বছর জুড়ে নাগরিক সেবায় অচলাবস্থা

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৮:৫৩

ঢাকার নগর ব্যবস্থাপনায় এক ব্যতিক্রমী সংকটের বছর হিসেবে কেটেছে ২০২৫ সাল। রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে প্রশাসনিক অচলাবস্থা, কোথাও অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাপনা, আবার কোথাও রাজনৈতিক ও আইনি জটিলতায় নাগরিক সেবা প্রায় বন্ধ হয়ে পড়ে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, সড়ক সংস্কার, মশক নিধনসহ মৌলিক সেবায়। 

সারা বছর কার্যত কাউন্সিলর শূন্য থাকায় নাগরিক সেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এর সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং ইশরাক হোসেনকে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার দাবিতে চলা আন্দোলন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একাধিক সময়ে আন্দোলন, কর্মসূচি ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার কারণে দক্ষিণ সিটিতে নাগরিক সেবা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। একাধিক দিনে দক্ষিণ সিটির নগর ভবনে প্রবেশ সীমিত হয়ে পড়ে, বন্ধ থাকে ফাইল নিষ্পত্তি ও নাগরিক সেবার কাউন্টার।

বছরের শুরু থেকেই ওয়ার্ডভিত্তিক কাউন্সিলর না থাকায় স্থানীয় সরকার কাঠামোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তরটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে জন্মনিবন্ধন সংশোধন, মৃত্যুনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন ও হোল্ডিং ট্যাক্স-সংক্রান্ত সেবা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, ট্রেড লাইসেন্স না পাওয়ায় ব্যাংক ঋণ, টেন্ডার ও নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণে তারা সমস্যায় পড়েন। দক্ষিণ সিটির কয়েকটি ওয়ার্ড অফিসে আন্দোলনকালীন দিনের পর দিন সেবা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া যায়।

এপ্রিল ও মে মাসে উন্নয়ন কার্যক্রমে স্থবিরতা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠে। স্থানীয় সড়ক সংস্কার, ড্রেন পরিষ্কার ও ফুটপাত উন্নয়ন প্রকল্পগুলো অনুমোদনের অভাবে থেমে যায়। বর্ষা মৌসুম শুরু হলে এই সংকটের প্রভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করে। জুন ও জুলাইয়ে জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলেও কাউন্সিলর না থাকা এবং দক্ষিণ সিটিতে আন্দোলনজনিত অচলাবস্থার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বয় তৈরি হয়নি। অনেক এলাকায় দীর্ঘদিন পানি জমে থাকে। একই সময়ে মশক নিধন কার্যক্রমেও সমন্বয়ের ঘাটতির অভিযোগ ওঠে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময়ে নাগরিক অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নাগরিকরা দক্ষিণ সিটিতে আন্দোলনের কারণে সেবা বন্ধ থাকার বিষয়ে বিরূপ মন্তব্য করতে দেখা যায়।

সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ দাবি করে, আন্দোলন ও কাউন্সিলর শূন্যতার মধ্যেও প্রশাসনিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সীমিত সেবা চালু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৫ সাল ঢাকার নগর শাসনব্যবস্থার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। তাদের মতে, নির্বাচিত কাউন্সিলর ছাড়া সিটি করপোরেশন দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এতে জনপ্রতিনিধি ছাড়া এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রশাসনিক কাঠামো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

ইত্তেফাক/জেডএইচ