কৃষকের গড়া পাঠাগার

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ২০:০২

 

মো. আমিরুজ্জামান

 

মাত্র ১৩ জন কৃষি শ্রমিকের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের টাকায় গড়ে ওঠা শ্রম কল্যাণ পাবলিক পাঠাগার। পাঠাগারটি আলোকিত করছে গ্রামের অসংখ্য মানুষকে। বর্তমানে পাঠাগারটির সদস্য বেড়েছে, বেড়েছে পাঠকের সংখ্যাও। পাঠাগারের সদস্যরা কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন। দরিদ্র শিক্ষার্থী এবং হতদরিদ্রদের আর্থিক সহযোগিতা, দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতা, অভিভাবক সমাবেশ, উঠোন বৈঠক, বাল্যবিয়ে রোধ, শতভাগ স্যানিটেশন, বৃক্ষরোপণ, মাদকমুক্তকরণে ভূমিকা রেখে দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন পাঠাগারের সদস্যরা।

নীলফামারী জেলা শহর থেকে প্রায় ৩৪ কিলোমিটার দূরে পাগলা পীর-জলঢাকা সড়কের গোড়গ্রাম বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে গ্রামীণ সড়ক ধরে একটু এগুলে শ্রম কল্যাণ পাবলিক পাঠাগার। এটি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম পূর্ব দলিরাম বড়বাড়ি এলাকায় অবস্থিত।

এলাকার উন্নয়নে ভূমিকা রাখার মনোবাসনায় একদল কৃষি শ্রমিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠার চিন্তা করেন। বড় বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় জায়গা আর অর্থ। সকলেই ছিলেন ছাত্র। পরিবারের ওপর নির্ভরশীল এসব ছাত্র মনোবল শক্ত করে পুরোদমে কৃষি কাজ শুরু করেন। ধান কাটা-মাড়াই, ক্ষেতের নিড়ানিসহ সব কৃষি কাজ করে অর্থ সংগ্রহ করেন। তারপর ৩০ কিলোমিটার দূরে রংপুর শহর থেকে কিনে আনেন কিছু জ্ঞানমূলক বই।

এলাকার সমাজ সচেতন মানুষ আনিছুর রহমান পাঠাগারের জন্য ৮ শতক জমি দেন। সেখানে যাত্রা শুরু করে এখন নিজেরাই জমি কিনে পাঠাগার স্থাপন করেছেন। এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বাঁশ দিয়ে নির্মাণ করা হয় বই রাখার র্যাক। অবশেষে সকল বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত সমাজ গড়ার প্রত্যয়ে ২০১০ সালের ১৮ জুন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক ফজলুল হকের হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে পাঠাগারটি। শ্রমের বিনিময়ে সমাজের কল্যাণ করার জন্য প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারের নাম রাখা হয় ‘শ্রম কল্যাণ পাঠাগার’।

সেভ দ্য চিলড্রেনের অর্থায়নে এ কেন্দ্রের শিশুদের হাতে ট্যাবও তুলে দেওয়া হয়েছে। ট্যাব দিয়ে অ্যাপসের মাধ্যমে বিনোদনে পড়াশোনা করছে তারা। কেউবা নাচের তালে ছড়া পড়ছে। সপ্তাহের প্রতি শুক্রবার সন্ধ্যায় পাঠাগারের সদস্যরা উপস্থিত হয়ে বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে নিজেরা আলাপ-আলোচনা করেন। পাঠাগারের নিয়মিত সদস্য সংখ্যা প্রায় ৩ শতাধিক। পাঠাগারে এ পর্যন্ত হাজারখানেক বই সংগৃহীত হয়েছে। টিনসেড ঘরে সদস্য ও পাঠকরা নিয়মিত পড়ছেন। আরডিআরএস এই পাঠাগারটিতে কারিগরী সাপোর্ট দিয়ে যাচ্ছে।

পাঠাগারের সভাপতি আর এম তৌফিকুল ইসলাম মিশুক বলেন, ‘১৩ জন কৃষি শ্রমিকের কষ্টার্জিত ১৩ হাজার টাকায় পাঠাগারের যাত্রা শুরু হয়। এরপর সকলের সহযোগিতায় পাঠাগারটি এই পর্যন্ত এসেছে। পাঠাগারে বই সঙ্কট, অবকাঠামো সমস্যা, রিডিং টেবিল, র্যাকসহ নানা সমস্যা রয়েছে। সকলের মতামতের ভিত্তিতে পাঠাগারের সকল কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ফলে এলাকা বাল্যবিয়ে, মাদক, অপরাধ কমানো সম্ভব হচ্ছে। দেরিতে হলেও মানুষ বুঝতে পারছেন।’

শ্রম কল্যাণ পাঠাগারের জামিয়ার রহমান লায়ন জানান, পাঠাগারটি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ৬টি উপ-কমিটি করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে অর্থ, শিল্পকলা, তথ্য ও যোগাযোগ, সমাজসেবা, ক্রীড়া ও নারী এবং শিশু অধিদপ্তর। এছাড়া কিছু যুবককে নিয়ে পাঠাগারের বাইরে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি ও অবক্ষয়ে গঠন করা হয়েছে যুব ফোরাম। ‘আমরাই পারি, আমরা পারবো, আলোকিত সমাজ গড়বো’—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে পাঠাগারের সদস্যদের অর্থে কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

এরইমধ্যে গ্রামের এই পাঠাগারটি খবর পৌঁছে গেছে দেশের বাইরেও। আমেরিকা, নেদারল্যান্ড, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদল শ্রম কল্যাণ পাঠাগারটি দেখে গেছেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধিদল অতিরিক্ত সচিবের নেতৃত্বে পরিদর্শন করেছেন এই পাঠাগারটি।