জয়া ফারহানা
বন্ধু দিবস নিয়ে পরস্পরবিরোধী বয়ান আছে। একপক্ষ মনে করেন দিনটি বিক্রি হয়ে গেছে কর্পোরেটদের কাছে। অন্যপক্ষের মতে, একটি দিনকে উপলক্ষ করে কেউ যদি বন্ধুদের স্মরণ করেন তাতে অসুবিধা কী? দুই পক্ষের কারো যুক্তিই উপেক্ষা করার নয়। মতান্তর যা-ই থাক বন্ধু দিবস কিছুটা হলেও আমাদের জনসংস্কৃতিতে প্রবেশ করেছে। বন্ধুত্বের আবেগ নিয়ে কর্পোরেট দুনিয়া মুনাফা করলেও এর জন্য আবেদনও তৈরি হয়েছে। শহুরে মধ্যবিত্ত বন্ধু দিবসের আবেগকে গ্রহণ করেছে। যে কারণে প্রতিবছরই দিনটির আয়োজনের পরিসর বাড়ছে। শহরের পরিধি ছাড়িয়ে বিশাল বাংলায় প্রবেশ করেছে বন্ধু দিবসের সংস্কৃতি। একই কারণে সংবাদ মাধ্যমের কাছেও একটি বিশেষ দিন বন্ধু দিবস। যে বিষয়টি বিপুল সংখ্যক মানুষ গ্রহণ করে সেখানে সংবাদ মাধ্যমকে উপস্থিত থাকতেই হয়। ভালোবাসা দিবস, বাবা দিবস, মা দিবস-এর সবই প্রতীচ্য থেকে এসেছে কিন্তু প্রাচ্য তা গ্রহণ করেছে। ভিন্ন সংস্কৃতির ভালো কিছু গ্রহণ করার মধ্যে ক্ষতি তো কিছু নেই। তাছাড়া নতুন প্রজন্ম এই দিনগুলোকে এতই সহজভাবে গ্রহণ করেছে, নিজেদেরও এই দিনগুলোর সঙ্গে এমনভাবে আত্মস্থ করে নিয়েছে যে চাইলেও এই সংস্কৃতি থেকে আর ফেরানো যাবে না তাদের। ফেরানোর খুব প্রয়োজনও আছে কি? কর্পোরেটায়ন নিয়ে আমাদের যত অভিযোগই থাক বন্ধু দিবসে একটি হলুদ গোলাপ পেতে কার না ভালো লাগে? এমনকি তার চেয়েও সংক্ষিপ্ত আয়োজন ই-কার্ডও যদি পাঠায় তাও ভালো লাগে।
দুই.
তারাশঙ্কর লিখেছেন, সাত পা একসঙ্গে পথ হাঁটলে অবিচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব হয়। শার্ল বোঁদলেয়ারের মত আবার একেবারে বিপরীত। তিনি বলছেন, বন্ধুত্ব এমন একটি শব্দ যার অর্থ আমি আজ পর্যন্ত বুঝি নাই। আমাদের লোক সংস্কৃতিতে ‘প্রাণের বন্ধু’ ধারণাটি বেশ প্রবল। চোখের বালি, চোখের কাঁটা, মৌরি ফুল, শিউলি ফুল এসবই বন্ধুত্বের নাম। এসব বন্ধুত্ব কী এবং কেমন তার নানা ধারণা আমরা পাই সাহিত্য ও সংগীতে। চোখের বালি বিখ্যাত উপন্যাস। মৌরি ফুল নামে বিভূতিভূষণের অসাধারণ একটি ছোটোগল্প আছে। ‘কলিকাতার বউটি বলিল, এসো ভাই, আমরা একটা কিছু পাতাই। সুশীলা খুশি হইয়া বলিল, খুব ভালো ভাই। কী পাতাবো? আসতে আসতে নদীর ধারে মৌরি ফুল দেখলাম। এসো আমরা মৌরি ফুল পাতাই।’ বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের সেই মৌরি ফুলই আজকের রূপান্তরিত ফেসবুক ফ্রেন্ড। দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য যে একদমই কিছু নেই তাও নয়। সইয়ের একখানা চিঠির জন্য সুশীলার দীর্ঘ অপেক্ষা। ‘আচ্ছা, কতকাল হইল মৌরি ফুলের চিঠি আসে না! ডাকপিওন কি মৌরি ফুলের একখানা চিঠি দিয়ে যেতে পারে না? লাল চৌকা খাম, খুব বড় সোনার জল দেয়া আতর না কী যেন মাখানো..।’ এখন অপেক্ষার কষ্ট নাই। কেউ অনলাইনে হাজির হলেই কোনো না কোনো ভাবে বন্ধুর একটি প্রাথমিক খোঁজ পেয়েই যায়। এই দুই সংস্কৃতির কোনোটির প্রতি আমাদের বিশেষ কোনো পক্ষপাত বা বৈরী মনোভাব নেই। সময়ান্তরে বন্ধুত্বের রূপটি যে বদলে গেছে আমরা কেবল সেই পরিবর্তনটি দেখাতে চেয়েছি।
তিন.
বন্ধুত্ব বদলায়। শৈশবের বন্ধু মিলস অ্যান্ড বুনস কিংবা হ্যারি পটার কৈশোরে বদলে যায়। একসময় অনেক কিশোরের প্রিয় বন্ধু ছিল সুকুমার রায়ের জিনিয়াস পাগলা দাশু, সত্যজিত রায়ের ফেলুদা, তিন গোয়েন্দার মুসা, রবিন, কিশোর। লরা ঈঙ্গলস ওয়াইল্ডারের লরাও কি কম প্রিয় কৈশোরে? তারুণ্যের বন্ধু মাসুদ রানা, ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ড। এখন বোধহয় এই হিসেব বদলে গেছে। ‘শুধু তোমার বাণী নয় গো হে বন্ধু হে প্রিয়, মাঝে মাঝে প্রাণে তোমার পরশখানি দিও’। কেবল বাণী নয়, মাঝে মাঝে বন্ধুর পরশ বা স্পর্শ পাওয়ার অর্থাত্ সরাসরি দেখা হওয়ার যে দাবি, স্যাভিটেকের এই সময়ে তা প্রায় উপেক্ষিতই। এখন বন্ধুদের বাণী নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হবে। সেই বাণী আসবে ফেসবুকে লাইক কমেন্ট শেয়ার হয়ে। তারপরও বন্ধুত্ব অমল। রাগের মধ্যে যেমন মিঞা মল্লার শ্রেষ্ঠ রাগ, সম্পর্কের মধ্যে তেমন বন্ধুত্ব।
চার.
‘বন্ধুত্ব দুটি দেহে এক আত্মা’—এই কথা এত বেশি শোনা যায়, মনে হয় বন্ধুত্ব বুঝি কোনো পরাবাস্তব বা যাদুবাস্তব সম্পর্ক। যেন দোষ-গুণ মিলিয়ে দুজন মানুষ নয়, দেবতা ফেরেশতা বা অবতারদের কথা বলা হচ্ছে। আসলে কোনো সম্পর্কই নিঃস্বার্থ, নির্মোহ, অনড় স্থায়ী নয়, এই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে কষ্ট কমে। সময়ান্তরে বন্ধু শত্রুতে রূপান্তরিত হওয়ার অসংখ্য উদাহরণ আছে কি না, তাই বলা। যে সম্পর্কে আবেগ থাকে সে সম্পর্কের উত্থান-পতনও থাকে। থাকে মতান্তর, মন্বন্তর। আবার বিপরীত মতাদর্শ বা বিপরীত বৈশিষ্ট্যের দীর্ঘমেয়াদি বন্ধুত্বের উদাহরণও আছে। নানা কারণে বন্ধুত্ব বদলে যায়। এই বদলও বহু বিচিত্র এবং অবিশ্বাস্য।
পাঁচ.
এক দেশে ছিল এক চাষি। একদিন চাষি যখন রাস্তা দিয়ে একা হেঁটে যাচ্ছে তখন একই রাস্তায় তার সঙ্গে দেখা সূর্য, ঠান্ডা ও বাতাসের সঙ্গে। এই তিন জনকে পেরিয়ে যাওয়ার সময় চাষি বলল, স্বাগতম। এরপর শুরু হলো ঠান্ডা, সূর্য ও বাতাসের ঝগড়া। ঠান্ডা বলল, বলো তো, চাষি কার কুশল জানতে চেয়েছে? সূর্য বলল, অবশ্যই আমার। কারণ আমি তাকে কখনো বেশি তাপ দিই না যাতে তার কষ্ট হয়। বাতাস বলল, কখনো না, চাষি আমার খবরই জানতে চেয়েছে। কারণ আমি সবসময় তাকে বাতাস দিয়ে শান্তি দিই। অনেক ঝগড়ার পর তারা সিদ্ধান্ত নিলো চাষির কাছেই জিজ্ঞেস করবে। ঠান্ডা বলল, তুমি আমাকে নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি। আমিই তোমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমি তোমাকে রোদের তাপ থেকে বাঁচাই। সূর্য বলল, আমিই তোমার সবচেয়ে ভালো বন্ধু। আমি তোমাকে শীতে ঠান্ডা থেকে বাঁচাই। চাষি বলল, আমি জানতে চেয়েছি বাতাসের কুশল। বাতাস বলল, কোনো ভয় নেই বন্ধু। তুমি নির্ভয়ে থাকো। বাতাস ছাড়া ঠান্ডা আসবে কোথা থেকে? সূর্যের তাপ থেকেই বা রেহাই মিলবে কীভাবে?
ছয়.
বাঙালি বন্ধু চিনতে অপারগ কিনা ভাবা দরকার। ১৯৬৯ সালে শেখ মুজিবকে বাঙালি তাদের সবার বন্ধু বঙ্গবন্ধু বলে স্বীকার করে আবার তাকেই হত্যা করলো মাত্র ছয় বছরের মাথায়। সেই নিষ্ঠুর রাতে যে কাপুরুষ-কুলাঙ্গাররা তাকে হত্যা করতে গিয়েছিল তিনি তাদের প্রত্যেককে নাম ধরে ডেকেছিলেন। এদের কেউ কেউ সারাদিন তার বাড়িতে থাকত, খেত এবং ছদ্মবন্ধুর বেশে চারপাশে ঘুরে বেড়াত। কী ভয়ংকর! আগস্ট নির্মম মাস। আগস্ট তাই প্রকৃত বন্ধু চিনে নেয়ারও মাস।
n লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক
