দেশের নারী ফুটবলে এখন বড় নাম আলপি আক্তার। ছিপছিপে গড়নের এই ফুটবলার যেখানেই যাচ্ছেন গোলের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। ছোট মানুষ, কিন্তু কাজ বড়। নেপালের পোখারায় অনূর্ধ্ব-১৯ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশ রানার্স আপ হয়ে ফিরেছে। সাফের লড়াইয়ে বাংলাদেশের ১৮ গোলের মধ্যে সাত গোলই আলপির নামে লেখা। এর মধ্যে হ্যাটট্রিক রয়েছে, ম্যাচ সেরা পুরস্কারও পেয়েছেন। এবার অনূর্ধ্ব-১৯ সাফে আলপি আক্তার, টুর্নামেন্ট সেরা পুরস্কার এবং সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার ও পেয়েছেন তিনি। দুই হাতে দুই পুরস্কার। ভার অনেক বেশি হলেও মনের ভেতরের ভারটাই বেশি ছিল।
শনিবার নেপালে অনুষ্ঠিত ফাইনালে ভারতের কাছে ৪ গোল হজম করার কথা ভুলতে পারছেন না পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দাঁড়িপাড়া গ্রামের মেয়ে আলপি। কদিন আগে ফুটসাল চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেশে ফিরেছেন আলপির প্রিয় ফুটবলার সাবিনা খাতুন। সেই রেশ থাকতে থাকতে আরেকটা ট্রফি নিয়ে যদি দেশে ফেরা যায় দেশের সাধারণ মানুষ আলপিদেরকে আরও বেশি সম্মান জানাত। বাফুফের কর্তারাও দারুণ খুশি হত। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। ভারতের কাছে কীভাবে ৪ গোল হজম করেছেন তা এখনো বুঝে উঠতে পারছেন না।
বোদা পাইলট গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে আলপি এসএসসি পরীক্ষা দেবেন, এই স্কুল থেকেই হয়ে বঙ্গমাতা ফুটবলে খেলে সবার নজর কেড়েছিলেন আলপি। ২০২৪ নারী লিগে সিরাজ স্মৃতি সংসদের হয়ে খেলেছেন, ১১ গোল করেছিলেন। সেখান থেকেই তার ওপর নজর। এরপর ঢাকায় ট্রায়াল অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল দলে খেলার সুযোগ পেয়ে যান আলপি।
আলপির খেলোয়াড়ি জীবনটা গল্পের মতোই। ফুটবল খেললেও তিনি এর আগে অনেক ধরনের খেলাই খেলেছেন। এর মধ্যে অন্যতম অ্যাথলেটিকস। অ্যাথলেটিকসের নানা ইভেন্টে খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাজশাহীর হয়ে অ্যাথলেটিকসে খেলে পদকও জয় করেছেন। ফুটবলে ছিলেন গোলরক্ষক। কিন্তু তাকে স্ট্রাইকার হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার টু স্টার ফুটবল ক্লাবের মোফাজ্জল হোসেন বিপুল। এই একাডেমি হতে শান্তি মারডি ও তৃষ্ণা রানীও উঠে এসেছেন, তারা এখন অনূর্ধ্ব-১৯ সাফে খেলেছেন। আলপি যখন প্রাথমিকের শিক্ষার্থী তখন মাঠে তার খেলা দেখে বিপুল নিজের একাডেমিতে নিয়ে আসেন। তার পর অনেক পথ পাড়ি দিয়ে আলপি এখন বাফুফের বেতনভুক্ত ফুটবলার। নতুন যে চুক্তি হতে যাচ্ছে সেখানে আলপির নামও রয়েছে। মাসে বেতন পাবেন, পরিবারের জন্য এটাই বড় খবর।
এবারের নারী লিগের আলপি ২৫ গোল করেছেন, আবারও সবার নজর কেড়েছেন। রাজশাহী স্টারস এফসির হয়ে খেলছেন তিনি। ফুটবলে আরও উপরে উঠার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন, অথচ এই পথ আসতে তার অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। খেলা যাবে না, পদে পদে বাধা এসেছে। আলপির বাবা আতাউর রহমান একজন চা দোকানি। এখান থেকেই সংসার চলে। আলপি খেলাধুলা করেন বলে বাবাকে নানা কথা শুনতে হয়েছিল।
আলপি ফুটবলে দ্যুতি ছড়িয়েছেন, সেটি সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়েছে। এসবই গ্রামের সমালোচকরা দেখেছেন। এখন আলপির পরিবারকে সেই কথাগুলো আর শুনতে হয় না। সবাই আলপির খোঁজ নেয়। বিদেশের মাঠে আলপি খেলতে যান। কিন্তু টিভিতে দেখার সুযোগ হয় না। মোবাইলে দেখতে হয়। আলপির খেলা থাকলে তার গ্রামের সবাই মোবাইল ফোনে ব্যস্ত থাকেন। কারণ আলপি এখন তার গ্রামের গৌরব।

