আমরা ছোটোবেলায় অনেক গুজবের কথা শুনেছি। যেমন ধরা যাক, শোনা যেতো অমুক স্থানে একটি ব্রিজ হচ্ছে সেটার কাজ বন্ধ আছে। কারণ সেখানে নাকি এক মায়ের একমাত্র পুত্রের রক্ত চেয়েছে। আবার অন্য আরেকটি স্থানের ছোট্ট একটি কালভার্ট হবে যেখানে এক বাপের একমাত্র সন্তানের মাথা কিংবা রক্ত চেয়েছে। সেসব শুনে সত্যিই এসব বন্ধ থাকা নির্মাণাধীন ব্রিজ বা কালভার্টের পাশ দিয়ে কোনো লোক সহজে দিনের বেলাতেও যেতে ভয় পেয়েছে। আর এক বাপের বা মায়ের একমাত্র পুত্র হলে তো কথাই নেই। কিন্তু পর্যাপ্ত ফান্ড না থাকার কারণেই সেসব কাজ বন্ধ থাকত। অথচ গুজব ছড়ানো হতো রক্ত বা মাথা না পেয়েই কাজ বন্ধ হয়ে আছে। বিগত তিন যুগে দেশ অনেকদূর এগিয়েছে। সামাজিকভাবে, অর্থনীতিতে, শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞানে-বিজ্ঞানেও এগিয়েছে। এগিয়েছে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগেও। সেই ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করেই এখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সেই আগের মতোই গুজব ছড়াচ্ছে।
প্রথম দিকে মনে হতো যে এগুলো হয়তো না বুঝে আনাড়ি কেউ করে ফেলছে। কিন্তু আস্তে আস্তে এ বিষয়টি পরিষ্কার হচ্ছে যে এগুলো পরিকল্পিতভাবে একটি চিহ্নিত চক্র করে চলেছে। গুজব একটি সামাজিক ব্যাধি। এটি অসুস্থ মানুষের অসুস্থ মানসিকতার ফল। কখনো কখনো এটি বিশেষ মহল বিশেষ উদ্দেশে ব্যবহার করে থাকে। সম্প্রতি এমন একটি বিষয় সারাদেশে অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। এসব দেখে মনে হচ্ছে আমরা যেন সেই আগের যুগে ফিরে গেছি, যেখানে আধুনিকতার লেশ মাত্র নেই। এর শুরু সম্প্রতি দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলা পদ্মা সেতুর নির্মাণ অগ্রগতি নিয়ে।
এ গুজবটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পর দেশজুড়ে পরিকল্পিতভাবে একটি অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। দেখা গেছে আজকে নেত্রকোণায় এক শিশুর মাথা কেটে নিয়েছে এবং তারপর মাথা কর্তনকারী তত্ক্ষণাত্ আবার গণপিটুনিতে মৃত্যুবরণ করেছে। আবার কাল ঢাকায় ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে পিটিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। অমুক স্থানে গলাকাটা লাশ পাওয়া গেছে। অমুক স্থানে পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে ছেলেধরা ইত্যাদি আরো কত কি। এভাবে সারাদেশে আতঙ্ক ছড়ানোর কারণে শিশুদের স্কুলে উপস্থিতি কমে গেছে। ভয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে আছে সারাদেশের অভিভাবকরা।
এগুলো যারা করছে তারা হলো সরকার বিরোধী দুর্বৃত্ত চক্র। বিভিন্ন জায়গায় এগুলোর সাথে জড়িত থাকার কারণে যাদেরকে এরই মধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদেই এসব তথ্য পাওয়া গেছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। কারণ বিভিন্নভাবে সরকার এবং সরকারের উন্নয়নমূলক কাজকে যারা সমর্থন জানাতে পারছে না তারাই গুজব ছড়িয়ে সরকারকে ব্যর্থ করতে চাচ্ছে। তারা চলমান সুষ্ঠু থাকা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে এমন পথকেই বেছে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। তবে যেহেতু দুর্বৃত্তদের অপকর্ম সকলের নিকট পরিষ্কার হয়ে গেছে কাজেই এখন এ নিয়ে আর আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পুলিশ, র্যাবসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যগণ বিভিন্ন স্থানে সচেতনতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তাদের নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় শিক্ষার্থীদের মোটিভেশন দেওয়ার প্রক্রিয়া হাতে নিয়েছে। এতে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে এসেছে। শুধু পদ্মা সেতুকে নিয়েই নয় ভবিষ্যতে যে কোনো বিষয়ে যে কোনো ধরনের গুজবকে এভাবেই মোকাবিলা করার জন্য সম্মিলিত প্রয়াস গ্রহণ করতে হবে।
n লেখক :ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার,
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
