আমাদের দেশে সর্বক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রবণতা হইল—অন্যকে পরামর্শ প্রদান। সবাই কেবল অন্যের সংশোধন চাহেন; কিন্তু নিজের দিকে ফিরিয়া তাকাইবার তাহার সময় নাই বলিলেই চলে। নিজের যে গাফিলতি তাহার দিকে প্রথমে দৃষ্টিপাত না করিয়া অন্যের দুর্বলতা আবিষ্কারে অনেকে আনন্দ খুঁজিয়া পান। ইহা যেমন সাধারণ মানুষের আচরণে প্রকাশ পায়, তেমনি প্রকাশ পায় দেশের নানা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও। একটি প্রতিষ্ঠান অপর প্রতিষ্ঠানের দোষত্রুটি উন্মোচন করিতে যায় সম্পূর্ণরূপে নিজের অবস্থান ভুলিয়া গিয়া। ইহাতে শেষ পর্যন্ত কেহই উপলব্ধি করেন না যে, কোথায় তাহার গাফিলতি রহিয়াছে। তাই সংশোধনের পথও উন্মুক্ত হয় না। ইহাতে একটি অচলায়তনের সৃষ্টি হয়; অসংশোধনের অমোঘনীয় চক্রে আটকা পড়ি আমরা সবাই। জাতীয় স্বার্থেই এই দুষ্ট চক্র হইতে মুক্তির পথ আমাদের খুঁজিয়া বাহির করিতে হইবে। কেননা আমাদের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নানা অব্যবস্থাপনার বেড়াজালে আটকা পড়িয়া গিয়াছে। তাহাদের কর্মকাণ্ডে রহিয়াছে নানা অনিয়ম ও অবহেলা। ফলে সাধারণ জনগণকে যে সেবা তাহাদের প্রদান করিবার কথা, তাহা তাহারা প্রদান করিতে পারিতেছেন না। দীর্ঘসূত্রিতা দেখা দিতেছে এবং বিভিন্ন কাজের জট পাকাইয়া উঠিতেছে।
এই অচলাবস্থা হইতে মুক্তির পথ হইতে পারে আমাদের সমাজেই চালু থাকা একটি পুরাতন প্রবচনের অনুসরণ, তাহা হইল :‘আপনি আচরি ধর্ম পরকে শেখাও’। অর্থাত্ আগে নিজেকে সংশোধন করিতে হইবে। ইহার পর অন্যকে সংশোধিত হইবার আহ্বান জানাইতে হইবে। সকলেই আগে নিজ নিজ কর্ম সাধন করিয়া নিঃশব্দে অন্যের জন্য উদাহরণ সৃষ্টি করিতে পারেন। এই প্রক্রিয়াই বেশি ফলপ্রসূ হইবে। কারণ কথার চাইতে সরাসরি কর্ম বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক। আমরা আশা করি, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে এই প্রবচনের মর্ম ও তাত্পর্য সকলে উপলব্ধি করিবেন। ইহার অনুশীলন বৃদ্ধি পাইলে ব্যক্তি পর্যায় হইতে শুরু করিয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান—সর্বক্ষেত্রে ইহা ইতিবাচক ও গুণগত পরিবর্তনের সূচনা করিবে। বিশেষ করিয়া রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আরো শক্তিশালী হইবার প্রয়োজন রহিয়াছে। আমরা জানি আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ভিত্তি এখনো মজবুত নহে। একটি উন্নত দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যেমন শক্তিশালী, তেমনি জনবান্ধবও। বাংলাদেশ একটি গণপ্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। জনগণই রাষ্ট্রের মালিক। এইরূপ রাষ্ট্রের সবকিছুর উদ্দেশ্য হইল জনগণের কল্যাণ সাধন। আর ইহা সম্ভবপর হইয়া উঠিবে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজ নিজ উদ্যোগে জনবান্ধব নীতি গ্রহণ করে।
অতএব, একে অপরের খুঁত অন্বেষণ না করিয়া আমাদের প্রত্যেকের আত্ম-উন্নয়নে মনোনিবেশ করা প্রয়োজন। আয়নায় নিজের চেহারা দেখিয়া আগে নিজের সংশোধন দরকার। আমরা যদি সবাই স্ব স্ব দায়িত্ব- কর্তব্য পালনে আরো সচেষ্ট হই, তাহলেই একটি সুখী ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্রের প্রত্যাশা পূরণ হইবে।
