বিশ্বজিত্ দাস
‘তোমরা কি জানো কেন তোমাদের রেজাল্ট খারাপ হয়?’ রেজা স্যার জানতে চাইলেন। মাত্র সপ্তাহ খানেক হলো কলেজের ক্লাস শুরু হয়েছে। আজই তিনি প্রথম ক্লাস নিচ্ছেন।
‘না স্যার।’ সমস্বরে বলল ইছামতি মহিলা কলেজের ছাত্রীরা।
‘আগে বল কে কে গ্রাম থেকে এসেছ?’
অনেকে হাত তুলল। শারমিনও তুলল।
‘অতিরিক্ত বাড়িপ্রীতিই তোমাদের রেজাল্ট খারাপের অন্যতম কারণ।’
সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হলো।
‘গতকাল ছুটির দিন পেয়ে কে কে গ্রামের বাসায় গিয়েছিলে?’
এবারো শারমিন হাত তুলল। লক্ষ্য করল, অনেকে গিয়েছিল কিন্তু হাত তুলল না।
‘তোমরা সবাই সাহসী। তাই সায়েন্সে ভর্তি হয়েছ। ভালো রেজাল্ট করে কেউ ডাক্তার কেউবা ইঞ্জিনিয়ার হবে। সেজন্য চাই সাধনা। ঘনঘন গ্রামের বাসায় গেলে সাধনায় সিদ্ধি লাভ করবে কিভাবে!’
সব ছাত্রী চুপ হয়ে গেল।
ভর্তি হওয়ার পরপরই বাসায় গিয়েছিল শারমিন। ওর মেসের এক বড় আপু মুখ বাঁকা করে বলেছিল, ‘যাও যাও। তোমাদেরই তো দিন।’
‘কেন আপু! আপনি কি বাসায় যান না?’
‘বেশি বেশি গিয়েছিলাম বলেই তো আজ আমার এই অবস্থা!’
‘কেন আপু! আপনি তো ভালোই আছেন। অনার্সে পড়ছেন। লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পেলেই শামসুল ভাইয়ার সাথে আপনার বিয়ে। আপনার আর চিন্তা কীসের।’
‘তোমারই বা বাসার জন্য অত চিন্তা কীসের? তুমি না গেলে তোমার আব্বু-আম্মু কি না খেয়ে থাকবে! তোমার বাসার গরু ছাগল কি ঘাস খাবে না! মুরগি কি ডিম দেবে না!’
শারমিন হেসেছিল। ‘তা কেন হবে আপু। আসলে মনে হচ্ছে অনেকদিন আব্বু-আম্মুকে দেখি না।’
‘ঘনঘন বাসায় গেলে রেজাল্ট কিন্তু ভালো হবে না। তুমি আমাদেরই গ্রামের মেয়ে তাই বলছি। ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তির পর সবাই এই ভুল করে। সপ্তাহে সপ্তাহে বাসায় গেলে রেজাল্ট খারাপ হবেই। আমিও এই ভুল করেছিলাম। ছোটবেলা থেকেই স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবো। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি শুধু ঘন ঘন গ্রামের বাসায় যাওয়ার জন্য।’
‘এইবার ঘুরে আসি আপু। এরপর আর যাব না আপু।’ প্রতিজ্ঞা করেছিল শারমিন।
দুই.
‘বড় কিছু পেতে চাইলে প্রতিজ্ঞা করতে হয়, রেজা স্যার বলে চলেছেন, যতবার তুমি গ্রামের বাসায় যাবে, ততবারই তুমি সিলেবাস থেকে পিছিয়ে পড়বে। ডাক্তার হতে চাও কে কে হাত তোল দেখি।’
অনেকে হাত তুলল। শারমিনও তুলল।
‘ইঞ্জিনিয়ার হতে চাও কে কে?’
আবার কয়েকটা হাত উঠল। তবে সংখ্যায় কম।
‘ডাক্তারই হও আর ইঞ্জিনিয়ারই হও, যখন চাকরি করবে তখন কি গ্রামের বাসায় যেয়ে বসে থাকবে আর মাসে মাসে অফিসে এসে বেতন নিয়ে যাবে?’
স্যারের কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল।
‘তাহলে বুঝতেই পারছ, রেজাল্ট ভালো করতে হলে কিছু ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ঘনঘন গ্রামের বাসায় যাওয়া বন্ধ করতে হবে।’
‘তাহলে কি আমরা বাবা-মাকে দেখতে বাসায় যাব না স্যার?’ একজন ছাত্রী সাহস করে দাঁড়িয়ে বলল।
‘যাবে না কেন! অবশ্যই যাবে। যখন কলেজ বন্ধ পাবে তখন যাবে। তুমি যেমন তোমার বাবা-মাকে ভালোবাস তেমনি তারাও তোমাকে ভালোবাসেন। তারা বুকে পাথর চেপে তোমাকে পড়তে পাঠিয়েছেন, আর তুমি ঠিকমতো পড়বে না!’
‘পড়ব না কেন স্যার, আমরা অবশ্যই পড়ব কিন্তু মাঝে মাঝে বাসায় গেলে কী এমন ক্ষতি হবে?’ আরেকটা মেয়ে বলল।
রেজা স্যার হেসে ফেললেন। বললেন, ‘কারো না কারো তো ক্ষতি হয়ই।’
‘কার ক্ষতি হয় স্যার?’
‘মুরগির।’
‘মুরগির!’ সবাই সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠল।
‘তোমরা বাসায় গেলে বাবা মা মনে করেন, বেচারি মেসে ভালো কিছু খেতে পায় না। অতএব কাটো মুরগি। এভাবে যতবার তুমি বাসায় যাবে ততবারই একটা করে মুরগির জীবন যাবে। মুরগিও তখন তোমাকে অভিশাপ দেবে।’
সবাই হেসে উঠল।
‘তোমরা আমার কথাটি ভেবে দেখ।’
‘কোন কথা স্যার?’
‘এই যে বললাম, ঘনঘন গ্রামের বাসায় না যাওয়ার চেষ্টা করবে।’
‘ঠিক আছে স্যার। যাব না।’
শারমিনও আবার প্রতিজ্ঞা করল, ঈদের বন্ধের আগে গ্রামের বাসায় যাবে না।
কলেজ শেষে প্রাইভেট পড়ে ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। মেসের গেটের সামনেই দেখা হয়ে গেল রিয়ার সাথে। তার হাতে ভারী ব্যাগ। একই গ্রামে ওদের বাসা।
‘কী রে তুই কোথায় যাচ্ছিস?’
‘বাড়ি যাচ্ছি। পরশু ফিরব।’
অমনি শারমিন চেঁচিয়ে উঠল, ‘একটু দাঁড়া। আমি রেডি হয়ে আসছি। আমিও যাব।’
