‘মোক একান কম্বল দ্যান বাহে, মুই আর কয়দিন বাঁচিম!’

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৩:২০

‘এমন জারত ঘর থাকি বের হওয়া যায় না বাবা। বের হলে ঠান্ডা বাতাস গাওত খালি লাগে, মনে হয় জীবনটাই বের হয়ে যায়। মোক একান কম্বল দ্যান বাহে, মুই আর কয়দিন বাঁচিম!’—এভাবেই আঞ্চলিক ভাষায় কথাগুলো বলছিলেন লালমনিরিহাটের আদিতমারী উপজেলার ভাদাই ইউনিয়নের টিএনটি পাড়ার বাসিন্দা মহিতন নেছা (৭৫)।

শুধু মহিতন নেছাই নন, এমন আহাজারি শোনা যাচ্ছে হাজারও শীতার্ত মানুষের কণ্ঠে। কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। বিশেষ করে তিস্তা নদীর চরাঞ্চলের ছিন্নমূল মানুষজন দিন কাটাচ্ছেন চরম কষ্টে।

পৌষের ১০ দিন না যেতেই হাড় কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা আর ঘন কুয়াশায় লালমনিরহাটের জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। টানা পাঁচ দিন সূর্যের দেখা নেই। রাতে কুয়াশা ঝরছে বৃষ্টির মতো। উত্তরের হিমেল বাতাসে গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই মানুষ জবুথবু হয়ে পড়ছে।

লালমনিরহাটে ভোর আসে ধূসর কুয়াশা সঙ্গে করে। জানালার ফাঁক গলে ঢুকে পড়া ঠান্ডা হাওয়া ভেঙে দেয় ঘুম। উঠোনে পা রাখলেই ভেজা মাটি, বাতাসে কনকনে শীত—মনে হয় পুরো জনপদ থমকে আছে এক সাদা নীরবতার ভেতর। এই কুয়াশার মধ্যেই প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার লড়াই শুরু করেন জেলার মানুষ। বিশেষ করে নদীতীরবর্তী চরাঞ্চল ও প্রান্তিক গ্রামগুলোতে শীত মানেই অসহায়তার আরেক নাম।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৬টায় লালমনিরহাটে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের বেশির ভাগ এলাকাই তিস্তা নদীর চর। এখানে শীত যেন আরও নির্দয়। খোলা প্রান্তর, নদীর হাওয়া আর কুয়াশার ভেজা ঠান্ডা একসঙ্গে মানুষের শরীর ও মন কাঁপিয়ে দিচ্ছে। স্লুইসগেট স্পার-২ এলাকার বাসিন্দা আবেদুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ‘ঠান্ডায় আর জীবন চলে না বাহে। জমির কাজ ঠিকমতো করতে পারছি না। আলু ক্ষেতে পানি দেওয়া দরকার, কিন্তু এই ঠান্ডায় শরীর সায় দেয় না।’

এই শীতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশু ও বয়স্করা। অনেক দরিদ্র পরিবারেই নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। কুয়াশার চাদরে ঢাকা লালমনিরহাটে তাই প্রতিদিনের গল্প একটাই—শীতের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার গল্প, একটু উষ্ণতার অপেক্ষায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস।

তিস্তার চরের অনেক ঘরেই নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র। রাতে আগুন জ্বালিয়ে, খড়কুটো জড়ো করে কিংবা একটি কম্বল ভাগাভাগি করেই পুরো পরিবারকে কাটাতে হচ্ছে রাত। শিশু ও বয়স্কদের চোখেমুখে ক্লান্তি আর ভয়—এই শীত কতটা সহ্য করা যাবে?

শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমে গেছে কাজের সুযোগও। দিনমজুরদের অনেকেই সকালে কাজের আশায় বের হয়েও ফিরছেন খালি হাতে। শনিবার সকালে আদিতমারী বাজারে কথা হয় রিকশাচালক ফয়েজ আলীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘রিকশার হাতলে হাত রাখা যায় না। হাত-পা নিস্তেজ হয়ে যায়। খুব কষ্টে একবেলা রিকশা চালাই। আয়ও কমে গেছে।’

ঘন কুয়াশার কারণে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় পরিবহন শ্রমিকদের দুর্ভোগও বাড়ছে। ট্রাকচালক রজব আলী জানান, ‘রাতে গাড়ি চালানো যায় না। দিনের বেলাতেও হেডলাইট জ্বালিয়ে ধীরে চালাতে হয়।’

রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিনে তাপমাত্রা আরও কমতে পারে।

আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশু বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ডা. আজমল হক বলেন, শীতকালে শিশু ও বয়স্কদের বিশেষভাবে সতর্ক থাকতে হবে। ঠান্ডা এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

ইত্তেফাক/এনএন