিসাবেই তিনি দেখেছেন, যা জয়ী হয়েছে, বা রাজত্বের মূল আদর্শ হিসাবে কাজ করছে। উপনিবেশ ও সাম্রাজ্যবাদের অনিবার্য সম্পর্কের ধারণায় তিনি পৌঁছাননি। তবে তাঁর লেখায় আধুনিক উপনিবেশের বিশেষত্ব আর এর সঙ্গে বাণিজ্যের যোগ খুব পরিষ্কার ভাষায় বর্ণিত হয়েছে। কালান্তর গ্রন্থের ‘লড়াইয়ের মূল’ (১৩২১) প্রবন্ধে লিখেছেন :

সম্প্রতি পৃথিবীতে বৈশ্যরাজক যুগের পত্তন হইয়াছে। বাণিজ্য এখন আর নিছক বাণিজ্য নহে, সাম্রাজ্যের সঙ্গে একদিন তার গান্ধর্ব বিবাহ ঘটিয়া গেছে। এক সময়ে জিনিসই ছিল বৈশ্যের সম্পত্তি, এখন মানুষ তার সম্পত্তি হইয়াছে। ...

ইহাতে পৃথিবীর ইতিহাসে সম্পূর্ণ একটা নূতন কাণ্ড ঘটিতেছে—তাহা এক দেশের উপর আর-এক দেশের রাজত্ব এবং সেই দুই দেশ সমুদ্রের দুই পারে। এত বড়ো বিপুল প্রভুত্ব জগতে আর-কখনো ছিল না। ইয়ুরোপের সেই প্রভুত্বের ক্ষেত্র এশিয়া ও আফ্রিকা। (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/১২: ৫৮৪)

   বাস্তব পরিস্থিতি ও কর্তব্যের ক্ষেত্রে আন্তরিক ছিলেন বলে রবীন্দ্রনাথ উপনিবেশায়নের অনেক গোপন-গভীর দিকও শনাক্ত করতে পেরেছেন, যদিও পরবর্তীকালে উপনিবেশশাস্ত্রে এগুলোর যেরকম নামায়ন হয়েছে, তাঁর লেখায় সঙ্গতকারণেই সেই নাম-পরিচয় পাওয়া যায় না। যেমন ‘শিক্ষা’ গ্রন্থের ‘মুসলমান ছাত্রের বাংলা শিক্ষা’ (১৩০৭) প্রবন্ধে বিদ্যালয়-পাঠ্য ইতিহাস বইতে মুসলিম-ভারতবর্ষের ইতিহাস যে আদতে ইংরেজদের বানানো, সেকথা উল্লেখ করেছেন। লিখেছেন :

ইংরেজ লেখকের সকল প্রকার ব্যক্তিগত ও জাতিগত সংস্কার আমরা শিরোধার্য করিয়া লইতে বাধ্য, এবং সেই-সকল সংস্কারের বিরুদ্ধে কোনো বাংলা বই রচিত হইলে তাহা কোনো বিদ্যালয়ে প্রচলিত হইবার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। ... অনেক আধুনিক বাঙালি ঐতিহাসিক মুসলমান রাজত্বের ইতিহাসকে ইংরাজ-তুলিকার কালিমা হইতে মুক্ত করিবার জন্য চেষ্টা করিতেছেন। অক্ষয়বাবু তাঁহার সিরাজচরিতে অন্ধকূপহত্যাকে প্রায় অপ্রমাণ করিতে কৃতকার্য হইয়াছেন কিন্তু প্রমাণ যতই অমূলক বা তুচ্ছ হউক পরীক্ষাতিতীর্ষু বালক মাত্রই অন্ধকূপহত্যা ব্যাপারকে অসন্দিগ্ধ সত্য বলিয়া স্বীকার করিতে বাধ্য। (রবীন্দ্রনাথ ২০০৬/১৭: ৩৮৩-৩৮৪)

এখানে রবীন্দ্রনাথ ইতিহাস-প্রণয়নকে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেননি, বরং ইংরেজ ঐতিহাসিকদের ব্যক্তিগত বা সামষ্টিক অভিরুচি হিসেবে দেখেছেন। তা হলেও মনঃস্তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের ব্যাপকতা এবং উপনিবেশিতদের উপর তার প্রত্যক্ষ প্রভাবকে তিনি ঠিকঠাক শনাক্ত করেছেন। এক্ষেত্রে উপনিবেশিতদের কর্তব্যও তিনি নির্দেশ করেছেন, যাকে বি-উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়া বলা যায়।

সৃষ্টিশীল রচনাসহ রবীন্দ্রনাথের বিপুল প্রাবন্ধিক গদ্যে উপনিবেশায়ন, ভারতীয় ঔপনিবেশিক শাসন আর বি-উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়া সম্পর্কে আরো নানা মত-মন্তব্য-বিশ্লেষণ পাওয়া যাবে। কিন্তু বাংলা ভাষাপ্রশ্নে তাঁর এ ধরনের উচ্চারণ এত জোরালো আর পৌনঃপুনিক এবং বাংলা ভাষার বি-উপনিবেশায়নের ক্ষেত্রে তাঁর ব্যক্তিগত তত্পরতা এত গুরুত্বপূর্ণ যে অন্য কোনো ব্যাপারের সঙ্গে তার তুলনা চলে না।

উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যে বাংলা গদ্য-সাহিত্যের সূত্রপাত হয়েছিল, সে সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ নিশ্চিত ছিলেন। ‘বাংলা শব্দতত্ত্ব’ বইয়ের ‘ভাষার কথা’ (১৩২৩) প্রবন্ধে তিনি শুধু সেই উল্লেখই করেননি, এর ফল সম্পর্কেও মন্তব্য করেছেন :

বাংলা গদ্য-সাহিত্যের সূত্রপাত হইল বিদেশীর ফরমাশে, এবং তার সূত্রধার হইলেন সংস্কৃত পণ্ডিত, বাংলা ভাষার সঙ্গে যাঁদের ভাসুর-ভাদ্রবউয়ের সম্বন্ধ। তাঁরা এ ভাষার কখনো মুখদর্শন করেন নাই। এই সজীব ভাষা তাঁদের কাছে ঘোমটার ভিতরে আড়ষ্ট হইয়া ছিল, সেইজন্য ইহাকে তাঁরা আমল দিলেন না। তাঁরা সংস্কৃত ব্যাকরণের হাতুড়ি পিটিয়া নিজের হাতে এমন একটা পদার্থ খাড়া করিলেন যাহার কেবল বিধিই আছে কিন্তু গতি নাই। সীতাকে নির্বাসন দিয়া যজ্ঞকর্তার ফরমাশে তাঁরা সোনার সীতা গড়িলেন। (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২:৩)

প্রাণহীন কৃত্রিম গদ্য তৈরি হয়েছিল বলেই বাংলা গদ্যের জন্য শেষ পর্যন্ত তা সুখকর হয়নি। তাঁর মতে, স্বভাবের তাগিদে সৃষ্টি হলে গোড়ায় হয়তো গদ্য কাঁচাভাবে শুরু হতো, কিন্তু ক্রমে ক্রমে দৃঢ় ভিত্তির ওপর তা দাঁড়াতে পারত। ‘প্রাকৃত বাংলা বাড়িয়া উঠিতে উঠিতে প্রয়োজনমত সংস্কৃত ভাষার ভাণ্ডার হইতে আপন অভাব দূর করিয়া লইত’। পরিষ্কার বোঝা যায়, সংস্কৃত-পণ্ডিত বা সংস্কৃত ভাষার সঙ্গে এ বর্ণনাকারীর কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ একটি প্রক্রিয়ার সঙ্গে—যে প্রক্রিয়ায় একটি ভাষার গদ্যরূপ গড়ে উঠছে সে ভাষার প্রাণধর্ম বা প্রকৃতির স্বীকৃতি ছাড়াই। শুধু যে প্রাণধর্ম অস্বীকৃত হয়েছে তা নয়। নতুন গদ্যের উপাদান হিসেবে বাংলা ভাষার পরিমাণটাও হয়েছে খুব সামান্য : ‘গোড়ায় দেখি তা সংস্কৃত ভাষা, কেবল তাহাকে বাংলার নামে চালাইবার জন্য কিছু সামান্য পরিমাণে তাহাতে বাংলার খাদ মিশাল করা হইয়াছে। এ একরকম ঠকানো। বিদেশীর কাছে এ প্রতারণা সহজেই চলিয়াছিল’ (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ৩-৪)। তাহলে ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ার মধ্যে কারিগর হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা, আর ফরমাশকারী হিসেবে সাহেবপক্ষ। এ দুইপক্ষের ভাষানীতির কারণে বাংলা গদ্য শুরুতেই অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হলো :

অল্প মূলধনে ব্যবসা আরম্ভ করিয়া ক্রমশ মুনাফার সঙ্গে সঙ্গে মূলধনকে বাড়াইয়া তোলা, ইহাই ব্যবসার স্বাভাবিক প্রণালী। কিন্তু বাংলা-গদ্যের ব্যবসা মূলধন লইয়া শুরু হয় নাই, মস্ত একটা দেনা লইয়া তার শুরু। সেই দেনাটা খোলসা করিয়া দিয়া স্বাধীন হইয়া উঠিবার জন্যই তার চেষ্টা। (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ৪)

 বাংলা গদ্য যে শেষ পর্যন্ত সেই চেষ্টায় কতকটা সফল হয়েছে, তার কারণ ঔপনিবেশিক প্রক্রিয়ায় বিশেষ ধরনের বাংলা গদ্যের জন্ম হয়েছে, সামগ্রিক বাংলা ভাষার নয়। বাংলা ভাষা-ব্যবহারকারীরা ক্রমে উপনিবেশিত গদ্যের ফাঁক ও ফাঁকি কাটিয়ে উঠতে পেরেছেন, কারণ বাংলাভাষীদের কাছে নিজেদের ভাষার সজীব উপস্থিতির নজির সবসময়েই হাজির ছিল:

যদি কেবল ইংরেজকে বাংলা শিখাইবার জন্যই বাংলা গদ্যের ব্যবহার হইত, তবে সেই মেকি-বাংলার ফাঁকি আজ পর্যন্ত ধরা পড়িত না। কিন্তু এই গদ্য যতই বাঙালির ব্যবহারে আসিয়াছে ততই তাহার রূপ পরিবর্তন হইয়াছে। এই পরিবর্তনের গতি কোন দিকে? প্রাকৃত বাংলার দিকে। আজ পর্যন্ত বাংলা গদ্য, সংস্কৃত ভাষার বাধা ভেদ করিয়া, নিজের যথার্থ আকৃতি ও প্রকৃতি প্রকাশ করিবার জন্য যুঝিয়া আসিতেছে। (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ৪)

উদ্ধৃত অংশের শেষ বাক্যটি লক্ষণীয়। এখানে সংস্কৃত ভাষার আধিপত্যের কথা আছে, যে আধিপত্য তৈরি হয়েছে, তাঁর মতে, ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে। সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির জন্য বাংলা গদ্যের লড়াইয়ের কথাও বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও আসলে এই চলমান লড়াইয়ে অংশ নিয়ে বাংলা গদ্যের মুক্তির উদ্দেশে একদিকে তাত্ত্বিক কাঠামো তৈরি করেছেন, অন্যদিকে বাস্তব প্রয়োগের জন্য যথাসাধ্য কাজ করেছেন। কাজের মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে বলেই ঔপনিবেশিক পরিস্থিতিতে বাংলা ভাষাচর্চার অন্য যেসব সংকট তৈরি হয়েছে, তা শনাক্ত করতেও তাঁর বেগ পেতে হয়নি। ‘ভাষার কথা’ প্রবন্ধে  ইংরেজির প্রচণ্ড প্রতাপের মধ্যে বাংলাচর্চা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তার ফিরিস্তি দিয়েছেন এভাবে :

অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালেও আমাদের দেশে ভাষা ও চিন্তার মধ্যে এইরূপ দ্বন্দ্ব চলিয়া আসিয়াছে। যাঁরা ইংরেজিতে শিক্ষা পাইয়াছেন তাঁদের পক্ষে ইংরেজিতেই চিন্তা করা সহজ; বিশেষত যে-সকল ভাব ও বিষয় ইংরেজি হইতেই তাঁরা প্রথম লাভ করিয়াছেন সেগুলা বাংলা ভাষায় ব্যবহার করা দুঃসাধ্য। কাজেই আমাদের ইংরেজি শিক্ষা ও বাংলা ভাষা সদরে অন্দরে স্বতন্ত্র হইয়া বাস করিয়া আসিতেছে। (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ৪-৫)

রবীন্দ্রনাথ এখানে ভাবের তথা মনঃস্তাত্ত্বিক-সাংস্কৃতিক উপনিবেশায়নের কথাই বলেছেন এবং সঙ্গত কারণেই এর সঙ্গে বাংলা ভাষাচর্চার চলমান ধারার যোগ আবিষ্কার করেছেন। 

বাংলা গদ্যের উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়া ব্যাখ্যার সময়ে রবীন্দ্রনাথ ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’, ‘সংস্কৃত পণ্ডিত’ কিংবা ‘বিদেশী রাজা’ কথাগুলো সবসময়ে আক্ষরিক অর্থে ব্যবহার করেননি। অন্তত ঐতিহাসিক কালক্রম আর হিসাব-নিকাশের সূক্ষ্ম মাপে কথাগুলোতে ভুল বের করা সম্ভব। অনেকসময়ে তাঁকে সংস্কৃত-বিরোধী বলে মনে হতে পারে, যদি কোনো একটি লেখা থেকে কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য উদ্ধৃত করা হয়। আবার তাঁকে ‘পাণ্ডিত্য’ বা ‘পণ্ডিত’-বিরোধীও মনে হতে পারে, যেমন মনে হয়েছে কেতকী কুশারী ডাইসনের। রবীন্দ্রনাথ একবার লিখেছিলেন, ‘বর্তমান সাধু বাংলা গদ্য ভাষার ক্রিয়াপদগুলি গড় উইলিয়মের পণ্ডিতদের হাতে ক্ল্যাসিক ভঙ্গির কাঠিন্য নিয়েছে’ (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ২৮৩)। প্রত্যুত্তরে দেবপ্রসাদ ঘোষ বহু উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, অন্তত বাংলা সাধু ক্রিয়াপদের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের এ বক্তব্য ঠিক নয় (দেবপ্রসাদ ১৯৯৭: ১৮০-৮৬)। এভাবে বিচ্ছিন্ন মন্তব্য, তথ্য আর ঐতিহাসিক ধারাক্রমের ক্ষেত্রে দীর্ঘ কাল-পরিসরে রচিত রবীন্দ্রনাথের লেখাগুলো থেকে এমনকি স্ববিরোধও আবিষ্কার করা সম্ভব। কিন্তু বাংলা ভাষার উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়ায় বাংলা ভাষার প্রকৃতি যে উপেক্ষিত হয়েছে, আর তার ফলে বাংলা ভাষাচর্চায় দুরপনেয় সংকট তৈরি হয়েছে, সে ব্যাপারে তিনি নিজে যেমন নিশ্চিত ছিলেন, তেমনি অন্য ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণেও তার জোরালো সমর্থন মেলে। রবীন্দ্রনাথ সেই সংকটকে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন, আর সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কাজ করেছেন। তাঁর চিন্তা ও কাজের ধরন বোঝা যাবে ভাষা-বিষয়ক রচনার যে কোনো অংশ থেকেই। ‘বাংলা ব্যাকরণ’ (১৩০৮) প্রবন্ধ থেকে বানান-সংক্রান্ত একটা অংশ নিচে উদ্ধৃত হলো :  

আমরা জড়-এর জ এবং যখন-এর য একই রকম উচ্চারণ করি, আলাদারকম লিখি। উপায় নাই। শিশু বাংলাগদ্যের ধাত্রী ছিলেন যাঁহারা, তাঁহারা এই কাণ্ড করিয়া রাখিয়াছেন। সাবেক কালে যখন শব্দটাকে বর্গ্য জ দিয়ে লেখা চলিত—ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের পণ্ডিতরা সংস্কৃতের যত্ শব্দের অনুরোধে বর্গ্য জ-কে অন্তস্থ য করিয়া লইলেন, অথচ ক্ষণ শব্দের মূর্ধন্য ণ-কে বাংলায় দন্ত্য ন-ই রাখলেন। ... সৌভাগ্যক্রমে আধুনিক পণ্ডিতরা খাঁটি বাংলা শব্দকে অবজ্ঞা করিয়া তাঁহাদের রচনাপঙিক্তর মধ্যে পারতপক্ষে স্থান দেন নাই—কেবল যে-সকল ক্রিয়া ও অব্যয়পদ নহিলে নয়, সেইগুলাকে সংস্কৃত বানানের দ্বারা যথাসাধ্য শোধন করিয়া লইয়া তবে তাঁহাদের লেখার মধ্যে প্রবেশ করিতে দিয়াছেন। এইজন্য অধিকাংশ খাস বাংলা কথা সম্বন্ধে এখনো আমাদের অভ্যাস খারাপ হয় নাই; সেগুলার খাঁটি বাংলা বানান চালাইবার সময় এখনো আছে। (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ১১৪)

পণ্ডিতেরা সত্যি সত্যি ক্রিয়া আর অব্যয়পদের বাইরে অন্য ‘বাংলা’ শব্দ ব্যবহার করেছিলেন কি না, বা ক্রিয়া ও অব্যয়পদের সবগুলো সংস্কৃত-অনুযায়ী সংশোধন করেছিলেন কি না, সে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু এ অংশে রবীন্দ্রনাথের সিদ্ধান্তটি পরিষ্কার : উপনিবেশায়নপর্বে বাংলা বানান-নির্ধারণের ক্ষেত্রে বাংলার যুক্তি ব্যবহূত হয়নি; আর সংস্কৃতের যুক্তিতে যা করা হয়েছে, তাতেও সাম্য রক্ষিত হয়নি। তাঁর লক্ষ্যও পরিচ্ছন্ন :বাংলা বানানের সরলতা, ব্যবহারযোগ্যতা আর সাম্য আনার লক্ষ্যে বাংলার নিজস্ব প্রকৃতির শরণ নেওয়া দরকার। সেদিক থেকে সংস্কৃত-পণ্ডিতেরা যে প্রাকৃত বাংলা পারতপক্ষে ব্যবহার করেননি, তা তাঁর কাছে সুবিধাজনকই মনে হয়েছে। কারণ, এতে করে শব্দগুলো উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়ার আওতায় পড়েনি।

বাংলা ভাষাচর্চার নানা দিকের মতো বাংলা গদ্যচর্চার ধারাবাহিকতায়ও রবীন্দ্রনাথ আবিষ্কার করেছেন উপনিবেশায়নের অব্যাহত কুফল। এ সংকট থেকে, তাঁর মতে, এমনকি বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্রও রেহাই পাননি। ‘বাংলা কথ্যভাষা’ (১৩৫০) প্রবন্ধে উপনিবেশিত গদ্যচর্চার গোড়ার সংকট উঠে এসেছে :

যখন বাংলা ভাষায় গদ্যসাহিত্যের অবতারণা হল তার ভার নিলেন সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত। দেশের ছেলেমেয়েদের মুখে মুখে প্রতিদিন যে গদ্যবাণী প্রবাহিত হচ্চে তাকে বহুদূরে রেখে সংস্কৃত সরোবর থেকে তাঁরা নালা কেটে যে ভাষার ধারা আনলেন তাকেই নাম দিলেন সাধুভাষা। বাংলা গদ্য সাহিত্যিক ভাষাটা বাঙালির প্রাণের ভিতর থেকে স্বভাবের নিয়মে গড়ে ওঠে নি, এটা ফরমাসে গড়া। বাঙালির রসময় রসনাকে ধিক্কার দিয়ে পণ্ডিতের লেখনী বলে উঠল গদ্য আমি সৃষ্টি করব। তলব দিলে অমরকোষকে, মুগ্ধবোধকে। সে হল একটা অনাসৃষ্টি। তার পর থেকে ক্রমাগতই চেষ্টা চলছে কি করে ভাষার ভিতরকার এই একটা বিদ্ঘুটে অসামঞ্জস্যটাকে মিলিয়ে দেওয়া যেতে পারে। বিদ্যাসাগর তাকে কিছু পরিমাণে মোলায়েম করে আনলেন—কিন্তু বঙ্গবাণী তবু বললেন ‘এহ বাহ্য’। তার পরে এলেন বঙ্কিম। তিনি ভাষার সাধুতার চেয়ে সত্যতার প্রতি বেশি ঝোঁক দেওয়াতে তখনকার কালের পণ্ডিতেরা দুই হাত তুলে বোপদেব অমরের দোহাই পেড়েছিলেন। বঙ্কিমের সেই দুর্গেশনন্দিনী’র ভাষাও আজ প্রায় মরা গাঙের ভাষা হয়ে এসেছে—এখনকার সাহিত্যে ঠিক সেই ভাষার স্রোত চলচে না। অর্থাত্ বাংলা গদ্যসাহিত্যের গোড়ায় যে একটা original sin ঘটেছে কেবলি সেটাকে ক্ষালন করতে হচ্চে। (রবীন্দ্রনাথ ১৪০২: ২২৮-২৯)

বাংলা ভাষা ও গদ্যসাহিত্যের ইতিহাসের এই ক্ষণটিকে ব্যাখ্যা করার জন্য original sin বা ‘আদিপাপ’ কথাটা ব্যবহার করে রবীন্দ্রনাথ মূলত ব্যাপারটির তীব্রতা ও অব্যাহত প্রভাবের কথাই বলতে চেয়েছেন। এই তীব্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে তিনি আসলে বাংলা ভাষাপ্রশ্নে বিপ্লবীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এমনিতে রবীন্দ্রনাথের চিন্তা ও কাজের প্রণালী বিপ্লবী ঘরানার মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ‘সাহেব-পণ্ডিতের যোগসাজশে তৈরি গদ্যের ভেতর বাংলা ভাষা যে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছে’, তা তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন; আর এ অবস্থা থেকে বাংলা ভাষাকে উদ্ধারের ব্রতে ‘তিনি যখন নামলেন তখন তাঁর বিপ্লবী না হয়ে উপায় ছিল না’। (ফরহাদ ২০০৮: ১৭)

 

বাংলা ভাষার বি-উপনিবেশায়ন-প্রক্রিয়ায় রবীন্দ্রনাথের সাফল্যের কারণ

বাংলা ভাষাপ্রশ্নে যে অনমনীয় অবস্থান রবীন্দ্রনাথের লেখায় আর কাজে প্রকাশ পেয়েছে, তার আংশিক আনুকূল্য তিনি পেয়েছেন তাঁর সময় ও প্রতিবেশ থেকে। সময়টা ছিল জাতীয়তাবাদী ভাব ও তত্পরতার উন্মেষ-বিকাশের কাল। অন্তত বাংলা ভাষাভাষী এলাকায় এর অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল বাংলা ভাষা। রাজনারায়ণ বসু (১৯৬১) আর শিবনাথ শাস্ত্রীর (১৯৫৭) বয়ানে ইংরেজির বদলে বাংলা ব্যবহার আর ‘বিশুদ্ধ’ বাংলা ব্যবহারের নানা সামষ্টিক উদ্যোগ-আয়োজনের খবর পাওয়া যায়। অবশ্য আনুষ্ঠানিক সভায় বাংলায় বক্তৃতা করার রেওয়াজ চালুর পেছনে ব্যক্তিগতভাবে রবীন্দ্রনাথের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। ‘নাটোরে কংগ্রেসের সম্মেলনে রবীন্দ্রনাথের জেদে এবং জবরদস্তিতে ডব্ল্যু সি ব্যানার্জি বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দিতে বাধ্য হন। ... কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় প্রথম সমাবর্তন ভাষণ দেন রবীন্দ্রনাথ’ (অমিতাভ ১৯৯২: ১৫০)। এ কারণে তাঁকে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। তা হলেও, তিনি যে এ কাজে সফল হয়েছিলেন, আর শেষ পর্যন্ত বাংলায় বক্তৃতা করার রীতি যে প্রচলিত হয়েছিল, তার কারণ, এ ছিল যুগের দাবি।

উনিশ শতকের শেষদিকে সার্বিকভাবে ভাষাচর্চার ধারায় পরিবর্তন আসে, আর বাংলাসহ ভারতীয় ভাষাগুলোর পঠনপাঠনে তাত্পর্যপূর্ণ নতুনত্ব দেখা দেয় (৪.৫ দ্রষ্টব্য)। বঙ্গীয় সাহিত্য-পরিষদের প্রতিষ্ঠায় (১৮৯৩) এ নতুনধারার ভাষাচর্চা কার্যকর সাংগঠনিক ভিত্তি লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের বাংলা ভাষা-বিষয়ক রচনার একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ এ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। এখানে তিনি সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, হীরেন্দ্রনাথ দত্ত, ব্যোমকেশ মুস্তফী, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর মতো কয়েকজন বিপ্লবী ভাষাচিন্তককে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ বিস্তার আর গভীরতায় এঁদের সবাইকে ছাড়িয়ে যান। ভাষা-আলোচনায় তাঁর দীর্ঘকালীন সক্রিয়তাও উল্লেখযোগ্য। প্রতিভার বাইরে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রবণতা আর তত্পরতার মধ্যে তাঁর এই সাফল্যের কিছু কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১—৭ আগস্ট ১৯৪১)