যে কোনো একটি ভালো কবিতাই সাধারণত কোথাও পৌঁছনোর ইঙ্গিত করে আমাদের, এটি সেই কবিতার শক্তি। যেমন একটি নদী, নদী আমাদের টেনে নিয়ে যায়, নদী আমাদের প্রবাহিত করে জলমগ্ন তরঙ্গের ভেতর দিয়ে, এ শক্তি নদীর থাকেই। আর যদি দৃশ্যমানতায় আসে কোনো ট্রেন বা কোনো রেললাইন, রেললাইন আমাদের কোথায় নিয়ে যায়? সেই রেলে চড়ে রেলের জানালা দিয়ে কী কী দেখা যায়? হয়তো এভাবেও ভাবা যায়, যার যেখানে যাবার ইচ্ছা, সে সেখানেই যায়। যেতে যেতে তার যা চোখে পড়ে, সে তা-ই দেখতে পায়। দুইজন লোক চলন্ত ট্রেনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে কি একই রকম সবকিছু দেখতে পায়? আদতে যে যার মতো করেই দেখে । ধরা যাক কেউ ট্রেনে করে ঈশ্বরদী পার হচ্ছে, তার কাছে ঈশ্বরদী বড়জোর একটি পুরনো জংশনের বেশি কিছু হওয়ার নয়, কিন্তু কবি মাশরুর আরেফিনের কাব্যগ্রন্থ ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ পড়তে গিয়ে টের পাই, এই ঈশ্বরদী ঠিক আমাদের চেনা ঈশ্বরদী নয়। ঈশ্বরদী এখানে স্থানবিশেষের বাইরের কোনো বিস্তৃতি হয়ে ধরা পড়ে। ঈশ্বরদীকে মনে হয় কোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তিও নয় ঈশ্বরদী, ঈশ্বরদী একটি প্রতিষ্ঠান, ঈশ্বরদী একটি প্রতিষ্ঠানও নয়, ঈশ্বরদী যেন কী? কী তা ঠিক ষোলআনা পরিষ্কারও হয় না, কারণ, মাশরুর আরেফিন এই ঈশ্বরদীকে গড়ে তোলেন এমনভাবে, মনে হয় এই ঈশ্বরদীর ভেতর দিয়ে আমাদের একটি নদীযাত্রা হচ্ছে, তাহলে ঈশ্বরদী কি একটি নদী? যদিও বাংলাদেশ নদীমাতৃক, কিন্তু ঈশ্বরদী নামে কোনো নদী নেই এদেশে। কিন্তু এই কাব্যগ্রন্থের ভেতরে ডুবলে আঁচ করা যায়, ঈশ্বরদীর ভেতরে একটি দেশ আছে এবং কোনো সন্দেহ ছাড়াই মনে হয়, সেই দেশ বাংলাদেশ। এবং পুরো গ্রন্থ পাঠ শেষে মনে হতে পারে, ঈশ্বরদীর ভেতরে লুক্কায়িত আরো কোনো দেশ, যে দেশ আমাদের আধেক চেনা, আধেক অচেনা লাগে। কিছুক্ষণ পর মনে হওয়ার বদল হয়, তখন মনে হয়, ঈশ্বরদী একটি সময়, ঈশ্বরদীর সঙ্গে আমাদের দেখা হয়েছে, হচ্ছে, আগামীতেও হবে। একটা ঘোরতন্ত্র জারি করে ঈশ্বরদী, দেশ-কাল-সমাজের ছাপচিত্রই বটে, কিন্তু এ কাব্য রচিত স্বতন্ত্র ধরনে, এ ধরন মাশরুর আরেফিন পাঠকের সামনে এনেছেন। আমরা যারা কবিতার বা বাংলা কবিতার নিয়মিত পাঠক, তারা সাধারণত এই ভঙ্গির সঙ্গে সেরকম পরিচিত নই, তারা ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ বয়ানের মধ্যে একটু একটু থমকে থমকে এগিয়ে যাব এবং টের পাব, এই গ্রন্থের ভেতর দিয়ে কবি আমাদের জার্নি করাচ্ছেন তুমুল এক সময়, প্রশাসনময় এক রাষ্ট্র, রাজনীতি, ক্ষমতা, গ্রামবাংলা, জনপদ। মনে হতে পারে, এই গ্রন্থ নদীযাত্রাই করাচ্ছে আমাদের হয়তো নদীর জলের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে ট্রেন, ছুটে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সেই ট্রেনের দুজন যাত্রীকে তো আমরা সহজেই চিনতে পারি, একজন ফরহাদ মজহার, অন্যজন আহমদ ছফা। কিংবা সেই ট্রেনেই ঘুরছে বাংলাদেশ। আবার যে কোনো পাঠক ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ পড়তে পড়তে এই লেখার সম্পূর্ণ বাইরে দিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন অন্য কোনো রাস্তায়, এই জন্যেই তো মনে হয়, লেখকের চেয়ে পাঠকের স্বাধীনতা বেশি। আমি যখন মাশরুর আরেফিনের এই কাব্যগ্রন্থের পাঠক, পড়তে পড়তে আমি কোথায় যে চলে যাচ্ছি, জানি, তার খবর কবিও জানেন না। তবে, যেহেতু কবির কাব্য পাঠযাত্রার ভেতর দিয়েই আমার এই গমনাগমন ঘটছে, সেই কারণে কবির প্রাপ্যকেও স্বীকার করে আসতেই হচ্ছে। এইখানেই কবির জয়, কবির জয় বলে পাঠকের পরাজয় নয়, পাঠকেরও জয়। কবি ও পাঠকের জার্নি সমান্তরাল। ফলত, ‘ঈশ্বরদী, মেয়র অমিউলের গল্প’ পড়তে পড়তে সত্যিই একটা জার্নি এসে পড়ে পাঠকসত্তার চৈতন্যে।
একটা মহাকব্যিক দ্যোতনা বা মেজাজ নিয়েই রচিত মাশরুর আরেফিনের প্রথম কাব্যগ্রন্থ, দ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত ‘ঈশ্বরদী, মিউল ও মেয়রের গল্প’। যে একটা সমাজ আমরা পেয়েছি বা নির্মাণ করছি নিজেরাও, কী নিপুণ বক্রোক্তিতে সেটা ফুটেছে এই মহাকব্যে। রাষ্ট্র, জনপদ, জনপদের কতরকম মানুষ, তাদের যাপিত জীবন, জীবনের কান্নাহাসি, স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ, তাদের বেঁচে থাকা, মরে লাশ হয়ে যাওয়া প্রতিভাত হয়ে উঠেছে এই কাব্যে। এককথায়, ক্ষমতা ও রাষ্ট্রই ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ কাব্যগ্রন্থের মৌল উপাদান। ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের কাছে বন্দি কোটি কোটি মানুষ—এই চরম নিয়তিরই নিদারুণ উপস্থিতি সন্নিবেশিত আলোচ্য গ্রন্থে। সমকালীন সমাজজীবনে উচ্চারিত নানান ইংরেজি শব্দও অনায়াসে ঢুকে পড়েছে মাশরুরের হাতে, এক আপাতগদ্যের ভেতর দিয়ে এগুতে এগুতে মাশরুর মাঝেমধ্যেই পদ রচনা করেছেন তাঁর এই কাব্যের শরীরে। গদ্যের ভেতরে বাস করেও কবি হঠাত্ হঠাত্ জানিয়ে দেন, কবিতার চিরায়ত অন্ত্যমিলের ছন্দেও তাঁর আগ্রহ পড়ে যায়নি। যাঁরা বাংলা কবিতার মনোযোগী পাঠক, খানিকটা তর্কপ্রিয়, যাঁরা জানেন ও মানেন বা বোঝেন—ক্ষমতা, রাষ্ট্র-রাজনীতির বাইরে কিছুই নয়, তাঁদের মনোজগতের সঙ্গে ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’ বোঝাপড়া করবে। এই বোঝাপড়া কবির সঙ্গেও বটে।
প্রায় আঠার বছর পর বাতিঘর থেকে দ্বিতীয় মুদ্রণ সমাসন্ন। আমি দ্বিতীয় মুদ্রণ হাতে পেয়ে আবার পড়তে চাই মাশরুর আরেফিনের বাংলা এপিক ‘ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প’।
