গাজা পুনর্গঠনে ট্রাম্পের ‘মহাপরিকল্পনা’ যেন শুভঙ্করের ফাঁকি

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪০

সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে গাজার ভবিষ্যৎ নিয়ে এক উচ্চাভিলাষী ‘মহাপরিকল্পনা’ উপস্থাপন করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ঝলমলে সব স্লাইডের মাধ্যমে এক ‘নতুন গাজা’র চিত্র তুলে ধরেন, যেখানে উপকূলজুড়ে ১৮০টি উঁচু টাওয়ার, ডেটা সেন্টার এবং অত্যাধুনিক শিল্প কমপ্লেক্সের কথা বলা হয়েছে। 

ট্রাম্প এই পরিকল্পনাকে গাজার নিরস্ত্রীকরণ ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি হিসেবে বর্ণনা করলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, মাঠ পর্যায়ের ধ্বংসস্তূপ ও রাজনৈতিক জটিলতার সঙ্গে এই পরিকল্পনার বিস্তর ফারাক রয়েছে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, কুশনারের এই মানচিত্রে গাজার প্রায় অর্ধেক এলাকা আবাসিক হিসেবে দেখানো হলেও ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা বা ইচ্ছার কোনো প্রতিফলন সেখানে নেই।

ওয়াশিংটন পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের এই পরিকল্পনা গাজার বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বর্তমানে গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে এবং বাকি অংশে প্রায় ২০ লাখ ফিলিস্তিনি মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

জ্যারেড কুশনার ৯০ হাজার টন ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে অবকাঠামো গড়ার কথা বললেও আরব নেতারা আশঙ্কা করছেন, ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে পুনর্গঠন শুরু করার এই কৌশল গাজার একটি বড় অংশ স্থায়ীভাবে ইসরায়েলি কবজায় নিয়ে যেতে পারে। চার ধাপের এই পরিকল্পনায় রাফাহ থেকে কাজ শুরু করার কথা বলা হয়েছে, যা বর্তমানে ইসরায়েলি বাহিনীর অধীনে রয়েছে। যদিও জাতিসংঘ জানিয়েছে যে যুদ্ধবিরতির পর মানবিক সহায়তা বেড়েছে, তবুও অপুষ্টি ও উচ্চমূল্য এখনো গাজার বাসিন্দাদের প্রধান সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিকভাবে গাজা পরিচালনার জন্য সম্প্রতি ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত একটি কমিটি আশার আলো দেখালেও তাদের ক্ষমতা এখনো অস্পষ্ট। গাজার প্রকৌশলী আলি শাথের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি কায়রোতে বৈঠক শুরু করেছে এবং হামাসও তাদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে আগ্রহ দেখিয়েছে। 

দাভোসে ভিডিও বার্তায় শাথ আগামী সপ্তাহে রাফাহ ক্রসিং খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, যা ট্রাম্পের ২০ দফা পরিকল্পনারও অংশ। তবে হামাসের হাতে থাকা শেষ ইসরায়েলি সেনাকে ফেরত না পাওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই বিষয়ে কোনো সবুজ সংকেত দেননি। এছাড়া ট্রাম্পের প্রস্তাবিত ‘শান্তি পর্ষদে’ তুরস্ক ও কাতারের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইসরায়েলের কট্টরপন্থিদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

অর্থায়নের বিষয়টি এই মহাপরিকল্পনার সবচেয়ে দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। জ্যারেড কুশনারের উপস্থাপনায় গাজা পুনর্গঠনের সম্ভাব্য ব্যয়ের কোনো উল্লেখ ছিল না, যদিও জাতিসংঘ এবং আরব দেশগুলো এই খরচ ৫ হাজার কোটি থেকে ৭ হাজার কোটি ডলার হতে পারে বলে অনুমান করছে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কুশনারের উপস্থাপিত ১০টি স্লাইডের মধ্যে মাত্র একটিতে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের কথা ছিল, যেখানে আরবি লেখাটি ছিল উল্টো এবং অস্পষ্ট। এর ফলে দাতা দেশগুলো এখনো অর্থ দেওয়ার কোনো অঙ্গীকার করেনি।

একদিকে ট্রাম্প হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিনিময়ে ক্ষমার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অন্যদিকে ইসরায়েল এখনো গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারের কোনো লক্ষণ দেখাচ্ছে না। বরং যুদ্ধবিরতির মধ্যেও ইসরায়েলি হামলায় ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু অব্যাহত রয়েছে, যা এই মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

ইত্তেফাক/টিএইচ