বিশ্বের সর্ববৃহত্ যুগোপযোগী শিল্প হচ্ছে পর্যটন। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এটি একটি অপার সম্ভাবনাময় শিল্প। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশেও পর্যটনের রয়েছে অসীম সম্ভাবনা। বাংলাদেশের অপরিসীম নয়নাভিরাম সৌন্দর্য পর্যটকদের হূদয় স্পর্শ করে। সমতল ভূমির এই দেশটিকে প্রকৃতি দুই হাত খুলে সাজিয়ে দিয়েছে। আমাদের নাতিশীতোঞ্চ আবহাওয়া পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। এমন আবহাওয়া পৃথিবীতে বিরল। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন উন্নত দেশ বছরের অর্ধেকেরও বেশি সময় বরফে ঢাকা থাকে; কিন্তু আমাদের সেই সমস্যা নেই। আমাদের দেশে পর্যটকরা সারা বছরই ঘুরে বেড়াতে পারে। আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যুগে যুগে বহু পরিব্রাজক এবং ভ্রমণকারী এদেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন।
এখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার। পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এদেশে রয়েছে। আমাদের আছে কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত যেখান থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। এছাড়া শৈবাল দ্বীপ, সেন্ট মার্টিন, রামুর বৌদ্ধ মন্দির, হিমছড়ির ঝরনা, ইনানী সমুদ্রসৈকত, বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ, টাঙ্গুয়ার হাওর, টেকনাফ—সহজেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়ি অঞ্চল দেখে কেউ কেউ আত্মভোলা হয়ে যায়! আবার আমাদের দেশে অনেক ঐতিহাসিক এবং প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানও রয়েছে। বগুড়ার মহাস্থানগড়, নওগাঁর পাহাড়পুর, দিনাজপুরের কান্তজীর মন্দির, ঢাকার লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলীর মাজার, রাজশাহীর বরেন্দ্র জাদুঘর, কুষ্টিয়ার লালন সাঁইয়ের মাজার, রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ি শুধু দেশীয় নয়, বরং বিদেশি পর্যটক ও দর্শনার্থীদের নিকটও সমানভাবে জনপ্রিয়।
সুজলা সুফলার বাংলাদেশের জন্য পর্যটন একটি বহুময়ী শিল্প। ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের এই শিল্প যার নমুনা পাওয়া যায় জিডিপিতে। ২০১০ সালে জিডিপির শতকরা এক দশমিক সাত ভাগ এসেছে পর্যটন থেকে। বর্তমানে সেই অবদান চার দশমিক তিন ভাগ। সরকার টার্গেট করেছে ২০২৭ সালে এই হার শতকরা প্রায় সাত ভাগ হবে। পর্যটনখাতে চাকরির সম্ভাবনা অনেক। বিশ্বে প্রতি ১০টিতে একটি চাকরি পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ২০১০ সালে মোট চাকরি শতকরা এক দশমিক নয় ভাগ সৃষ্টি হয়েছে পর্যটন থেকে। ২০১৭ সালে এই পরিমাণ দাঁড়িয়েছে আড়াই ভাগ। আমরা আশাবাদী ২০২৭ সালে এই পরিমাণ হবে শতকরা প্রায় তিন ভাগ। এছাড়াও বিশ্ব পর্যটন সংস্থার তথ্যমতে, চলতি বছরের মধ্যে এ শিল্প থেকে ২৯ কোটি ৭০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হবে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে অবদান রাখবে ১০.৫ ভাগ। বাংলাদেশ যদি এ বিশাল বাজার ধরতে পারে তাহলে পর্যটনের হাত ধরেই বদলে যেতে পারে বাংলাদেশের চলমান সম্ভাবনার অর্থনীতি।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১০০ কোটির বেশি। ধারণা করা হচ্ছে ২০২০ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬০ কোটি। পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বিপুলসংখ্যক পর্যটকের প্রায় ৭৩ শতাংশ ভ্রমণ করবেন এশিয়ার দেশগুলোতে। যেভাবে আমাদের দেশে দেশি ও বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে তাতে অচিরেই এই সেক্টর একটি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে পরিণত হবে; কিন্তু সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে আমাদের এ শিল্প অনেকটা আড়ালে পড়ে রয়েছে। পর্যটন যে আমাদের অর্থনীতির একটি বিশাল খাত হতে পারে সেই ধারণার বিকাশ ঘটে মূলত পঞ্চাশের দশকে। এরপর ১৯৯৯ সালে পর্যটনকে শিল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার পর্যটন করপোরেশনের মাধ্যমে এ শিল্পকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। যার ধারাবাহিকতায় পর্যটন বোর্ড ২০১০ সালে গঠন করা হয়। এছাড়া প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস স্টাডিজ অনুষদে ২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ। বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ছাত্রছাত্রীরা এই বিষয়ে পড়াশোনা করছে। পর্যটনের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকবৃন্দ ও গবেষকগণ।
পর্যটন শিল্পকে গুরুত্ব দিয়ে ২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়নে বর্তমান সরকার যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছে। গত বছর জাতিসংঘ পালন করেছে আন্তর্জাতিক টেকসই উন্নয়ন বর্ষ। আমাদের এই ধারণাকে অনুসরণ করে বিভিন্ন উদ্যোগ ও কর্মসূচি গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। অর্থাত্ পর্যটনের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। শুধু বিনোদনই নয়, অর্থনীতির প্রয়োজনেও আমাদের এই শিল্পকে নিয়ে কাজ করতে হবে।
সম্ভাবনার বাংলাদেশে পর্যটনের উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন কিছু কার্যকর পদক্ষেপ। পর্যটনের উন্নয়নে সবচেয়ে বড়ো বাধা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আমাদের পর্যটন বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে জড়িত। তাই একটি সিদ্ধান্ত নিতে হলে অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। পরবর্তী সময়ে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়। থাইল্যান্ডে পর্যটন শুধু পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তাদের অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দ্বারস্থ হতে হয় না। ফলে সে দেশের পর্যটন এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করছে। আমরাও যদি আমলাতান্ত্রিক জটিলতা থেকে বের হয়ে আসতে পারি, তাহলে পর্যটনকে কাজে লাগিয়ে আয় অনেক বাড়ানো সম্ভব। তাছাড়া পর্যটনের উন্নয়নে পররাষ্ট্র নীতিমালা পরিবর্তন, ভিসা-জটিলতা দূরীকরণ, পর্যটনের স্থানগুলোর সৃজনশীল প্রচারণা, পর্যটন বিশেষজ্ঞদের গবেষণার সুযোগ বৃদ্ধি করা, প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ (পিপিপি) নিশ্চিত করা জরুরি। এই শিল্পের উন্নয়নে সরকারের সুনজরও জরুরি। সংশ্লিষ্টদের উচিত, ২৫-৩০ বছর মেয়াদি একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করা। যেখানে পর্যটনের বিকাশে একটি রোডম্যাপ থাকবে। সর্বোপরি পর্যটন এলাকার মানুষকে উন্নয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে হবে অর্থাত্ কমিউনিটি পার্টিসিপেশন নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পর তারা যখন এটিকে নিজের শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দেবে তখনই এই শিল্পের প্রকৃত উন্নয়ন সাধিত হবে। বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য অবলীলায় আকৃষ্ট করবে দেশি-বিদেশি ভ্রমণপিপাসুদের।
বাংলাদেশে পর্যটনের যাত্রা অনেক আগে শুরু হলেও নানা প্রতিকূল অবস্থা পেরিয়ে আজকে আশার আলো ছড়াচ্ছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাসমূহের নৈমিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপার সম্ভাবনাময় আমাদের এই বাংলাদেশ হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার একটি আদর্শ পর্যটননগরী, যা শুধু অর্থনৈতিক চাকাকে সচল করবে না সেই সঙ্গে বিশ্বপরিমণ্ডলে বাংলাদেশকে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তুলে ধরবে। বাংলাদেশ পর্যটন পুলিশের তথ্যমতে, বাংলাদেশে ছোটো-বড়ো প্রায় ৮০০-এর বেশি পর্যটন স্থান রয়েছে। এসব স্থানকে সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তা এই দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।
যে কোনো ক্ষেত্রে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড সম্পাদনের লক্ষ্যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের ব্যবহার পারে টেকসই উন্নয়ন সম্ভাবনা নিশ্চিত করতে। তাই গবেষণাধর্মী কার্যক্রম বৃদ্ধির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপযোগী তথ্যের উদ্ঘাটন ও সংরক্ষণপূর্বক তা নিঃসন্দেহে জনকল্যাণে সমৃদ্ধি আনয়নে উল্লখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। অপার সম্ভাবনাময় ও প্রাকৃতিকভাবে সৌন্দর্যমণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও মহান স্বাধীনতা অর্জনের ৪৭ বছরেও আমরা পুরোপুরি সক্ষম হয়নি পর্যটন খাতকে ঢেলে সাজাতে। তবে বর্তমান বছরগুলোতে সরকারসহ বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান পর্যটনকে অর্থনৈতিক একটি কার্যকরী খাত হিসেবে রূপান্তরে সচেষ্ট হয়েছে। তাই পর্যটনশিল্পের বিকাশে গবেষণাধর্মী কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পর্যটনের ওপর উচ্চশিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থাসহ বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিনিয়ত অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় পর্যটনশিল্পের সংযোজন শুধু আর্থিক সুফলতা বয়ে আনবে না, সেইসঙ্গে প্রান্তিক পর্যায়ে এর সুফল ছড়িয়ে দেবে স্থানীয়দের অংশগ্রহণের মাধ্যমে। ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে পর্যটনশিল্প বাংলাদেশের জন্য হয়ে উঠতে পারে উল্লেখযোগ্য হাতিয়ার হিসেবে। এজন্য প্রয়োজন সরকারের উন্নয়ন-ভাবনায় পর্যটনশিল্পকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া।
জাতিসংঘ এ বছর পালন করছে International Year of Sustainability বা আর্ন্তজাতিক টেকসই উন্নয়ন বর্ষ। আর এই ধারণাকে অনুসরণ করে UNWTO পালন করছে International Year of Sustainability Tourism। এ বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘উন্নয়নের জন্য চাই টেকসই পর্যটন’। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ UNWTO প্রণীত Global Code of Ethics বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা যদি এই Global Code of Ethics মেনে চলতে পারি তাহলে বাংলাদেশ টেকসই পর্যটন উন্নয়নে একটি গুরুত্বপূর্ণ দেশ হতে পারবে। এছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত SDG অর্জনের একটি অনুসরণীয় দেশ হতে পারে।
পর্যটনের জন্য চাই সমন্বিত উদ্যোগ। শুধুমাত্র বিনোদনই নয়, জীবনের নানা প্রয়োজনে নানা কারণে আমরা দেশে-বিদেশে ভ্রমণ করে থাকি। সৃষ্টির অপার সম্ভারের মাঝে লুক্কায়িত আছে নানা রহস্য, সৌন্দর্য। সুন্দর অনুপম প্রকৃতির সান্নিধ্য লাভ ও জ্ঞান অন্বেষণে ভ্রমণের বিকল্প নেই। পর্যটন এ ক্ষেত্রে মানুষের সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছে। বাংলাদেশের এ সৌন্দর্য অবলীলায় আকৃষ্ট করবে ভ্রমণপিপাসুদের।
n লেখক: চেয়ারম্যান, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
