ট্রাম্পের আগ্রাসী ‘বলপ্রয়োগ নীতি’

বিশ্বব্যবস্থায় নতুন মার্কিন আধিপত্যের শঙ্কা

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৯

ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে এক আমূল ও আগ্রাসী পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যেখানে আন্তর্জাতিক আইন বা শিষ্টাচারের চেয়ে পেশিশক্তি ও বলপ্রয়োগকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 

সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক সামরিক অভিযানের মাধ্যমে তুলে এনে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দী করার ঘটনা এই নতুন মার্কিন দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে সামনে এসেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অবস্থানকে বিশ্লেষকরা বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন। 

হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এই আগ্রাসী অবস্থানের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, বাস্তব পৃথিবী আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার নয়, বরং ক্ষমতা ও শক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমেই পরিচালিত হয়।

সিএনএনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মিলার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে একটি অপ্রতিরোধ্য পরাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে। মাদুরোকে আটকের ঘটনাকে ট্রাম্প প্রশাসন ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষা অভিযান’ হিসেবে অভিহিত করলেও সমালোচকরা একে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের ওপর নগ্ন সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন।

এই অভিযানের জন্য ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসের কোনো পূর্বানুমতি নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, যা নিয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মাদুরোকে অপসারণের পর ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও স্থিতিশীলতা নিয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা না থাকায় দেশটিতে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মাদুরো-কাণ্ডের পর ট্রাম্পের হুমকির তালিকায় এখন নতুন করে যুক্ত হয়েছে কলম্বিয়া, মেক্সিকো ও ইরানের নাম। এমনকি ডেনমার্কের অংশ এবং ন্যাটোর সদস্য গ্রিনল্যান্ডকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে সামনে এনেছেন মিলার। তাঁর মতে, যুক্তরাষ্ট্র এতটাই শক্তিশালী যে গ্রিনল্যান্ড নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য খুব সহজ। 

মিত্ররাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বকে এমন তুচ্ছজ্ঞান করার বিষয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বশান্তি ও আটলান্টিক সনদের মূল চেতনার পরিপন্থী বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, শক্তিশালী রাষ্ট্র দুর্বল রাষ্ট্রকে জবরদস্তি করবে না—এই বৈশ্বিক ঐকমত্যকে ট্রাম্প প্রশাসন এখন বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও ট্রাম্পের এই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ভারমন্টের সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স প্রশ্ন তুলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র শক্তিশালী বলেই কি সব দেশ শাসন করবে—এমন নীতি আমেরিকার সাধারণ জনগণ আদৌ চায় কি না। উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার মধ্যেও ট্রাম্পের এই ‘বিশ্ব শাসনের’ আকাঙ্ক্ষা কতটুকু সফল হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। 

আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটাররা ট্রাম্পের এই বিতর্কিত ও আগ্রাসী কৌশলকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন, এখন সেটিই দেখার বিষয়। তবে এই সময়ের মধ্যে বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মহল।

সূত্র: সিএনএন

ইত্তেফাক/টিএইচ