রাজশাহীতে পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণ করে সেচের সমস্যার সমাধান এবং আইটি পার্ক সচল করে প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়াও তিনি রাজশাহীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আম সংরক্ষণের হিমাগার নির্মাণ, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্প সচল এবং ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সুদসহ কৃষিঋণ মওকুফ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা ময়দানে (হাজী মুহম্মদ মুহসীন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে মাঠে) এক বিশাল নির্বাচনি জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব প্রতিশ্রুতি দেন।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বেলা ২টা ৩০ মিনিটে জনসভায় ভাষণ শুরু করেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে টানা ২৭ মিনিট কথা বলেন। এছাড়া তিনি বৃহত্তর রাজশাহীর নাটোর, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ১৩টি আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের হাতে ধানের শীষ তুলে দিয়ে ভোটারদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভোট প্রার্থনা করেন।
তারেক রহমান বলেন, ‘আজ আমি অন্য দলের সমালোচনা করতে আসিনি। আমি বলতে চাই জনগণের কথা, এলাকার মানুষের উপকার হয়—এমন কথাই আজ বলব। অন্যের সমালোচনা করে কি জনগণের লাভ হবে? হবে না।’ দীর্ঘ ২২ বছর পর রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে সরাসরি দেখা হওয়ার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘রাজশাহীর মানুষের সঙ্গে আমার আত্মার সম্পর্ক রয়েছে।’ তখন নিচ থেকে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা করতালি দিয়ে তাকে অভিনন্দন জানান।
গত ১৬-১৭ বছরে ভোটাধিকার হরণ হয়েছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘নিশিরাতের নির্বাচন, গায়েবি নির্বাচন আমরা দেখেছি। জনগণের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্র থাকলেই জনগণের প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। আমরা ধর্ম নয়, মানুষ দেখি। ১৯৭১ সালে আপনারা মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলেন। তখন ধর্ম দেখি নাই। এখন দেশ গড়ার সময় আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান—সবাইকে নিয়ে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষ বিজয়ী হলে, ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হবে জনগণের দিন। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘আমরা দেশে শান্তি চাই। ৭১ সালের যুদ্ধে বা ২৪-এর জুলাই আন্দোলনে কেউ দেখেনি কার কী ধর্ম। আজ দেশ গড়ার সময়েও আমরা ধর্ম দেখব না, আমরা দেখব সে একজন বাংলাদেশি।’ নির্বাচন নিয়ে যে কোনো ষড়যন্ত্র রুখতে তিনি নেতাকর্মীদের সজাগ থাকার আহ্বান জানান।
বিএনপি প্রধান বলেন, ‘অন্য জেলার মানুষের রাজশাহীর কথা মনে আসলে প্রথমে মনে আসে পদ্মা নদীর কথা। কিন্তু নদী থাকলেই তো হবে না, নদীতে পানি থাকতে হবে। আবার রাজশাহীর কথা মনে আসলে শিক্ষা নগরীর কথা মনে আসে। এখানে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে; উচ্চশিক্ষিত মানুষ আছে। কিন্তু সেই মানুষের কর্মসংস্থান নাই। এখানে আইটি ভিলেজ আছে, কাজ নাই। ইন্টারনেট নাই। বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চালু করেছিলেন। ফলে বরেন্দ্র অঞ্চলে ফসলের উত্পাদন দ্বিগুণ হয়েছিল। সেটি এখন বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ধানের শীষে বিজয়ী হলে আমরা পদ্মা ব্যারেজের কাজে হাত দিতে চাই। আইটি ভিলেজে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে চাই। বিএমডিএ-কে সচল করতে চাই। সুদসহ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করতে চাই।’
জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সভাপতি মামুন অর রশিদ মামুন। সঞ্চালক ছিলেন রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাফজুর রহমান রিটন। রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষের বাঁধ ভাঙা উপস্থিতিতে জনসভার মঞ্চে সকাল ১০টা থেকে স্থানীয় বিএনপির নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন আসনে বিএনপির প্রার্থীবৃন্দ বক্তব্য দিতে শুরু করেন।
দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের দিকে তারেক রহমানকে বহনকারী উড়োজাহাজ রাজশাহীর হযরত শাহ মখদুম (রহ.) বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে নামার পর কড়া নিরাপত্তায় তারেক রহমান আমচত্বর-সিটিহাট-তেরোখাদিয়া-লক্ষ্মীপুর-সিঅ্যান্ডবি-সার্কিট হাউজ হয়ে মাদ্রাসা ময়দানের সামনে দিয়ে বেলা সোয়া ১টার দিকে হযরত শাহ মখদুম (রহ.) এর দরগা শরিফে যান। মাজার জিয়ারত এবং পরিদর্শন বইয়ে মন্তব্য ও স্বাক্ষরের পর বেলা ১টা ৫৫ মিনিটে নির্বাচনি জনসভায় যোগ দেন। এ সময় সড়কের দুপাশে সমবেত হাজার হাজার নেতাকর্মী ও জনতাকে হাত নেড়ে তারেক রহমান অভিবাদন জানান।
কৃষকদের জন্য আলাদা পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘প্রত্যেক কৃষকের হাতে কৃষি কার্ড দেওয়া হবে। এর মাধ্যমে সার, বীজ ও কৃষিঋণ সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছাবে। ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।’ এ কথা বলার পরে তিনি দর্শকদের কাছ থেকে উত্তর জানতে চান, এতে চলবে? তখন সবাই তাকে করতালি দিয়ে সমর্থন জানান।
নারীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’-এর ঘোষণা দিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেক মায়ের হাতে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে, যাতে সংসারের ন্যূনতম ব্যয় সামাল দিতে পারেন। কর্মসংস্থানের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজশাহীতে আইটি পার্ক থাকলেও তা কার্যত অচল। আমরা আইটি পার্ক সচল করব, প্রশিক্ষণ দিয়ে তরুণদের দক্ষ করে তুলব। বিদেশে চিকিত্সা নিতে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে রাজশাহীতে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনার কথাও জানান বিএনপির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, ‘দেশে চিকিত্সা নিশ্চিত করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা দেশের ভেতরেই থাকবে।’ জনসভার মঞ্চের পাশে জুলাই আন্দোলনে আহত পরিবারের সদস্যদের উদ্দেশ্যে তারেক রহমান বলেন, ‘তাদের ত্যাগ যেন বৃথা না যায়, সেই জন্য আমাদের কাজ করতে হবে।’
এদিকে তারেক রহমানের রাজশাহীতে আগমনকে কেন্দ্র করে দিনভর শহর জুড়ে বিরাজ করছিল উত্সবমুখর পরিবেশ। ব্যানার-ফেস্টুন, স্লোগান আর উচ্ছ্বাসে মুখরিত ছিল পুরো শহর এলাকা। প্রিয় নেতাকে একনজর দেখতে সকাল থেকেই রাজশাহী, নাটোর ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে জড়ো হন লাখো নেতাকর্মী।
‘আমাদের পালিয়ে যাওয়ার জায়গা নেই’:নওগাঁ প্রতিনিধি তন্ময় ভৌমিক জানান, রাজশাহীর সমাবেশে অংশ নেওয়ার পর সন্ধ্যা ৭টার দিকে নওগাঁ শহরের এটিএম মাঠে বিশাল নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য দেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি জনগণকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জনগণ যার পাশে থাকে, কেউ তাকে আটকাতে পারে না। জনগণ পাশে ছিল বলেই বিএনপিকে কেউ আটকাতে পারেনি। বিএনপি আজ এই পর্যায়ে এসেছে। তিনি আরো বলেন, আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকলে আমাদের প্রত্যাশিত সেই বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব। কাজেই আমার পরিকল্পনা বলেছি, এখন আপনাদের পরিকল্পনা ১২ তারিখে বিএনপিকে জয়ী করা। বিএনপির চেয়ারম্যান বলেন, এখানে এসে শুনছি শুধু দাবি আর দাবি, এত দাবি থাকলে গত ১৭ বছরে কী হলো? এই ১৭ বছরে উন্নয়ন হয়নি? আমরা যেহেতু এই দেশেই থাকব, কাজেই আমাদেরই এই দেশের উন্নয়ন করতে হবে। প্লেনে চড়ে আমাদের তো আর হুট করে পালিয়ে যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি আট জন প্রার্থীকে পরিচয় করে দিয়ে নির্বাচিত করার জন্য উপস্থিত নেতাকর্মীদের অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, এরা নির্বাচিত হয়েই এলাকায় কাজ করবেন। কাজেই আপনাদের এলাকার দাবি ও সমস্যা যারা দেখবেন তাদেরকে নির্বাচিত করবেন।
তারেক রহমান বলেন, এই জেলা ধানের ভান্ডার, এখানে বছরে তিনটি ধান উত্পাদন হয় যেটা জিয়াউর রহমানের আমলে শুরু হয়েছিল বরেন্দ্র প্রকল্প চালু করার পর। বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ হাজার টাকা কৃষি ঋণ মওকুফ করব। এটা আমি রাজশাহীতে বলেছি, এখানেও বলছি। শুধু ঋণ মওকুফ করব না, আমরা সকলকে কৃষক কার্ড তুলে দেব। এই কৃষি কার্ড দিয়ে একটা ফসলের সকল কিছু তুলে নিতে পারবেন কৃষক, যাতে ঐ কৃষকের অর্থনৈতিক ভিত শক্ত হয় এবং প্রাকৃতিক ক্ষতি মোকাবিলা করতে পারেন।
তিনি বলেন, বর্তমানে এই জেলা আমের জন্য বিখ্যাত, কিন্তু হিমাগার না থাকার অনেক ক্ষেত্রে আম পচে যায়। এই জন্য রেললাইন সংযোগের দিকে নজর দেব। যাতে স্বল্প মূল্যে ও স্বল্প সময়ে বিভিন্ন জায়গায় আমা পাঠাতে পারেন কৃষক। গ্রামের মা ও বাচ্চাদের জন্য হেলথ কেয়ারার দেব। যেন ঘরে বসেই তার ছোট ছোট অসুখ ঠিক করতে পারেন। সকল বেকার ও শিক্ষিতদের জন্য বিভিন্নভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ করা হবে।
‘একটা পক্ষ ষড়যন্ত্র করছে’: নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘এখনো ষড়যন্ত্র শেষ হয়নি। এক পক্ষ চলে গেছে, আরেক পক্ষ আছে। এই এক পক্ষ পালিয়ে যাওয়াদের সঙ্গে ছিল। তারা বিভিন্ন ভাবে ষড়যন্ত্র করছে। তাই আপনারা সতর্ক থাকবেন। তাহাজ্জুদ পড়ে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে বসে থাকবেন। এরপর ভোট শুরু হলে ভোট দেবেন। তবে খেয়াল রাখবেন লাইন নড়ে না কেন এই বিষয়ে, থাকবেন সতর্ক।’
নির্বাচনি এই জনসভায় সভাপতিত্ব করেন নওগাঁ জেলা বিএনপির সভাপতি আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নু। সঞ্চালনায় ছিলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন—দলের নওগাঁ-১ আসনের প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান, নওগাঁ-২ আসনের প্রার্থী শামসুজ্জোহা খান, নওগাঁ-৩ আসনের প্রার্থী ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-৪ আসনের প্রার্থী ডা. ইকরামুর বারী টিপু, নওগাঁ-৫ আসনের প্রার্থী জাহিদুল ইসলাম ধলু ও নওগাঁ-৬ আসনের প্রার্থী শেখ রেজাউল ইসলাম এবং জয়পুরহাট-১ আসনের বিএনপির প্রার্থী মাসুদ রানা প্রধান ও জয়পুরহাট-২ আসনের প্রার্থী আব্দুল বারী। এছাড়া কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ও নওগাঁ পৌরসভার সাবেক মেয়র নজমুল হক সনি, রাজশাহী বিভাগের নেতা ওবায়দুল হক চন্দন বক্তব্য রাখেন। তারা যানজটের শহর নওগাঁয় চার লেন সড়কের বাস্তবায়ন এবং এ জেলায় গ্যাস সংযোগের দাবি জানান।
নওগাঁ জেলা ওলামা ইসলামের সভাপতি মুফতি ইলিয়াস তুহিন বলেন, ‘যেই দল জীবন্ত মানুষকে মেরে ফেলে, যে দল একটা ভোটের জন্য মানুষকে জান্নাতের টিকিট দিতে চায় সেই দল কখনো ইসলামের দল হতে পারে না। অথচ ৭১-এর পর যখনই এই দল হোঁচট খেয়েছে তখনই বিএনপির হাত ধরে কোমর সোজা করে দাঁড়াতে হয়েছে। অথচ তারা এখন অপপ্রচার চালাচ্ছে।’
