জাপানের পার্লামেন্ট নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে দেশটির প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির ক্ষমতাসীন দল লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি)। প্রাথমিক ফলাফলের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির গণমাধ্যম এ তথ্য জানিয়েছে।
জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রীর অসাধারণ জনপ্রিয়তা এ বিজয়ের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেসের খবরে বলা হয়েছে। এর ফলে তিনি জাপানের নিরাপত্তা, অভিবাসনসহ বিভিন্ন নীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার সুযোগ পাবেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজয়ের পর রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এনএইচকে’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাকাইচি বলেন, তিনি জাপানকে শক্তিশালী ও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে যে নীতিমালাগুলো প্রয়োজন, সেগুলোর ওপর জোর দেবেন।
ভোট গণনার প্রাথমিক ফলের উদ্ধৃতি দিয়ে এনএইচকে জানায়, সোমবার সকাল পর্যন্ত তাকাইচির এলডিপি একাই ৩১৬টি আসন নিশ্চিত করেছে। এর ফলে দেশটির পার্লামেন্টের ৪৬৫ সদস্যের নিম্নকক্ষের ২৬১ আসনের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার যে সীমা রয়েছে, তা সহজেই অতিক্রম করেছে দলটি।
জাপানের দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের মধ্যে নিম্নকক্ষই বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন। ১৯৫৫ সালে দলটি প্রতিষ্ঠার পর এটিই তাদের সর্বোচ্চ আসনে জয় পাওয়ার রেকর্ড। এর আগে, ১৯৮৬ সালে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনের নেতৃত্বে দলটি ৩০০টি আসন জিতেছিল। নতুন মিত্র দল জাপান ইনোভেশন পার্টির অর্জিত ৩৬টি আসনসহ তাকাইচির ক্ষমতাসীন জোট মোট ৩৫২টি আসন পেয়েছে।
ফল ঘোষণার পর এলডিপির সদরদপ্তরে একটি বোর্ডে বিজয়ীদের নামের ওপর বড় লাল ফিতা লাগান তাকাইচি। এ সময় উপস্থিত দলীয় শীর্ষ নেতারা করতালির মাধ্যমে তাকে উৎসাহিত করেন।
উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকলেও তুলনামূলক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন নিম্নকক্ষে নির্বাচনের আগের অবস্থানের তুলনায় বড় অগ্রগতি তাকাইচিকে একটি ডানপন্থী কর্মপরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেবে। এই এজেন্ডার লক্ষ্য চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে জাপানের অর্থনীতি ও সামরিক সক্ষমতা জোরদার এবং একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করা।
তাকাইচি বলেন, নিজেদের নীতিগত লক্ষ্য দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিরোধী দলের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টাও করবেন তিনি। তার ভাষ্যে, ‘আমি নমনীয় থাকব।’
তাকাইচি জনপ্রিয় হলেও গত সাত দশকের বেশিরভাগ সময় জাপান শাসন করা এলডিপি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থায়ন ও ধর্মীয় কেলেঙ্কারি নিয়ে চাপের মধ্যে ছিল। ক্ষমতায় আসার মাত্র তিন মাস পরই তিনি রবিবার আগাম নির্বাচনের ডাক দেন।
জনপ্রিয় নেতা তাকাইচি
অতিমাত্রায় রক্ষণশীল হিসেবে পরিচিত তাকাইচি, অক্টোবর মাসে জাপানের প্রথম নারী নেত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। সে সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ‘কাজ, কাজ ও কেবল কাজই’ করবেন তিনি। তাকাইচির স্বতস্ফূর্ত কিন্তু কঠোর ভাবমূর্তি দেশটির তরুণদের মধ্যে সাড়া ফেলে। অনেক তরুণ বলেছেন, আগে তারা রাজনীতিতে তেমন আগ্রহী ছিলেন না, কিন্তু তাকাইচিকে সমর্থনে তারা দেশের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে আগ্রহী হয়ে উঠছেন।
ক্ষমতাগ্রহণের পরেই নির্বাচনের ডাক দিলেও জাপানের নতুন একটি মধ্যপন্থী জোট গঠন এবং কট্টর ডানপন্থীরা এতটাই বিভক্ত ছিল যে তারা কার্যকর চ্যালেঞ্জই জানাতে পারেনি। এলডিপির সাবেক জোটসঙ্গী, বৌদ্ধধর্ম সমর্থিত শান্তিপন্থী কোমেইতো এবং উদারপন্থী কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব জাপানকে নিয়ে গঠিত নতুন বিরোধী জোটের পাওয়া আসনসংখ্যা নির্বাচনের আগের তাদের সম্মিলিত ১৬৭ আসনের প্রায় অর্ধেকে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই নির্বাচনে তাকাইচির বাজি ছিল তার দল এলডিপির নতুন জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি (জেআইপি)।
বিতর্কিত নীতিমালা
তাকাইচি বলেছেন, জাপানে বিতর্কিত হিসেবে দেখা হয় এমন নীতিগুলোর জন্য তিনি সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছেন। তবে দেশের বিপুল সামরিক ব্যয়ের অর্থায়ন কীভাবে হবে, চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক উত্তেজনা কীভাবে কমানো যাবে—এসব বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আলোচনা এড়িয়ে গেছেন।
সিউলের ইওহা ওমেনস ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক লেইফ-এরিক ইজলি বলেছেন, ডানপন্থী অবস্থান নেওয়া সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া ও চীনকে ঘিরে যৌথ উদ্বেগের কারণে তাকাইচি দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে জাপানের যুদ্ধবাজ অতীতের কারণে জাপানের শান্তিবাদী সংবিধান সংশোধন বা সামরিক শক্তি আরও বাড়ানোর যেকোনো উদ্যোগে উদ্বিগ্ন হতে পারে সিউল।
তিনি বলেন, নির্বাচনি ভাষণে তাকাইচি উৎসাহের সঙ্গে ‘সংকট ব্যবস্থাপনা বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি’র জন্য সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। এর মধ্যে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার, প্রযুক্তি ও অন্যান্য শিল্পখাত শক্তিশালী করার মতো পদক্ষেপ অন্তর্ভুক্ত। তিনি অভিবাসন নীতিতেও কঠোর অবস্থান নিতে চান, যার মধ্যে বিদেশে সম্পত্তির মালিকদের জন্য কঠোর শর্ত আরোপ এবং প্রবাসীদের সংখ্যায় সীমা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
রিতসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক মাসাতো কামিকুবো বলেছেন, ‘রবিবারের নির্বাচন জাপানের রাজনীতিতে একটি সমস্যাসংকুল প্রবণতা তুলে ধরেছে, যেখানে নীতির বাস্তব ফলাফলের চেয়ে রাজনৈতিক টিকে থাকাই অগ্রাধিকার পায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকার যখনই প্রয়োজনীয় কিন্তু অজনপ্রিয় সংস্কার আনার চেষ্টা করে, তখনই পরবর্তী নির্বাচন সামনে এসে দাঁড়ায়।’
