ইউক্রেনকে অর্থায়নে রাশিয়ার সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা স্থগিত

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫, ১০:৫০

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) শীর্ষ নেতারা দীর্ঘ আলোচনার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সহায়তায় ৯০ বিলিয়ন ইউরো প্রদানের জন্য রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ ব্যবহারের পরিবর্তে সরাসরি অর্থ ধার করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। 

শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) ভোরে ব্রাসেলসে অনুষ্ঠিত সম্মেলন শেষে ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এক সংবাদ সম্মেলনে এই ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। 

তিনি জানান, ইউক্রেনের জরুরি তহবিল নিশ্চিত করতে ইইউ বাজেটের বিপরীতে একটি গ্যারান্টিযুক্ত ঋণ প্রদানের প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। রাশিয়ার জব্দকৃত সার্বভৌম তহবিল ব্যবহার করে কিয়েভকে অর্থায়নের ক্ষেত্রে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে গভীর মতভেদ সৃষ্টি হওয়ায় আপাতত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে এসে এই বিকল্প পথ বেছে নেওয়া হয়েছে।

সম্মেলনে অংশ নেওয়া নেতারা রাশিয়ার প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরো সমমূল্যের সম্পদ থেকে ‘ক্ষতিপূরণ ঋণ’ প্রদানের বিষয়ে ইউরোপীয় কমিশনকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও বর্তমানে সেই পথটি অকার্যকর হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। মূলত বেলজিয়ামের কঠোর আপত্তির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, কারণ রাশিয়ার ১৮৫ বিলিয়ন ইউরো মূল্যের সম্পদ তাদের দেশেই জমা রয়েছে। হাঙ্গেরির রাশিয়া-বান্ধব প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ও পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। ছবি: দ্য জেরুজালেম পোস্ট

বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট দে ওয়েভার সংবাদ সম্মেলনে জানান যে, এই প্রক্রিয়ায় আইনি ও আর্থিক ঝুঁকির অসংখ্য জটিল প্রশ্ন থাকায় তারা শেষ পর্যন্ত ‘প্ল্যান বি’ অর্থাৎ ইইউর যৌথ ঋণ গ্রহণের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছেন। এর ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা ও বিভাজন এড়িয়ে নিজেদের ঐক্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

যৌথভাবে অর্থ ধার করার এই প্রক্রিয়াটি সফল করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব সদস্য দেশের সম্মতির প্রয়োজন ছিল। শুরুতে হাঙ্গেরির রাশিয়া-বান্ধব প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করলেও পরে হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া এবং চেক প্রজাতন্ত্র তাদের অবস্থান পরিবর্তন করে। 

তবে শর্ত দেওয়া হয়েছে যে, এই ব্যবস্থার কারণে ওই দেশগুলোর ওপর কোনো বাড়তি আর্থিক দায়ভার চাপানো যাবে না। হাঙ্গেরির এই কৌশলগত বিজয়কে কূটনীতিকরা ওরবানের বড় সাফল্য হিসেবে দেখছেন, কারণ তিনি একদিকে রাশিয়ার সম্পদ ব্যবহারের পরিকল্পনা রুখতে পেরেছেন এবং অন্যদিকে হাঙ্গেরিকে এই ঋণ প্রক্রিয়ার আর্থিক দায়মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়েছেন।

জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন যে, এটি ইউক্রেনের জন্য ভালো সংবাদ এবং রাশিয়ার জন্য একটি দুঃসংবাদ। তিনি উল্লেখ করেন যে, কিয়েভকে প্রয়োজনীয় অর্থ জোগানোর বিষয়টি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ ইইউর সহায়তা ছাড়া আগামী বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে ইউক্রেন অর্থশূন্য হয়ে যুদ্ধে পরাজয়ের মুখে পড়তে পারত। 

ইইউ নেতারা বিশ্বাস করেন, ইউক্রেনের পরাজয় এই ব্লকের ওপর সরাসরি রুশ আগ্রাসনের হুমকি বাড়িয়ে তুলত। তাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক সমালোচনার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের শক্তি ও সংকল্প প্রদর্শনের জন্য এই সমঝোতায় পৌঁছাতে মরিয়া ছিল।

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত থেকে রাশিয়ার জব্দকৃত সম্পদ সরাসরি ব্যবহারের জন্য বারবার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি এই পদক্ষেপকে নৈতিকভাবে সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করলেও শেষ পর্যন্ত ইইউ নেতাদের গৃহীত ঋণের সিদ্ধান্তেই সন্তুষ্ট থাকতে হচ্ছে। 

বর্তমান সমঝোতা অনুযায়ী, রাশিয়ার ২১০ বিলিয়ন ইউরোর সম্পদ ততক্ষণ পর্যন্ত জব্দ থাকবে যতক্ষণ না মস্কো যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ প্রদান করে। যদি ভবিষ্যতে রাশিয়া কোনো ক্ষতিপূরণ দেয়, তবে সেই অর্থ দিয়ে ইউক্রেন এই ৯০ বিলিয়ন ইউরোর ঋণ পরিশোধ করবে।

সূত্র: দ্য জেরুজালেম পোস্ট

ইত্তেফাক/টিএইচ