মজলিস বা অনুষ্ঠানের আদব

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৯, ২০:৪৬

মজলিস বা অনুষ্ঠানের আদবের মূল উদ্দেশ্য হলো, বৈঠকের ভাবগাম্ভীর্য ও শালীন-শোভনীয় চিত্র যেন বহাল থাকে। বসা ও উঠে যাওয়ার কয়েকটি আদব নিম্নরূপ :

১. মাহফিল-মজলিসে যে পর্যন্ত বসার ব্যাপ্তিসীমা পৌঁছেছে, সেখানেই সহজে স্বাভাবিকভাবে বসে পড়তে হবে। অনুষ্ঠানকে ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করা যাবে না। এতে যারা আগে এসেছেন তাদের কষ্ট হয়। তারচেয়ে বড়ো কথা, এমনটি করাও গর্ব-অহংকারের অন্যতম পরিচায়ক। জুমার জামাতে বিশেষত অন্যদের কাঁধের ওপর দিয়ে লাফিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াকে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে।

 ২. অনুষ্ঠানের কোথাও যদি কোনো ব্যক্তি একটি স্থানে বসে থাকেন এবং তারপর তিনি উপস্থিত প্রয়োজনে বের হয়ে থাকেন; তাহলে ফিরে আসার পর ঐ স্থানে বসার অগ্রাধিকার তারই থাকবে।

৩. কোথাও যদি দুই ব্যক্তি পরস্পর বাক্যালাপে ব্যস্ত থাকেন, সেক্ষেত্রে অনুমতি ছাড়া ব্যত্যয় ঘটিয়ে তৃতীয়জনের অনুপ্রবেশ ঠিক নয়। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘কারও পক্ষে বৈধ নয় দুজন লোকের মাঝামাঝি তাদের অনুমতি ছাড়া বসে পড়া।’ (তিরমিযি)

 ৪. অনুষ্ঠানে কয়েকজন যদি গোলাকৃতিতে বসা থাকেন, তাহলে কারো পক্ষে ওই বৈঠকের মধ্যখানে গিয়ে বসা ঠিক নয়। কারণ, তেমন ক্ষেত্রে কারো মুখের দিকে তার মুখ হবে, আবার কারো মুখের দিকে তার পিঠ হবে। এমন ব্যক্তির প্রতি মহানবী (স) অভিশাপ প্রদান করেছেন। (তিরমিযি)

 ৫. মাহফিল-মজলিসে লোকজন যদি বসা থাকেন, সেক্ষেত্রে পরবর্তীতে আগমনকারীর জন্য বসার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দাঁড়িয়ে থাকা নিষেধ। (আবু দাউদ)

 ৬. অনুষ্ঠানের যে স্থানটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ বা বিশেষ বিবেচনায় বক্তা/ সভাপতি/আলেম/ মেহমানদের জন্য প্রস্তুতকৃত, সেখানে নিজে থেকে বা উপযাচক হয়ে বসা যাবে না। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘তোমার ভাইয়ের সম্মানিত, সুনির্দিষ্ট আসনে তার অনুমতি ব্যতীত বসতে যাবে না।’ (তিরমিযি)

৭. কাউকে তার আসন বা বসার স্থান থেকে উঠিয়ে নিজে সেখানে বসা যাবে না। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘যারা বসা আছেন, তাদের উচিত আগমনকারীদের বসার সুবিধার্থে অনুষ্ঠানটিকে প্রশস্ততাদানে সচেষ্ট হওয়া এবং অন্যদেরও বসার সুযোগ করে দেওয়া।’ (বুখারি)

৮. মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন—‘হে মুমিনগণ! যখন তোমাদের বলা হয়, মজলিসে স্থান প্রশস্ত করে দাও, তখন তোমরা স্থান করে দেবে, আল্লাহ তোমাদের জন্য স্থান প্রশস্ত করে দেবেন এবং যখন বলা হয় ‘উঠে যাও’, তোমরা উঠে যাবে।’ (সূরা: মুজাদালা, আয়াত নং-১১)

 ৯. ‘মজলিসে সবাই বিক্ষিপ্ত হয়ে বসবে না, বরং মিলেমিশে বসবে।’ (আবু দাউদ)

 ১০. যখন কোনো মুসলমান ভাই তোমার কাছে আসে, তখন স্থানসংকুলান না হওয়া সত্ত্বেও তার সম্মানার্থে কিছুটা চেপে বসতে সচেষ্ট হও। (বায়হাকি)

১১. যখন বৈঠকে তিনজন থাকে, সেক্ষেত্রে একজনকে বাদ দিয়ে বাকি দুজন কানে কানে কথা বলতে যাবে না। কেননা, এতে তৃতীয়জনের মনে কষ্ট লাগবে। (বুখারি) এমন কোনো ভাষায় কথা বলা, যা তৃতীয়জন বোঝে না; তারও একই বিধান।

১২. মানুষের ওপর সর্বাধিক প্রভাব পড়ে থাকে সাহচর্য-সংস্পর্শের। যে কারণে সর্বদা নেককার লোকজনের সাহচর্যে বসার বা অবস্থানের চেষ্টা করতে হবে। এজন্য একটি প্রসিদ্ধ প্রবাদ রয়েছে যে, ‘যদি কারও চরিত্রের বিষয়ে জানতে চাও, তাহলে তার বন্ধুদের চরিত্রের খোঁজ লাগাও।’ হাদিস শরিফে এসেছে, ‘মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের অনুগামী হয়ে থাকে।’ আরেকটি হাদিসে এসেছে, ভালো ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ হলো একজন আতরবিক্রেতা ও একজন কামারের অনুরূপ। অর্থাত্, আতরবিক্রেতার কাছে বসলে আতর ক্রয় না করলেও তার অনবরত সুবাস পেতে থাকবে; আর কামারের কাছে বসলে প্রথমত কয়লার আগুনের স্ফুলিঙ্গ দ্বারা কাপড় পুড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে; তা থেকে কোনো মতে রক্ষা পেলেও, ধোঁয়া ও ছাই-কালি থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

১৩ . প্রতিটি জিনিস বা বস্তুর সরদার হয়ে থাকে। বৈঠকসমূহের সর্দার বৈঠক; সেই মজলিস, যেই মজলিসে কিবলামুখী হয়ে বসার ব্যবস্থা করা হয়, বসা হয়। (তাবারানি)

১৪. একটি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ হাদিসের ভাষ্য এমন—‘বৈঠক/ মজলিস আমানতস্বরূপ’। (আবু দাউদ) অর্থাত্, মজলিসে যা শুনবে তা গোপনীয় বিষয় হলে অন্যত্র প্রকাশ করবে না। ধর্মীয় বিষয় হলে তা-ও আমানতস্বরূপ যথাসাধ্য সহিহ-শুদ্ধভাবে তা অন্যের কাছে পৌঁছাতে সচেষ্ট হবে এবং নিজেও আমল করবে। এভাবে আমানতের হক আদায় করবে।

lলেখক :মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন,

বায়তুল মোকাররম, ঢাকা