একলা নদীর তীরে

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৯, ২০:৪৮

সাইফুল ইসলাম জুয়েল

 

ধীরপদে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়ালেন তিনি। মৃদু বাতাস বয়ে যাচ্ছে। কুলকুল করে বয়ে যাচ্ছে নদীর পানি। নদীটাকে আজ শান্ত বলেই মনে হচ্ছে। অথচ, সেদিন...

তার চোখের সামনে হঠাত্ বাল্যবন্ধু মোতাকাব্বিরের ছবিখানা ভেসে ওঠে। সামনের নদীটা সুদূর বিস্তৃত। অথচ, ওই তো চোখের সামনের দূরত্বেই ছিল স্কুলঘরটা। তার অদূরেই ছিল কয়েকটা চায়ের দোকান। স্কুল ছাড়িয়ে ওপাশের আবদি জমিতে ছিল পরিপক্ব হওয়ার অপেক্ষায় থাকা ফসল।

প্রথমে গেল স্কুলঘরটা। একরাতে নদীটা ফোঁস ফোঁস করে যেন গিলে নেয় ওটাকে। পরদিন সকালে এসে চায়ের দোকানদাররা দোকানগুলোকে অদূরে সরিয়ে নিল। তার পরদিন যখন নদীটা আরেকটু অগ্রসর হলো, তখন আরেকটু পিছাল তারা। এভাবে নদীর সঙ্গে ইঁদুর-বিড়াল খেলা খেলে তারা যদিও এখনো টিকে আছে, তবে টিকে নেই মোতাকাব্বির, টিকে নেই তাঁর পরিবার। প্রখর আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন লোকটা এখন কোথায় আছে কে জানে!

নিম্নমধ্যবিত্ত মোতাকাব্বির কঠিন বিপদের দিনেও মানুষের কাছে হাত পাততেন না। নদী ভাঙনে সর্বস্বান্ত হওয়ার আগেও অভাব ছাড়েনি। তখনো অনেক কষ্টে দিন গুজার করেছেন। টাকা ধার দিতে চাইলে কৃত্রিম হাসি হেসে বলেছিলেন, এই তো ফসল উঠল বলে, তখন সকল কষ্ট ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে! সবকিছু ধুয়ে-মুছে গেছে বটে, কিন্তু গেল না শুধু কষ্টটা। নদী তার ফসলি ক্ষেতটাকেও গিলে খেয়েছে।

মোতাকাব্বির শ্বশুরবাড়িতে যাননি। আত্মসম্মান জলাঞ্জলি দেওয়ার মানুষ তিনি নন। সবার অলক্ষ্যে একরাতে চুপিচুপি গ্রাম ছাড়েন তিনি। এখন কোথায় আছেন? ঢাকার কোনো বস্তিতে, নাকি রাস্তার পাশের কোনো এক ছাপরা ঘরে? মোতাকাব্বিরের সংসার কি এখন তাঁর আনাড়ি হাতে রিকশার হ্যান্ডেল ধরা আর প্যাডেল চালানোয় নির্ভরশীল? অথচ, সেই হাতটা একসময় কতটাই না শক্ত ছিল, লাঙ্গল-জোয়াল নিয়ন্ত্রিত হতো সে হাতে।

‘নদীর এপার ভাঙে ওপার গড়ে...’ নিয়ম মেনে ওপারে সুবিশাল চর জেগে উঠেছে। সেই চর দখল নিয়ে মানুষে মানুষে লেগেছে বুনো লড়াই। এ ওর মাথা ফাটাচ্ছে, মামলা-পুলিশও ছাড়ছে না সমাজের নিম্নবর্গের এসকল মানুষকে! মাঝথেকে ফায়দা লুটে নিচ্ছে উপর মহলের কিছু রাঘব-বোয়াল। তার আফসোস হয়, মোতাকাব্বিরের যদি একটা মাথা গোঁজার জায়গা হতো ওপারের চরটাতে! ছোটবেলার বন্ধু। প্রতিদিন মুখ দেখাদেখি হতো। অথচ, আগে কি তাঁরা একবারও ভেবেছিলেন, ভষ্যিতটা এভাবে লেখা হবে? এতটাদিন চলে যাবে, অথচ, প্রিয় বাল্যবন্ধুর কোনো খবরই থাকবে না তাঁর কাছে। নদীর ওপাড়ে মোতাকাব্বিরের জায়গা হলে নৌকা বেয়ে সপ্তাহে অন্তত একটা দিন দেখা করে আসা যেত।

নৌকার কথা মনে পড়তেই তাঁর চোখের সামনে ভেসে ওঠে বানভাসী মানুষের করুণ চিত্র। এই নদীটা ধরে যদি নৌকা চালিয়েই এগোনো যায়, তাহলে কিছুদিন পরে হলেও দেখা মিলবে তাঁদের। ভিটে-মাটি সবকিছু পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ছোট্ট একটা ডিঙি নৌকায় আশ্রয় হয়েছে অনেকের। ঘরের ছোটখাটো মালমাল সেই নৌকাতেই বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। কতকিছুই যে হারাতে হয়েছে তাঁদের, এখনো হারাতে হচ্ছে।

এসকল বানভাসী মানুষের কষ্টের ভেতরেই ক’দিন পরে পালিত হবে আরেক ধর্মীয় উত্সব। তিনি পত্রিকায় দেখেছেন, বানভাসী অনেক মানুষ নিজে ডুবে হলেও সংসারের একটিমাত্র গরুকে বাঁচাতে মরিয়াপ্রায়। হয়তো ক’দিন পরের এই বিষয়টা তাঁরাও মাথায় রেখেছে। কিছু নগদ অর্থ পেলে উজান থেকে আসা পানির তোর কমে গেলে তাঁরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন—হয়তো এই আশাতেই।

উজান থেকে পানি আসার মতোই ক’দিনের মধ্যেই ঢুকতে শুরু করবে গরু। হু-হু করে নেমে যাবে এ দেশের গরুর দাম। এতদিন ধরে যেই খামারিরা স্বপ্ন দেখে এসেছেন, তাঁদের স্বপ্ন বিরাট ধাক্কা খাবে। কোনো বন্যার্ত গেরস্ত তার গরুর নায্য দাম পাবে না! লাভের গুড়টা খাবে কিছু গরুর দালাল। অথচ, উজানের পানি আর এই গরু দুটোর কোনোটাই এভাবে চোরাস্রোতের মতো আসার কথা নয়। আসলে সারা বছরেই আসার কথা তাদের, একই গতিতে...  g

[email protected]