সৌদি আরব কেবল একটি ধনাঢ্য দেশই নয়, ইহা ইসলাম ধর্মের আদিভূমি। গোটা ইসলামি দুনিয়ার জনগণ দেশটিকে এক ধরনের অভিভাবক বলিয়াও মনে করে। ফলে এই দেশটিতে জনগণের জন্য কোনো নূতন আদেশ-নির্দেশ আসিলে কেবল মুসলিম বিশ্বেই নহে, সারা বিশ্বের নজর পড়িয়া থাকে। যেমন সৌদি রাজ দরবারের এক ডিক্রি বা ফরমানের ব্যাপারে সব মহলের দৃষ্টি পড়িয়াছে। শুক্রবার রাজ দরবারের দেওয়া ডিক্রিতে বলা হইয়াছে, ২১ বত্সরের ঊর্ধ্বে সৌদি নারীরা অভিভাবকের অনুমোদন ছাড়াই পাসপোর্টের জন্য আবেদন করিতে পারিবেন এবং বিদেশ ভ্রমণ করিতে পারিবেন। কেবল তাহাই নহে, সৌদি নারীরা জন্ম, বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন করিতে পারিবেন।
নিঃসেন্দহে ইহা সৌদি নারীদের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন। আমরা জানি, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান যুবরাজ হিসাবে অভিষিক্ত হইবার পর কিছু সংস্কার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তাহার এই সংস্কারের পেছনে একটি যুক্তিসঙ্গত কারণ ছিল। তিনি যথার্থই ভাবিয়াছেন যে, শুধু তৈল সম্পদের ওপর নির্ভর করিয়া থাকিলে সৌদি আরব ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় পিছাইয়া পড়িবে। তাই তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে সৌদি অর্থনীতিকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার যোগ্য করিয়া তুলিতে সামাজিক সংস্কারের কথাও বিবেচনা করেন। সৌদি আরবের জনশক্তির মাত্র ২২ শতাংশ নারী। তিনি বুঝিতে পারিয়াছেন, এই জনশক্তিকে কাজে লাগাইতে হইলে ঘরে আটকাইয়া রাখা সমীচীন হইবে না। পক্ষান্তরে সৌদি আরবের নারী অধিকার লইয়া দীর্ঘদিন ধরিয়া আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলির চাপ রহিয়াছে। তাহারা অভিযোগ করিয়া আসিতেছে, সৌদি আরবের কঠোর অভিভাবকত্ব আইন দেশটির নারীদের কার্যত বন্দি করিয়া রাখিয়াছে। ফলে খানিকটা অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রয়োজনে, খানিকটা বিশ্বের অপরাপর দেশগুলির সহিত সৌদি আরবকে মানানসই করিয়া তুলিতে কিছু উদ্যোগ লওয়া হইয়াছে বলিয়া অনেকে মনে করেন। ইতিপূর্বে সৌদি আরবে স্টেডিয়াম নির্মাণ এবং স্টেডিয়ামে নারীদের সীমিত আকারে দর্শক হইবার অনুমতি দেওয়া হইয়াছে। সম্প্রতি নারীদের গাড়ি চালনার অনুমতিও দিয়া যুবরাজ সালমান আরও একটি চমক দিয়াছেন। ইহাও ঠিক যে, সৌদি সাংবাদিক জামাল খাশোগির নিহত হওয়া নিয়া পশ্চিমা বিশ্বের সহিত সৌদি রাজ পরিবারের, বিশেষ করিয়া ক্ষমতাশালী যুবরাজ সালমানের একটি শীতল সম্পর্ক চলিতেছে। শুক্রবারের আদেশ পশ্চিমাদের কিছুটা শান্ত করিবার পলিসিও হইতে পারে বলিয়াও অনেকে মনে করেন।
সে যাহাই হোক, যে উদ্দেশেই হোক, উদ্যোগটি যুগান্তকারী তাহাতে কোনো সন্দেহ নাই। অনেকেই মনে করেন যে, সৌদি আরবে যে কঠোর নিষেধাজ্ঞা রহিয়াছে, সেই তুলনায় ইহা পর্যাপ্ত নহে; কিন্তু এই শুরুটাই বা কম কীসে? সৌদি আরবের এই উদ্যোগের ফলে বহু নারী নিজেরা বহু অর্থনৈতিক উদ্যোগ লইতে পারিবেন। সৌদি আরবের সহিত বাংলাদেশের রহিয়াছে নিবিড় অর্থনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক। বাংলাদেশের অসংখ্য নারী সৌদি আরবে কাজ করিতেছেন। এই বর্তমান আদেশটির কিছু সুবাতাস তাহাদের গায়েও লাগিবে বলিয়া মনে হইতেছে।
