রাজনাথের মনোহর প্রস্তাব

আপডেট : ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ২২:০৮

ঝকঝকে, চমত্কার সকাল। হাঁটতে বেরিয়ে, চেনা অতি চেনা, সবসময় আমার বুকের ভেতর গোলাপের মতো ঝুলতে থাকা বালিকার মেরুন পোশাক, বাহারি চুল, প্রভাতি চোখের সজীব ভাষাভঙ্গি দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। দিন দুয়েক আগে, ওর জামাকাপড়ের গাঢ় রংঢং নিয়ে একপ্রস্থ বকুনি দিই ওকে। মেয়েটি শুধরে নিয়েছে নিজেকে।

আজ মজার কুর্তা পরে, ফুলেভরা ক্যাম্পাসে সে তার বাবাকে, নিবেদিত প্রেমিককে দেখতে দেখতে যখন গুচ্ছ গুচ্ছ হাসি ছড়িয়ে নিঃশব্দে আহ্বান করল, ভাবলাম কঠোর ভাষায় সেদিন ওকে বকাবকি ঠিক হয়নি। এভাবেই আমরা কেউ কেউ ভুল করি। ভুলের পর নিজেদের সংশোধনের কথা ভাবি। কখনও শুদ্ধতা নিয়ে আসি। কখনও পারি না, ভুল খতিয়ে দেখি না। এভাবেই বাড়তে থাকে না দেখার অভ্যাস।

রবিবার জয়পুরে বিধানসভা ভোটের প্রচারসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং বলেছেন, ‘সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তানের যদি অক্ষমতা থাকে, আমাদের বলুক, সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেব।’ নিরীহ, সংযত প্রস্তাব। বাক্যে, শব্দপ্রয়োগে কটাক্ষ নেই। শ্লেষ নেই। নেই প্রতিবেশীকে হেয় করার হেয় ভাববার আত্মগরিমা। তবু আমরা আমাদের অভ্যস্ত ধারণায় রঞ্জিত হয়ে বসিয়ে দিলাম, ‘পাকিস্তানকে রাজনাথের কটাক্ষ’। ভুল, অশুদ্ধ কাগজিয়া মন্তব্য।

সম্ভবত, মাস ছয় আগের কথা। ঢাকায় গেলেন আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। অভ্যর্থনায়, আপ্যায়নে, সৌহার্দ্যময় আলোচনায় দারুণ খুশি। বললেন, দুদেশের সম্পর্ক এখন সোনালি। লিলুয়া বাতাস বইছে, চাঁদ নেমেছে সীমান্তে।—কী প্রগাঢ়। সংক্ষিপ্ত, মর্মস্পর্শী অভিব্যক্তি।

যতদূর জানি, রাজনাথ সিং স্বচ্ছ মনের মানুষ। নীতিপরায়ণ। কালিমাহীন। আদর্শে অবিচল। দৃঢ়, দ্বিধাহীন তার প্রত্যয়। নিজের রাজনৈতিক সংগঠন আর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী, তাই ছেলেকে দলীয় রাজনীতিতে বাড়তি গুরুত্ব দেবার যখন প্রশ্ন উঠেছিল, রাজি হননি। এককথায় উড়িয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ভুল সিদ্ধান্ত। মেনে নিতে পারব না।

কাশ্মীরে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার সদিচ্ছা, তার ঐকান্তিকতা বারবার আহত হয়েছে। তবু হাল ছাড়েননি। আজাদির লড়াইয়ের নামে অপ্রতিহত সন্ত্রাস রুখতে তার দৃঢ়তার বৃত্তান্ত আমরা খানিকটা জানি। রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা আছে, আছে ভেতরের ক্রুর-ক্রুদ্ধ চাপ। তথাপি উপত্যকার ভারতপ্রেমী ও মধ্যপন্থিদের নিয়ে সমাধান সূত্র বের করতে তার অনড় আকাঙ্ক্ষা কাশ্মীরিদের কখনও কখনও আশ্বস্ত করেছে। তার আশ্বাস তার বিশ্বাসে ঘা পড়েছে হয়তো, সম্ভবত অহেতুক রক্তক্ষরণ তাকে ক্রমাগত উদ্বিগ্ন করেছে। নিহত, সুজাত বুখারির মতো দুঃসাহসী সাংবাদিকের সঙ্গে তার কাশ্মীর বিষয়ক চিন্তাভাবনার সমতা অজানা নয়।

মিশ্র সংস্কৃতির উত্সস্থল লখনউ থেকে নির্বাচিত সাংসদ। দৃষ্টি একচোখা নয়। উন্মুক্ত। এমন একজন দায়িত্বসচেতন জনপ্রিতিনিধি আর দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যখন বললেন, তালিবানিদের জঙ্গি হামলা, ব্যভিচার, আর ধ্বংসযজ্ঞ রুখতে আফগানিস্তান আমেরিকার সাহায্য নিচ্ছে, পাকিস্তান যদি মনে করে একা সন্ত্রাস রুখতে পারবে না, তাহলে আমরা সাহায্য করতে প্রস্তুত। রাজনাথের এই খোলা আহ্বানে ঝাঁজ কোথায়? এ তো প্রতিবেশীর প্রতি প্রতিবেশীর নিবিড় সৌজন্য ও গাঢ় বন্ধন তৈরির বিনম্র ঘোষণা। পাকিস্তান কতটা সাড়া দেবে তা ওদের ঘরোয়া ব্যাপার। কিন্তু আমরা যদি আগ বাড়িয়ে আমাদের গণমাধ্যমে, আমাদের সংবাদপত্রে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া নামক অসামাজিক মুখপত্রে বলতে থাকি, পাকিস্তানের সন্ত্রাস রোখার ব্যর্থতা অক্ষমতা নিয়ে বিদ্রূপ করেছেন রাজনাথ, তাহলে ইসলামাবাদও বলতে পারে—অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে ভারত নাক গলাচ্ছে। আমাদের শক্তির দুর্বলতা নিয়ে ঠাট্টা করছে।

ইমরান খান যেহেতু খেলার প্রতিভা, যেহেতু ভারতে তার অসংখ্য বন্ধু, যেহেতু ভারতের সঙ্গে তার পরিচয়ের পরিসর অনেকানেক প্রশস্ত, যেহেতু আজন্ম রোমান্টিক প্রেমিক এবং সন্ত্রাস নিয়ে পাক-ভারতের সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন তাই শাসকের আসনে বসেই বলেছিলেন, দিল্লি এক পা এগোলে আমরা দু পা বাড়াব।

ইমরানের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল। প্রধানমন্ত্রী হলেও তাঁর মাথার ওপর খড়্গ। সামরিক বাহিনীর রক্তচক্ষু, দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাদের আধিপত্য, পূর্বগামী শাসকদের অপকর্ম, বিদেশ থেকে দেদার অর্থ ও অস্ত্রের নয়ছয় এবং লাগাতার অশান্তির কারণে অর্থনৈতিক সংকট। এরকম সুরাহাহীন বহু সমস্যায় তিনি অবরুদ্ধ। কাশ্মিরের প্ররোচিত বরফচাপা আগুনও তাঁকে ধাওয়া করেছে। এজন্যই প্রত্যাশিত করতারপুর করিডোর উন্মোচনের মহতী সভায়ও তাঁকে কাশ্মির ইস্যুর মতো জটিল প্রসঙ্গ টেনে আনতে হয়েছে। আমরা বুঝি, তাঁর ওপর এ এক আরোপিত বাধ্যবাধকতা। নিয়ন্ত্রণরেখা নিয়ে যতদিন টানাপড়েন চলবে, চাপিয়ে দেওয়া সন্ত্রাস আর সংঘর্ষ বহাল থাকবে ততদিন সম্পর্কের অনাকাঙ্ক্ষিত জটিলতা থেকে দু দেশের রেহাই নেই। আমাদের পাকিস্তানি বন্ধুদের অনেকেই বলেছেন, বলেছেন কোনো কোনো প্রাক্তন সামরিক কর্তাও, কাশ্মিরকে ঘিরে অন্তত তিনবার পাক-ভারত যুদ্ধ হয়েছে। সংঘাত, অস্ত্রের মহড়া আর রক্তক্ষয়ে যে সমাধান নেই, তা আমরা জানি, তবু লড়াই লড়াই জিগির জাগিয়ে রাখছি।

সন্ত্রাসের কারখানা গড়ে তুলে জঙ্গিদের ওপারে ঠেলে পাঠাচ্ছি। ওদের এসব মন্তব্যে ভুল কোথায়? হক কথা বললেই কি স্বদেশ থেকে বহিষ্কার অবধারিত? দেশদ্রোহীর তকমা নিয়ে বিদেশবাস অপরিহার্য।

ইমরান খানের দেশপ্রেম, মানবপ্রেম, সেবাপ্রেম নিয়ে সংশয় নেই। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে বসেও তিনি বন্দি। তাঁকে ঘিরে রয়েছে দুর্নীতিবাজ, ধান্দাবাজ, আমলা ও সামরিক মহলের কামলারা। রাজনাথের সদিচ্ছাসূচক প্রস্তাবে ইমরানের পক্ষে কতটা সাড়া দেওয়া সম্ভব, একথা বলা অসম্ভব। মনে হয় এই মুহূর্তে তিনি কোনো ঝুঁকি নেবেন না। বরং বিরূপ কর্কশ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে তাঁকে বাধ্য করবে তাঁর দেশের সামন্তবাদী সমরবাদী আমলাতন্ত্র। যারা ভাত-রুটির সঙ্গে ঘুষ, চায়ের বদলে নিষিদ্ধ পানীয়, নারীর ইজ্জত রক্ষার নামে দেদার কুরুচি ভক্ষণ করে নিয়ন্ত্রণহীনতাকে প্রশ্রয় দেয় এবং সংকট ঘনালেই হুজুগ জাগায়—ইসলাম খতরে মে—তাদের কবল থেকে পাকিস্তানের বা যেকোনো সাচ্চা ইমানদারের নিস্তার কোথায়? দুর্ভাগ্য, ভারতের মতো শক্তিশালী, উদার গণতন্ত্রেও ইদানীং আমরা ধর্মসংকটের দোহাই শুনতে পাচ্ছি। ধর্মের নয়, এর নাম ‘সভ্যতার সংকট’, সংকট মানবিকতার আর স্বাভাবিক হূদয়বৃত্তির কাঙ্ক্ষিত উত্তরণের।

লেখাটির শুরুতে আমি যে বালিকার পোশাকবদল আর স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসার গল্প বলেছি, এ গল্পের মর্মার্থের মতো সমাজের সব স্তরে আত্মশোধন দরকার। দরকার বিবেক, যুক্তি আর বুদ্ধির সমবেত জাগৃতির। দরকার নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে নিরন্তর আত্মজিজ্ঞাসা আর স্বীকারোক্তির। কর্মনিষ্ঠ বীর, যে দেশপ্রেমে জারিত এবং আমৃত্যু প্রাণচঞ্চল, নিজের অবচেতনকেও সে ভয় করে না। রটনা আর সমালোচনায় ঘাবড়ায় না। শির তার হিমালয়ের চূড়ার মতো উন্নত। হূদয় সমুদ্রের মতো অতলস্পর্শী গভীর। গম্ভীর। তটরেখা ছুঁলেই সে তরঙ্গময়, আপসহীন যোদ্ধা। আর মাঝসাগরে অনন্ত প্রশান্ত।

n লেখক: সম্পাদক সর্বভারতীয় দৈনিক, ‘যুগশঙ্খ’।

 প্রধান সম্পাদক মাসিক ‘আরম্ভ’।