যুদ্ধের দামামা বাজিয়ে পরমাণু চুক্তি থেকে সরে গেল যুক্তরাষ্ট্র

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০১৯, ২১:৪১

সোভিয়েত যুগে রাশিয়ার সঙ্গে করা গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ‘দি ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি’ বা আইএনএফ চুক্তিটি ছিল মূলত অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের ভিত্তি। চুক্তিটি বাতিল হয়ে যাওয়ায় অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়ার পাশাপাশি আবারও ‘ঠান্ডা যুদ্ধে’র দিনগুলি ফিরে আসার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের। আইএনএফ ১৯৮৭ সালে স্বাক্ষর করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যান ও সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচভ। চুক্তি অনুযায়ী ৫০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের মধ্যে সব স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার পরমাণু ও অপারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী ১৯৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ হাজার ৭০০ ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া। চুক্তির আওতায় দুই দেশ একে অন্যের স্থাপনাও পর্যবেক্ষণ করতে পারত।

কিন্তু চলতি বছরের শুরুতেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউরোপ সীমান্তে নতুন ধরনের ক্রুজ মিসাইল মোতায়েনের মাধ্যমে চুক্তি ভঙ্গের অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, রাশিয়া বেশ কিছু নাইন এম-৭২৯ মিসাইল (যেগুলো ন্যাটোতে এসএসসি-৮ নামে পরিচিত) মোতায়েন করেছে এবং এর প্রমাণ তাদের হাতে আছে। এরপর ন্যাটোও একই অভিযোগ তোলে। যদিও রাশিয়া এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া যদি চুক্তিটা মেনে চলতে না চায়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসবে। এজন্য তিনি ২ আগস্ট পর্যন্ত সময়সীমা বেঁধে দেন। ট্রাম্পের এমন অবস্থানের পর এক্ষেত্রে রাশিয়ার যে আপত্তি নেই সেটিও বুঝিয়ে দেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।

গতকাল শুক্রবার সেই ঘোষণা মোতাবেক আইএনএফ চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এক বিবৃতিতে চুক্তিটির মৃত্যুর জন্য রাশিয়াকেই দায়ী করেছেন। তার দাবি, ন্যাটোর পূর্ণ সমর্থন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিত হয়েছে যে, রাশিয়া চুক্তি ভঙ্গ করেছে এবং চুক্তির বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোটের (ন্যাটো)  মহাসচিব জেনস স্টোলেনবার্গও এজন্য রাশিয়াকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে আইএনএফ চুক্তির আনুষ্ঠানিক মৃত্যু ঘটেছে।

বিশ্বে অস্ত্র প্রতিযোগিতা

বাড়ার আশঙ্কা

পরমাণু যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে ৩২ বছর আগে করা চুক্তিটি বিলুপ্ত হওয়ার পর বিশ্বে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। রাশিয়ান সামরিক বিশ্লেষক পাভেল ফেলগেনহর বলেছেন, চুক্তিটি শেষ হয়ে গেছে। এখন আমরা নতুন নতুন অস্ত্রের উন্নয়ন ও মোতায়েন দেখব। দেখব সেই সব অস্ত্র বসানো হচ্ছে একে-অন্যকে তাক করে। রাশিয়া এখনই তার জন্য তৈরি আছে।

মার্কিন কর্মকর্তারাও বলছেন, স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো বাধা নেই। এক্ষেত্রে দ্রুত তহবিল বরাদ্দ দেওয়া হবে। 

এমন প্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্টোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেছেন, পরমাণু যুদ্ধের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা সরে গেল। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পদক্ষেপে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি কমেনি বরং বেড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করতে সব পক্ষকে সমঝোতায় পৌঁছানোর আহবান জানিয়েছেন তিনি।

ন্যাটোর মহাসচিব জেনস স্টোলটেনবার্গ বলেছেন, আইএনএফ চুক্তি গত কয়েক দশক করে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের একটি ভিত্তি ছিলো এবং এখন আমরা তার মৃত্যু দেখলাম। এজন্য রাশিয়া দায়ী। তিনি বলেন, রাশিয়া যে ক্ষেপণাস্ত্র বসিয়েছে সেগুলো পরমাণু অস্ত্র বহন করতে পারে। এক জায়গা থেকে দ্রুত অন্য জায়গায় যেতে পারে। এগুলোর গতিবিধি শনাক্ত করাও কঠিন। এগুলো কয়েক মিনিটের মধ্যে ইউরোপের শহরগুলো গুঁড়িয়ে দিতে পারে। বুঝতেই পারছি, চুক্তির দিন ফুরিয়ে এল! তবে তিনি বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতায় যাবে না ন্যাটো। তবে ইউরোপে রাশিয়ার যে কোনো ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার যথাযথ জবাব দিতে প্রস্তুত রয়েছে ন্যাটো।

মতভেদ আগেও ছিল

২০০২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ অ্যান্টি ব্যালিস্টিক মিসাইল চুক্তি থেকে সরে আসেন। ২০০৭ সালে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ঘোষণা দেন যে, আইএনএফ চুক্তি আর রাশিয়ার স্বার্থ সংরক্ষণ করছে না। ২০১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা রাশিয়ার বিরুদ্ধে আইএনএফ চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেন। তবে ইউরোপিয়ান নেতারা চাপ দিলেও তিনি চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ানোর পক্ষপাতী ছিলেন না। সর্বশেষ গত বছর চুক্তি লঙ্ঘনের বিষয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে সমর্থন করে ইউরোপ ও ন্যাটো। অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে যুক্তরাষ্ট্র পটভূমি তৈরি করছে।