ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে ৪০০ পোশাক কারখানা

আপডেট : ০৩ আগস্ট ২০১৯, ২২:০৭

বাংলাদেশে গার্মেন্টস কারখানা সংস্কার ইস্যুতে ইউরোপের ক্রেতাদের পরিদর্শন জোট অ্যাকর্ডের সঙ্গে ফের মালিকপক্ষের বড়ো আকারে বিরোধ দেখা দিয়েছে। কারখানার সংস্কার প্রক্রিয়ার শেষ পর্যায়ে এসে টেস্টিং কমিশনিংয়ের (চূড়ান্ত পরীক্ষা) নামে নতুন নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন মালিকপক্ষ। বিশাল বিনিয়োগের পর নতুন করে ফের শর্ত জুড়ে দেওয়ায় কারখানা মালিকরা বিপাকে পড়েছেন। অনেক কারখানা সংস্কার সম্পন্ন করার পরও অ্যাকর্ড সনদ দিচ্ছে না। উল্টো অনেক কারখানার সংস্কারে অগ্রগতি হয়নি বলে অ্যাকর্ডভুক্ত ব্র্যান্ডগুলোকে জানানো হচ্ছে। ফলে প্রায় ৪০০ কারখানার ব্যবসা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলশানে একটি হোটেলে অ্যাকর্ডের সঙ্গে কারখানার প্রতিনিধিদের এক কর্মশালায় এসব অভিযোগ তোলা হয়। দিনব্যাপী ঐ কর্মশালায় কারখানার প্রতিনিধি ছাড়াও পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ ও অ্যাকর্ডের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় অ্যাকর্ডের প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকেও তাদের কার্যক্রমের সমর্থনে বেশকিছু যুক্তি তুলে ধরা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কর্মশালার মধ্যেই এক সংক্ষিপ্ত সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএ সভাপতি ড. রুবানা হক অভিযোগ করেন, সমঝোতা (এমওইউ) অনুযায়ী যে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে      বিজিএমইএর সঙ্গে আলোচনা করার কথা থাকলেও তা মানছে না অ্যাকর্ড। বরং তারা এসব সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে নিচ্ছে। কারখানার সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করার আগে কোনো পরামর্শ করছে না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা লক্ষ্য থেকে অনেক দূরে চলে যাবো। আমরা বুঝতে চাই, তারা কী কারণে এসব করছে। একের পর এক সংস্কারের ক্ষেত্রে নতুন নতুন শর্ত আসতে থাকলে আগামী এক বছর নয়, আজীবনেও এই সংস্কার কাজ শেষ হবে না। এ পরিস্থিতিতে কারখানাগুলোকে নতুন কোনো যন্ত্রপাতি স্থাপনের শর্ত দেওয়ার আগে সমস্যা সমাধানে একটি কমিটি গঠন করা, নতুন করে কারখানার সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ না করার দাবি জানিয়েছেন তিনি। যদিও এ বিষয়ে অ্যাকর্ডের পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি বলে জানা গেছে।

এ সময় অ্যাকর্ডের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা স্টিফেন কুইন তাদের কার্যক্রমের পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন।

২০১৩ সালে রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর অ্যাকর্ড গঠন করা হয়, এরপর গত ছয় বছর ধরে ১ হাজার ৬০০ গার্মেন্টস কারখানা ভবনের কাঠামো, অগ্নি ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে সংস্কার কার্যক্রম তদারক করে আসছে। ৫ বছরের জন্য গঠিত হলেও মাঝে নানা টানাপোড়েনের পর উচ্চআদালত সময় না বাড়ানোর রায় দিলেও গত প্রায় ৩ মাস আগে উচ্চ আদালত বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়ে আরো প্রায় এক বছর কার্যক্রম চালানোর অনুমতি দেয় অ্যাকর্ডকে। এর ভিত্তিতে অ্যাকর্ডের কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে মালিকপক্ষ ও সরকারের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্বাক্ষর করে অ্যাকর্ড।

কারখানা মালিকরা জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে নতুন একটি প্রতিষ্ঠানকে সংস্কার কার্যক্রম পরীক্ষার জন্য নিয়োগ দেয় অ্যাকর্ড। এরপর থেকেই মূলত একের পর এক জটিলতা তৈরি হতে থাকে। বিজিএমইএর পরিচালক শরিফ জহির বলেন, আমরা এর আগে তাদের চাহিদা অনুযায়ী অগ্নি নিরাপত্তার এক ধরনের যন্ত্রপাতি আমদানি করে স্থাপন করলাম। এরপর নতুন করে বলা হলো, এটি হবে না। নতুন করে আবার অন্য যন্ত্রপাতি স্থাপন করতে হবে। এরফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি। এ সমস্যা বেশি হচ্ছে অগ্নি নিরাপত্তায়। এ কারণে কারখানাগুলোতে ভবনের কাঠামো ও বৈদ্যুতিক নিরাপত্তায় গড়ে ৯০ শতাংশের বেশি সংস্কার হলেও অগ্নি নিরাপত্তা অগ্রগতি মাত্র ৫৪ শতাংশ। তিনি বলেন, টেস্টিং কমিশনিংয়ে কারখানাগুলোকে নানা নতুন শর্ত দিয়ে আটকে দেওয়া হচ্ছে। আমরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছি। 

রুবানা হক অভিযোগ করে বলেন, শুরুতে নিয়ম ছিলো একটি কারখানার অগ্নিনির্বাপনের জন্য রিজার্ভারে ৫০ হাজার গ্যালন পানি থাকতে হবে। সে অনুযায়ী মালিকপক্ষ কাজ করেছে। এখন বলছে, না ৭০ হাজার লিটার থাকতে হবে। এটি আবার বহির্বিশ্বের ক্রেতাদের জানিয়ে বলা হচ্ছে, সংস্কার কম হয়েছে। ফলে তারাও এখন ঐ কারখানার সঙ্গে ব্যবসা করতে সাহস পাচ্ছে না।

পলমল গ্রুপের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, তাদের একটি কারখানা আমেরিকাভিত্তিক ক্রেতাদের জোট অ্যালায়েন্সের চাহিদা অনুযায়ী সব ধরনের সংস্কার শেষ করার পর সনদও পেয়েছে। কিন্তু ঐ কারখানাকে এখন স্থাপন করা যন্ত্রপাতি পরিবর্তনের জন্য বলা হচ্ছে।