রেকর্ড ভাঙছে স্বর্ণ ও রুপা: কেন এই অস্থিরতা?

আপডেট : ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ১৫:০৪

গত বছর সোনা ও রুপা ২০২৬ সালে এসে আরও তীব্র হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প ধারাবাহিকভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতির প্রতিষ্ঠিত নিয়ম ও রীতিনীতিগুলো ভেঙে দিচ্ছেন, যার প্রভাব পড়ছে মূল্যবান ধাতুর বাজারে।  

গত বছরের গ্রীষ্ম থেকেই সোনার দাম ঊর্ধ্বমুখী, বাজারদরে একের পর এক রেকর্ড ভাঙছে। শুধু এই মাসেই দাম বেড়েছে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি, আর বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) প্রতি আউন্স প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ ডলার ছুঁয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছায়। তবে শনিবার (৩১ জানুয়ারি) প্রতি আউন্স সোনার দাম ৯.৫% কমে ৪ হাজার ৮৮৩ ডলারে নেমে এসেছে। তারপরও, এক বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে দ্বিতীয় মেয়াদ শুরু করার সময়কার দামের তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ।

এদিকে স্বর্ণের দামের সঙ্গে রুপার দামও নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। গত এপ্রিলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন তার ‘লিবারেশন ডে’ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন বাজারে রুপার দাম প্রতি আউন্স ৩০ ডলারের (২২ পাউন্ড) নিচেই ওঠানামা করছিল। এরপর প্রায় চারগুণ বেড়ে রুপার দাম ১১৮ ডলারের বেশি হয়েছে, যার সবচেয়ে দ্রুত উত্থান ঘটেছে গত এক মাসে।

দাম বৃদ্ধির কারণ কী?

স্বর্ণ বরাবরই অর্থনৈতিক অস্থিরতায় সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত। মুদ্রাস্ফীতি বা ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা যেকোনো সময়ে এটি মূল্য সংরক্ষণের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। তাই এসব অনিশ্চয়তার কোনো ঘাটতি রাখতে চাননি ট্রাম্প।

ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বেশ কিছু আক্রমণাত্মক নীতিমালা এই নতুন অনিশ্চয়তার পেছনে দায়ী। যার মধ্যে রয়েছে বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর শাস্তিমূলক শুল্ক, গ্রিনল্যান্ড বা ইরানের মতো দেশ দখল বা বোমা হামলার হুমকি, সুদের হার কমাতে ফেডারেল রিজার্ভের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ। এইসব অনিশ্চয়তাই বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের স্বর্ণের দিকে ছুটতে বাধ্য করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বুধবার মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্তের পর ট্রাম্প আবারও পাওয়েলের ওপর ক্ষোভ ঝাড়েন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, এমনকি এই নির্বোধও স্বীকার করছে যে মুদ্রাস্ফীতি আর সমস্যা নয়। তবে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করে বলছেন, মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে।

ক্যাপিটাল ডটকমের জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক ড্যানিয়েলা হ্যাথর্ন বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন, সোনা এবং রুপার দামের এই ঊর্ধ্বগতি কেবল স্বল্পমেয়াদী বাজার অস্থিরতার প্রতিফলন নয় বরং এটি বিশ্বকে নতুন করে মূল্য নির্ধারণের সংকেত দিচ্ছে। মুদ্রা, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের বিশ্ব অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর যে আস্থা ছিল, এখন যেন তারই হিসাবনিকাশ চলছে।

ডলারের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়াকে অর্থনীতির ভাষায় ডিবেজমেন্ট বলা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রাস্ফীতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এমনকি ডিবেজমেন্ট হলেও সোনার দাম কমবে না বা এর মান অটুট থাকবে। একই যুক্তি বিটকয়েনের মতো ক্রিপ্টোকারেন্সির ক্ষেত্রে খাটলেও মূল্যবান ধাতুগুলোর মতো বিটকয়েন কেনার হিড়িক এখনো সেভাবে দেখা যায়নি। 

আর কী ঘটছে?

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) তাদের এই সপ্তাহের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, স্বর্ণের বাজার চাঙ্গা হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে স্বর্ণ বাড়ানো। এখন তারা আর শুধু মার্কিন ট্রেজারির (যা মার্কিন সরকারি বন্ড হিসেবে পরিচিত) ওপর ভরসা না করে রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনছে। বিশেষ করে ট্রাম্পের খামখেয়ালি কর্মকাণ্ডের কারণে ওয়াশিংটন থেকে পাওয়া বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের আইওইউ বা দেনাপত্র হাতে রাখা নিয়ে ব্যাংকগুলোর মধ্যে একটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তাই তারা বিকল্প খুঁজছে।  

তবে ডব্লিউজিসির বিশ্লেষণ বলছে, বিশ্ববাজারে স্বর্ণের চাহিদার ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কেনাকাটা একটি উল্লেখযোগ্য এবং বাড়তি প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। তবে ২০২৫ সালে এসব কেনাকাটা আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮৬৩ টনে।

যখন বাজারে কোনো কিছুর দাম হঠাৎ লাফিয়ে বাড়ে, তখন সাধারণ বিনিয়োগকারীরাই এর পেছনে বড় ভূমিকা রাখেন। কারণ বিনিয়োগকারীরা চারপাশের সব ভয়াবহ খবরের মুখে স্বর্ণকে একটি 'নিরাপদ আশ্রয়' ভেবে কেনা শুরু করেন অথবা শুধু দাম বাড়ছে দেখে লাভের আশায় সবাই মিলে বাজারে হুমড়ি খেয়ে পড়েন।

ডব্লিউজিসির জ্যেষ্ঠ বাজার বিশ্লেষক লুইস স্ট্রিট বলেন, গত বছর সাধারণ ক্রেতা এবং বিনিয়োগকারী উভয় পক্ষই স্বর্ণ কিনে তা নিজেদের কাছে জমিয়ে রেখেছেন। তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগের চাহিদা গত বছর সব আলোচনাকে ছাপিয়ে গেছে; যে যেভাবে পেরেছেন স্বর্ণ সংগ্রহের প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। লুইস স্ট্রিট।

রুপার দামও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে স্বর্ণের মতো একই রকম চাহিদার মুখে পড়েছে। সম্ভবত এর দাম তুলনামূলক কম হওয়ায় বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে এটি বেশি সহজলভ্য বা আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। 

ফেডারেল রিজার্ভের (ফেড) স্বাধীনতা এবং মার্কিন নীতি-নির্ধারণী ব্যবস্থার সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগ কেবল স্বর্ণ-রুপার বাজারকেই চাঙ্গা করছে না বরং এটি ডলারের ওপরও এক ধরনের নিম্নমুখী চাপ সৃষ্টি করছে। এর ফলে গত এক সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে ডলারের মান ক্রমাগত কমছে। 

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

ইত্তেফাক/আরকে/টিএইচ