একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাতিল ও বৈধতার বিরুদ্ধে মোট ৫৪৩টি আপিল আবেদন পড়েছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। রিটার্নিং অফিসারের মনোনয়ন যাচাই-বাছায়ে বাতিল হওয়া ৭৮৬ জনের মধ্যে ২৪৩ জন আপিল করেননি। আপিল আবেদনগুলো আজ বৃহস্পতিবার থেকে শনিবার পর্যন্ত তিনদিন শুনানি করে নিষ্পত্তি করবে কমিশন। প্রতিটি আপিল শুনানি শেষ হওয়ার পরপরই রায় জানিয়ে দেবে ইসি। প্রথমদিন সকাল ১০টায় ক্রমিক নম্বর ১ থেকে ১৬০ নম্বর আপিল আবেদনের শুনানি হবে। ৭ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দিনে ১৬১ থেকে ৩১০ নম্বর আবদনের শুনানি হবে। আর শেষ দিন ৮ডিসেম্বর ৩১১ থেকে ৫৪৩ নম্বর আবেদনের শুনানি হবে।
ইসি সচিব হেলালুদ্দীন আহমদের তথ্যমতে, ২৮ নভেম্বর মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল। সে সময় মোট ৩ হাজার ৬৫টি মনোনয়নপত্র দাখিল হয়েছিল। ২ ডিসেম্বর বাছাইয়ে ৭৮৬টি বাতিল হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করার সুযোগ ছিল তিনদিন (৩ থেকে ৫ডিসেম্বর)। ঢাকার আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে এসে এই আপিল করেন সংক্ষুব্ধরা। প্রথম দিন ৮৪ জন আপিল করেছিলেন। দ্বিতীয় দিন মঙ্গলবার ২৩৭ জন আপিল করেন, শেষ দিন বুধবার ২২২টি আপিল জমা পড়ে। সব মিলিয়ে আপিলকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৪৩টি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা, নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম, কবিতা খানম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী এ আপিল শুনানিতে অংশ নিবেন। নির্বাচন ভবনে ১১ তলায় এ লক্ষ্যে এজলাস তৈরির কাজও শেষ হয়েছে। জানা গেছে, নির্বাচনে লড়তে রেকর্ডসংখ্যক আপিল আবেদন জমা দিয়েছেন সারা দেশের প্রার্থীরা।
রংপুর-৩ আসনে জাতীয় পার্টি-জাপার চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মনোনয়ন বাতিল চেয়ে আপিল করে প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দলের প্রার্থী সাব্বির আহমেদ। বিদেশে ব্যবসার তথ্য গোপন, কর ফাঁকি, মামলার তথ্য গোপনসহ বেশ কয়েকটি অভিযোগে এরশাদের বিরুদ্ধে আপিল করেন তিনি। সকালে ঢাকা-৮ আসনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা আব্বাসের প্রার্থিতার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মহাজোটের প্রার্থী রাশেদ খান মেননের পক্ষে আপিল করেন তার আইনজীবী জেয়াদ আল মালুম। বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পঙ্কজ দেবনাথের মনোনয়নের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আপিল করেন ওই আসনের ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী মেজবাহউদ্দিন ফরহাদ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের মাহাবুবুল আলম মাস্টার্স। এছাড়া বগুড়া-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী আব্দুল মমিনের বিরুদ্ধে আপিল করে মুক্তিযোদ্ধা সারওয়ার হোসেন।
তিনটি আসনে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার প্রার্থিতার বৈধতা চেয়ে নির্বাচনে কমিশনে আপিল করেন তার আইনজীবীরা। বগুড়া-৭ আসনে এডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার, বগুড়া-৬ আসনে নওশাদ জমির ও ফেনী-১ আসনে খালেদা জিয়ার পক্ষে আপিল আবেদন জমা দেন কায়সার কামাল। এ সময় কায়সার কামাল সাংবাদিকদের বলেন, কমিশন আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ থাকলে নির্বাচনে লড়তে পারবেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। উচ্চ আদালতের আপিলের বিষয়ে আমলে নিয়ে নির্বাচন কমিশন খালেদার প্রার্থিতা ফিরিয়ে দিয়ে ন্যায় বিচার করবে বলেও প্রত্যাশা করেন তিনি।
মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়া, সাবেক মন্ত্রী মোর্শেদ খান, জাতীয় পাটি-জাপার সদ্য পদচ্যুত মহাসচিব এ বি এম রুহুল আমিন হাওলাদার, চলচ্চিত্র তারকা সোহেল রানা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের রেজা কিবরিয়া, বিএনপির সাবেক মন্ত্রী মীর নাছির উদ্দিন, আমান উল্লাহ আমান, গোলাম মওলা রনি, আফরোজা আব্বাস, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাকির হোসেন, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারও আপিল করেছেন।
তাত্ক্ষণিক রায় পাবেন প্রার্থীরা
নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, ৩-৫ ডিসেম্বর সংক্ষুব্ধ প্রার্থীরা ৫৪৩টি আপিল আবেদন জমা দিয়েছেন। তিন দিনের মধ্যেই নিষ্পত্তি সম্ভব।
এদিকে, ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে আপিল নিষ্পত্তি শেষ করতে বিএনপির অনুরোধের বিষয়টি বিবেচনা করা সম্ভব নয় বলে জানিয়েন ইসি সচিব। তিনি বলেন, অনেক সংখ্যক আপিল কারণে এটি সম্ভব নয়। তাদেরকে বুঝিয়ে বলা হয়েছে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে, রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হওয়ায়, অন্য রাজনৈতিক দলের প্রতীক নিয়ে ভোট করতে কমিশনের কোন আইনি বাধা নেই বলেও জানান তিনি।
৯ ডিসেম্বরের মধ্যে ‘মার্কা’ কে পাবে তা জানাতে হবে
বিভিন্ন আসনে রাজনৈতিক দলগুলোর একাধিক প্রার্থীর মধ্যে যার নাম চূড়ান্ত মনোনয়নের জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে যেটি পাঠানো হবে তাই গ্রহণ করা হবে। ইসি সচিব বলেন, যেসব আসনে একাধিক প্রার্থী আছে, একজনকে চূড়ান্ত করে চিঠি দিলেই বাকি প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়নের অযোগ্য বিবেচিত হবেন। সরাসরি, বার্তাবাহক, অনলাইনে, মেইলে, ওয়েবসাইটে পাঠিয়ে দিলেই হবে। এছাড়া, আপিল শুনানির পর তড়িত্ গতিতে এমনকি প্রয়োজনে টেলিফোনে মনোনয়ন বৈধতার বিষয়ে স্থানীয় রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানিয়ে দেয়া হবে। ইসি সচিব বলেন, প্রার্থী বা যে কোন ব্যক্তি আগামী ৯ ডিসেম্বর তার পক্ষে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিতে পারবেন। দলীয় অফিস থেকে চিঠি দিয়ে জানালে বাকি প্রার্থীরা স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বাতিল হয়ে যাবেন।
জাপা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ও নতুন দায়িত্ব পাওয়া মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙার স্বাক্ষরিত চিঠি পেয়েছে কমিশন। সে কারণে জাপা মহাসচিব বদলে তাদের প্রার্থিতায় কোন ধরনের প্রভাব পড়বে না বলে জানান ইসি সচিব।
