ডিজিটাল বাংলাদেশের অর্জন অক্ষুণ্ন রাখতে করণীয়

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০১৯, ২১:৪৫

ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের উদ্দেশ্য হচ্ছে দুর্নীতিমুক্ত সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া। মানুষের দৈনন্দিন অত্যাবশ্যকীয় কাজকে অটোমেশনের মাধ্যমে সহজসাধ্য করা। এছাড়া রয়েছে গ্লোবাল ভিলেজের যে কোনো প্রান্তের কাজ নিজের দেশে বসেই সফলতার সঙ্গে করে দেওয়ার মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার আয় বৃদ্ধি করা। তাই কর্মক্ষম বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ডিজিটাল বাংলাদেশের অবদান অনস্বীকার্য।

কিন্তু আমাদের উপলব্ধির অভাবে ডিজিটাল বাংলাদেশ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিনোদন ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। আমার ছেলেমেয়ে দু্জনই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে অবস্থিত স্কুলে পড়ে। তাদেরকে আনা-নেওয়ার জন্য আমাকে প্রতিবছরই গাড়ির পাশ নবায়ন করতে হয়। গেটে বেশ কড়াকড়ি। গাড়ির পাশের মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখে কাগজপত্র পূরণ করে পুনরায় ঐগুলি জমা দেওয়ার জন্যে ঐ স্থাপনার মূল অফিসের ফটকে গেলাম। ওখানে গাড়ির গেট পাশের জন্য কাগজপত্র জমা নেওয়া হয়। গেটে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা-মেটাল ডিটেক্টর ডোর বসানো আছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী, কর্মকর্তাগণ প্রতিদিন সেখানে মেটাল ডিটেক্টর ডোর পার হয়েই অফিসে প্রবেশ করেন এবং অফিস থেকে বের হন। অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, সিকিউরিটির দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি স্মার্টফোনে ইউটিউবে হিন্দি ছবি দেখছেন আর তার সম্মুখে অবস্থিত মেটাল ডিটেক্টর ডোরের মধ্যে দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীগণ অফিসে প্রবেশ করছেন। এ কেমন ধরনের কাজের সংস্কৃতি! এই সময়টা তার উচিত গভীর মনোযোগে লোকজনের গমনাগমন প্রত্যক্ষ করা। তা না করে তিনি বিনোদন নিচ্ছেন। ইংরেজিতে একে বলা হয় সাইবার স্ল্যাকিং। সাইবার অর্থ ইন্টারনেট ও কম্পিউটার-সম্পর্কিত, স্ল্যাক অর্থ ধীর। অফিসের কর্মঘণ্টা শুধু কর্মের জন্যেই নির্দিষ্ট থাকা উচিত।

প্রভাষক পদে নিয়োগের বোর্ডে বিশেষজ্ঞ সদস্য হিসেবে নিজ শহর রাজশাহীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়েছিলাম। ট্রেন প্রায় রাত ১০টায় রাজশাহীতে পৌঁছাল। রিকশায় করে নিজের বাসার কাছে নেমে মোড়ের দোকানের কাছে দেখি একজন ২৫-২৬ বছরের ছেলে বাঁ হাতে সিগারেট ফুঁকছে আর তার ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে স্মার্টফোনটির স্ক্রিন ঝড়ের বেগে স্ক্রল করছে। তার মনে ভীষণ অস্থিরতা প্রত্যক্ষ করলাম। স্মার্ট ডিভাইসের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এমন অসহিষ্ণু জনগোষ্ঠী তৈরি করছে। প্রায়ই জাতীয় দৈনিক পত্রিকার শিরোনাম হয় কারো আপত্তিকর ও গোপন ছবি ফেসবুকে বা ইউটিউবে ভাইরাল। ডিজিটাল ডিভাইস কারো আপত্তিকর ও গোপন ছবি ভাইরাল করার জন্য ব্যবহার না-করে কোনো শিক্ষণীয় বিষয় শেখার জন্য ব্যবহার করা উচিত।

সাম্প্রতিক কালে শিক্ষার্থীদের হতাশ থাকতে দেখি এবং পরীক্ষার ফলাফলও হতাশাব্যঞ্জক। এমন কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, রাত্রে পড়তে বসে তারা ইউটিউবে বিভিন্ন বিনোদনমূলক ভিডিওর মধ্যে মগ্ন হয়ে পড়ে এবং তাদের নিজের অজান্তেই তাদের পড়াশোনার ক্ষেত্রে সাইবার স্ল্যাকিং সংঘটিত হয়। পরিণামে পরীক্ষার ফলাফল হয় খারাপ এবং বাড়তে থাকে হতাশা। এমন বেশ কিছু ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে আমি তাদের উপলব্ধিবোধকে জাগ্রত করেছি। তারা বুঝতে পেরেছে পড়াশোনার জন্য নির্ধারিত রাত এবং সকালের অনেকাংশই তারা নষ্ট করে ইন্টারনেট ব্রাউজ করে। এ ব্যাপারে সবাইকেই সচেতন থাকা উচিত। অন্যথায় দক্ষ ও প্রত্যয়ী জনশক্তি তৈরির গোড়াতেই গলদ থেকে যাবে।

স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা স্মার্টফোনে কার্টুন, ফানি ভিডিও দেখে ও গেম খেলে। এছাড়াও তাদের রয়েছে নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটের প্রতি আকর্ষণ। সোশ্যাল মিডিয়াতেও তারা উল্লেখযোগ্য সময় অতিবাহিত করে। ফলে পাঠ্যবই পড়ার জন্য তাদের সময় সংকুচিত হয়ে যায়। পরিণামে পরীক্ষার ফলাফলে আসে বিপর্যয়। অথচ পাঠ্যবইয়ের যে কোনো কঠিন বিষয় সম্পর্কে জানতে হলে গুগল অথবা ইউটিউবে সমৃদ্ধ টিউটেরিয়াল খুঁজে পাওয়া যায়। যা বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের গভীরতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। সুতরাং ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ইতিবাচক ব্যবহার জ্ঞান আহরণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বর্তমানে শিক্ষার্থীরা স্মার্টফোনকে ব্যবহার করছে বিনোদনের একমাত্র মাধ্যম হিসেবে। এটা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের অন্তরায় হয়ে উঠবে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাবের আদান-প্রদানে সচেতন না হলে বাড়ে একে অন্যের প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা। এ সম্পর্কে একটি ঘটনা উল্লেখ না করেই পারছি না। ফেসবুকের ফ্রেন্ড লিস্টের আমার একজন স্কুলজীবনের বান্ধবী তার আবেগ থেকে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছে। স্ট্যাটাসটির ওপর অনেকেই সুন্দর কমেন্ট করেছে কিন্তু একজনের কমেন্ট হলো ‘চাপাবাজ কথা সব’ কমেন্টটি দেখে আমার বান্ধবী যে প্রত্যুত্তর দিয়েছে তা তুলে ধরলাম ‘তোর এত বড়ো সাহস। তোর পরিবারে ভালোবাসা না থাকতে পারে আরেকজনকে তুই বলবি কেন। তোর কোনো শিক্ষা নাই। চাষা ভূত কোথাকার। তুই আমার এফবি থেকে আউট হয়ে যা। নিজে তুই জঞ্জাল পরিবারে সন্তান। অপরের সুখ সহ্য হয় না।’ এখন আপনারাই ভাবুন কী ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টি করে এই সোশ্যাল মিডিয়া! আমাদের মনে রাখতে হবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জীবন নয়, জীবনের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ। সুতরাং ব্যক্তি, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক জীবনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের যথাযথ সুফল পাওয়ার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে।

সৃষ্ট জীবের মধ্যে মানুষের ভাষারই আছে লেখ্য রূপ। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার বদৌলতে ভাবের আদান-প্রদানে আমরা লেখ্য ভাষাকে এতটাই সংক্ষিপ্ত করছি যে আমাদের অনেক কষ্টে শেখা শব্দের মূল বানান ও রূপ নিজের অজান্তেই মন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। যেমন আমরা ‘As soon as possible’-কে ASAP লিখছি। এর প্রভাব পড়ছে নবপ্রজন্মের ওপর। কোনো বিষয় গুছিয়ে বা সঠিকভাবে বাস্তব জীবনে উপস্থাপন তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।   

পরিশেষে বলা যায়, ডিজিটাল বাংলাদেশের ইতিবাচক ব্যবহার জাতিকে দেখাবে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের পথ। পক্ষান্তরে এর নেতিবাচক ব্যবহার আমাদের পরিণত করবে হতাশাগ্রস্ত, হিংসুটে, ক্রোধসর্বস্ব অর্বাচীন জাতিতে।

n লেখক : অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ,

ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর