ইদানীং সর্ববিষয়ে বিভিন্ন মহল হইতে সচেতনতার কথা বলা হইয়া থাকে; সচেতনতার উপদেশও দেওয়া হইয়া থাকে। কিন্তু এই সচেতনতা জিনিসটা কী? এক কথায় বলা যায়, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অথবা অসম্পৃক্ত বিষয়ে সম্পর্কে পরিজ্ঞাত হওয়ার নামই সচেতনতা। নিঃসন্দেহে প্রতিটি মানুষের জন্য জীবনের নানা ক্ষেত্রে সচেতনতা আবশ্যক। মহামতি অ্যারিস্টটল সচেতনতা সম্পর্কে বলিয়াছেন, জীবনের মূল্য শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে একজন ব্যক্তির নিজস্ব সচেতনতার উপর। কিন্তু প্রশ্ন হইল, এই সচেতনতা একজন মানুষের মধ্যে তৈরি হয় কী করিয়া? আমরা জানি, প্রতিটি মানুষের সচেতনতার মাত্রা ও বোধ একরকম নহে। সেই ক্ষেত্রে একজন সচেতন মানুষ একজন অপেক্ষাকৃত অসচেতন মানুষকে যদি বলিয়া দেন, ‘সচেতন হইতে হইবে’ তাহাতেই কি ঐ মানুষটি সচেতন হইয়া যান? মোটেই তাহা নহে। সচেতনতাও একটি শিক্ষণীয় বিষয়। শিক্ষা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা, অর্থনৈতিক ন্যূনতম নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করে সচেতন হওয়া। এই সকল সুবিধাদি হইতে বঞ্চিত কোনো ব্যক্তি পূর্ণরূপে সচেতন হইবেন, ইহা আশা করা যায় না। একেকজন ব্যক্তি সচেতন হইয়া উঠিতে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হয়। এই প্রতিষ্ঠানগুলি হইল পরিবার, বিদ্যালয়, সমাজ এবং রাষ্ট্র।
দেশে এখন ডেঙ্গু মশার প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়াছে। ঈদ সামনে রাখিয়া রাজধানী ঢাকা শহর হইতেই কম-বেশি দেড় কোটি মানুষ মফস্সল শহর ও গ্রামাঞ্চলে যাইতে শুরু করিয়াছেন। বলা হইতেছে, এই ভ্রমণের মধ্য দিয়া মফস্সলের যে সকল অঞ্চল এখনো ডেঙ্গু ভাইরাস মুক্ত আছে সেইসব অঞ্চলে ছাড়াইয়া পড়ার ঝুঁকি আছে। কারণ গ্রামাঞ্চলে যেই অ্যাডিস মশা ভাইরাস বহন করিতেছে না, সেই মশা যদি আক্রান্ত কোনো ঢাকাফেরত ব্যক্তিকে কামড় দেয়, তাহা হইলে ঐ মশাটিও ভাইরাস বহন করিতে শুরু করিবে। কথা সত্য। কিন্তু এই ব্যাপারে সচেতন করিতে আমাদের প্রধান কর্তব্য কী? আমরা জানি, সচেতনতা একটি অনুসরণীয় বিষয়ও বটে। ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান জনগণকে সচেতন হইতে বলিতেছে। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠান কি নিজেদের বিশাল কার্যালয়টিকে ডেঙ্গু মশামুক্ত রাখিবার ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়াছে? যদি তাহা না করিয়া থাকে তাহা হইলে জনগণ উপদেশ শুনিবে না। সুতরাং যাহার যাহার নিজের অবস্থান হইতে নিজে সচেতনতার উদাহারণ সৃষ্টি করিয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে দেখাইয়া দিতে হইবে। সেই সঙ্গে সরকারেরও উচিত হইবে, আপাতত প্রচার-প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতার উপর জোর দেওয়া। তবে সার্বিকভাবে সচেতন করিতে শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নাই। সেই ব্যবস্থা করা হইলে এমনকি ডেঙ্গুর জন্য আলাদা করিয়া সচেতন করিবার প্রয়োজন হইবে না। ডেঙ্গু জাতিকে কাবু করিতে পারিবে না। মোদ্দা কথা, আমরা একটি সচেতন জাতি চাই, যেইখানে প্রতিটি মানুষ তাহার জীবনের মূল্য সম্পর্কে পরিজ্ঞাত থাকিবে। তাহা হইলেই জাতি সর্ববিষয়ে পরিণত, পরিপক্ব ও শক্তিশালী হইয়া উঠিবে।
