‘বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে ইত্তেফাক ও মানিক মিয়ার নাম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। মানিক মিয়া পাকিস্তান আমলে যে সব কলাম লিখেছেন, তাতে তাকে সাহসী ও শক্তিশালী সাংবাদিক বলতেই হবে। সাংবাদিকতার ইতিহাস জানতে গেলে এসব জানতে হবে। মানিক মিয়া সংবাদপত্রের যে জায়গাটি তৈরি করে গেছেন সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে আমাদের সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে। কিভাবে এতটা সময় ধরে ইত্তেফাক টিকে আছে, এটা জানার বিষয়। ’
দৈনিক ইত্তেফাকের ৬৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে গতকাল বুধবার সকালে ধানমন্ডিতে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস (ইউল্যাব) মিলনায়তনে দৈনিক ইত্তেফাক ও ইউল্যাব আয়োজিত ‘সাংবাদিকতার উত্কর্ষে’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন। এতে সহযোগিতা করে সামিট গ্রুপ, অ্যাকশন এইড, গ্রীন ডেলটা লাইফ ইন্সুরেন্স লিমিটেড, ই-সিকিউরিটিজ লিমিটেড, বিকাশ ও ইস্পাহানি।
কর্মশালায় উদ্বোধনী বক্তব্যে দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশক ও নির্বাহী পরিচালক তারিন হোসেন বলেন, ‘পত্রিকা হিসেবে দৈনিক ইত্তেফাক এ বছর ৬৬ বছরে পা দিতে যাচ্ছে। মানুষ যখন আমাকে জিজ্ঞাসা করে, আপনি কোথায় কাজ করেন, আর আমি বলি দৈনিক ইত্তেফাকে কাজ করি, তখন অনেকেই গর্ব করে বলেন তাদের পূর্ব সুরীরাও দৈনিক ইত্তেফাক পড়তেন। দায়িত্বশীলতা এবং নৈতিক সাংবাদিকতা চর্চার মাধ্যমেই দৈনিক ইত্তেফাক আজ এই অবস্থানে এসেছে। তিনি বলেন, দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা মানিক মিয়ার নামে অ্যাভিনিউ হয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই এই নাম শুনে মানিক মিয়া সম্পর্কে জানতে চান। ’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময়কালে বঙ্গবন্ধু, মানিক মিয়া এবং দৈনিক ইত্তেফাক একসাথে হাতে হাত রেখে চলেছে। বর্তমানে সময় অনেক বদলে গেছে। ইন্টারনেটের এই যুগে সবাই ঘুম থেকে উঠেই অনলাইনে চোখ বুলান। তথ্য এখন সবার জন্য উন্মুক্ত। প্রতিনিয়ত সংবাদের ধরন বদলে যাচ্ছে। তরুণরা এখন শুধু সংবাদ পড়তে চায় না, তারা সংবাদের ছবিও দেখতে চায়, সংবাদ শুনতে চায়। সামাজিক যোগযোগের মাধ্যমও এখন অনেক সরব। আমরা এখন সবাই লাইভে যাচ্ছি, সরাসরি ফেসবুকে দেখতে পাচ্ছি, কে কোথায় আছেন।’ তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের দায়িত্বশীলতা আরো বেড়েছে। সাংবাদিকতায় নৈতিকতার বিষয়টিও আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাক দায়িত্বশীলতা বজায় রেখেই এগিয়ে চলেছে। ’
ইউল্যাবের ভিসি অধ্যাপক এইচ এম জহিরুল হক বলেন, ‘উন্নয়নশীল বিশ্বে পত্রিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বাংলাদেশেও সংবাদপত্রের ভূমিকা রয়েছে। ষাট ও সত্তরের দশকে ইত্তেফাক পাকিস্তান সরকার বিরোধী আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রেখেছে। আমরা আজকের প্রেক্ষাপটেও দেখতে পাই অনেক ইতিবাচক সংবাদ ইত্তেফাকে পরিবেশিত হচ্ছে।’
সাংবাদিক আফসান চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস হচ্ছে দর কষাকষির ইতিহাস। সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং হচ্ছে সামাজিক গণমাধ্যম। কারণ পেশাদারি গণমাধ্যমগুলো এখন ব্রেকিং নিউজ দিতে পারছে না। নিউজ প্রথম প্রচার হচ্ছে সামাজিক গণমাধ্যমে। সামাজিক গণমাধ্যমের পাশাপাশি পেশাদারি গণমাধ্যমকে কিভাবে টিকে থাকতে হবে সেটা ভাবতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘৭০ এর নির্বাচনের পর মৌলিক পরিবর্তন আসলো। তখন শহরের পত্রিকা ছিল দৈনিক বাংলা; কিন্তু গ্রাম-শহর উভয় জায়গায় পৌঁছাত দৈনিক ইত্তেফাক। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের সব ধরনের মিডিয়া সম্পর্কে বুঝতে হবে। মানিক মিয়ার সময় ইত্তেফাক ছিল প্রিন্ট মিডিয়া, এখন সেটা অনলাইনেও আছে।’
বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় মানিক মিয়ার ভূমিকার বিষয়ে অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘মানিক মিয়া শক্তিশালী সাংবাদিক। তিনি পাকিস্তান আমলে যে সব কলাম লিখেছেন, তাতে তাকে সাহসী সাংবাদিক বলতেই হবে। সাংবাদিকতার ইতিহাস জানতে গেলে নতুন প্রজন্মকে এসব জানতে হবে। ’
সাহিত্যিক আন্দালিব রাশদী বলেন, ‘গণমাধ্যম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি মাধ্যম। এই ঝুঁকিটা সরকারের জন্য। ’
সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, ‘এই দেশের সাংবাদিকতার ইতিহাস থেকে ইত্তেফাক ও মানিক মিয়ার নাম বাদ দেওয়া যাবে না। আমরা যারা সাংবাদিকতা করি, তারা এই জায়গাটা মাথার উপরে রাখি। তিনি সংবাদপত্রের যে জায়গাটি তৈরি করে গেছেন, সেখানে দাঁড়িয়ে আমাদের সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে। তিনি ইত্তেফাকের সঙ্গে শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেন ও গোলাম সারওয়ারকেও স্মরণ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কোন মাধ্যমে আপনারা সাংবাদিকতা করবেন এবং সেই সাংবাদিকতায় আপনার দায়িত্বটা কি হবে। আমি যেহেতু প্রিন্ট মিডিয়ায় কাজ করি, সেকারণে আমি সেই মাধ্যমটির টিকে থাকা, ভালো থাকার কথা ভাবি। ’
সময় টিভির সিইও সাংবাদিক তুষার আবদুল্লাহ বলেন, ‘আগে ইত্তেফাকে কাজ করাটা ছিল সাংবাদিকদের স্বপ্ন। এখন সেই জায়গার পরিবর্তন হয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, প্রিন্ট বা ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এখন আর পাঠকদের বা দর্শকদের নতুন কিছু দিতে পারছে না। তিনি কিছুটা হতাশা থেকে বলেন, আমরা এখন আনুগত্যের সাংবাদিকতা করছি। ’
কর্মশালায় অতিথিরা শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্য রাখেন ইউল্যাবের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ডিন জুড উইলিয়াম। দৈনিক ইত্তেফাকের ৬৬ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের জন্য ‘সাংবাদিকতার উত্কর্ষে’ শিরোনামে কর্মশালার আয়োজন করে আসছে দৈনিক ইত্তেফাক। এরই ধারাবাহিকতায় আগামী ১১ ডিসেম্বর স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় মিলনায়তনে পরবর্তী কর্মশালা অনুষ্ঠিত হবে।

