প্রাণিজগতের সুন্দর সাপ ‘নাগ-নাগিনী’

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ২০:০৬

নাগ-নাগিনী বলতে কোনো সাপ নেই, এই সুন্দরীকে সাপকেই বলা হয় নাগ-নাগিনী। এদের বিষ নেই। কুসংস্কার ও বিভিন্ন সিনেমায় সাপটিকে ভুলভাবে উপস্থাপনের কারণে মানুষের মনে ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে। সাপটিকে দেখলেই মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলছে। ফলে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে সাপটি

ইসমাইল মাহমুদ

 

‘নাগ-নাগিনী’ বা ‘কাল-নাগিনী’ বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত একটি সাপের নাম। এ সাপটি প্রাণিজগতের সবচেয়ে সুন্দর সাপগুলোর মাঝে অন্যতম। মূলত সিলেট অঞ্চলের চা বাগানে শতাধিক বছর আগে এ সাপ প্রচুর দেখা যেত। এখন সেই সময়ের তুলনায় শতকরা ১ ভাগও দেখা যায় না। যদিও এ সাপটিকে বর্তমানে দেশের বেশিরভাগ মানুষ বাস্তবে দেখেননি। তাতে কী? সাপটির নাম শোনেননি বা এ সাপের গল্প জানেন না এমন মানুষ দেশে পাওয়া দুরূহ ব্যাপার। সাপটি সম্পর্কে বিভিন্ন গল্প-উপন্যাস, সাপুড়ের চটকদার কথামালা সাধারণ মানুষের কাছে সাপটিকে পরিচিত করে তুলেছে। বাংলা সিনেমায় সাপটিকে নানাভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সাপটি নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নির্মিত হয়েছে বেহুলা-লখিন্দর, কাল নাগিনীর প্রেম, নাগ-নাগিনী, শিষনাগ, নাগিনী কন্যা, নাগ পূর্ণিমা, নাগ রানী, সতী নাগকন্যা, নাগমহল, নাগিনা, নাগজ্যোতি, নাচে নাগিন, রূপসী নাগিন ও নাগিনী সাপিনী এমন অসংখ্য সিনেমা।

সাপুড়েরা হাট-বাজারে এ সাপকে মারাত্মক বিষাক্ত একটি সাপ বলে পরিচয় করিয়ে দেন। গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সাপটিকে উড়ন্ত সাপ, উড়াল মহারাজ সাপ, সুন্দরী সাপ, কালসাপ ও কালনাগ বলে ডাকা হয়। বাংলা সিনেমায় কাল নাগিনী সাপের ভয়ঙ্কর রূপ দেখে আমাদের মনে একটা ভীতি কাজ করে। এ ভীতিটি হলো কাল নাগিনী মারাত্মক ভয়ানক একটি সাপ। আমাদের গ্রামবাংলায় এ সাপটিকে অলৌকিক ক্ষমতাধর সাপ বলে ভেবে থাকেন। প্রায় সব মানুষের ধারণা কাল নাগিনী সাপ দংশন করলে তাঁর আর রক্ষা নেই, মৃত্যু নিশ্চিত। আসলেই কী তাই? এসব আমাদের ভুল ধারণা। বাস্তবে কাল নাগিনী বা নাগ-নাগিনী বিষাক্ত কোনো সাপ নয়। এ সাপটির কোনো অলৌকিক ক্ষমতাও নেই।

কাল নাগিনীর ইংরেজি নাম Ornate Flying Snake। বাংলায় এ সাপটি উড়ন্ত সাপ, উড়াল মহারাজ, কাল নাগিনী, কাল নাগ, নাগিন নামে পরিচিত। আর হিন্দিতে সাপটির নাম ‘কালা জিন’। এর বৈজ্ঞানিক নাম-Crysopelea ornata। যার তিনটি সাবস্পিশিস রয়েছে। এরমধ্যে বাংলাদেশে যেটা পাওয়া যায় সেটা হচ্ছে C.o.ornatissima। সাপটির মূলত দুই ধরনের রঙ হয়ে থাকে। একটা সবুজাভ হলুদ, যার মাঝে ডোরা ডোরা রয়েছে। আরেকটি কালচে, যার মাঝে লালচে ও হলুদ ডোরা রয়েছে। পৃথিবীতে ৫ প্রজাতির উড়ন্ত সাপ রয়েছে, যারা উড়তে পারে। কাল নাগিনী এর ভেতর একটা। এ সাপটি আর্বোরিয়াল, তথা বৃক্ষবাসী। সাপটি এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে যেতে পারে, যাকে ‘গ্লাইডিং’ বলে। আর এই ব্যাপারটাকেই উড়ে যাওয়া বলা হয়। খাদ্য গ্রহণ, বৈশিষ্ট্য এবং চরিত্রগত কারণে উঁচু গাছের ডাল থেকে নিচু গাছের ডালে লাফ দিয়ে চলাফেরা করে সাপটি। এ সাপটির বিষক্রিয়া নেই। এদের বিষে কারো মৃত্যু হয়েছে এমন কোনো তথ্য নেই। শুধু কাল্পনিকভাবেই সাপটিকে বিষধর এবং বিভিন্ন গল্প-কাহিনিতে বিষধর সাপ হিসেবে একে উপস্থাপন করা হয়। ফলে ভয়ঙ্কর ধারণা থেকেই সাধারণ মানুষ যখনই সাপটিকে দেখে বিষাক্ত ভেবে মেরে ফেলে। তাই এ প্রকৃতির বন্ধু নাগ-নাগিনী সাপ দ্রুত কমে যাচ্ছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে আগামী এক দশক পর দেশে এ সাপটির কোনো অস্থিত্ব থাকবে না।

সিলেটের চা বাগানসহ বিভিন্ন এলাকায় এক সময় প্রচুর পরিমাণে এ সাপের দেখা মিললেও বর্তমানে খুব একটা দেখা যায় না। তবে গভীর বনাঞ্চলে এখনো এদের দেখা মেলে। নাগ-নাগিনী সাপটির দৈর্ঘ্য ১০০ থেকে ১৭৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। মাথা লম্বা ও চ্যাপ্টা এবং মুখের সামনের দিকে চৌকোণা আকৃতির। এরা সাধারণত পোকামাকড়, টিকটিকি, গিরগিটি, ব্যাঙ ও ছোট পাখি ইত্যাদি খেয়ে জীবন ধারণ করে। জুন ও জুলাই মাস এদের প্রজনন মৌসুম। প্রজননের সময়ে এরা সাধারণত ৬ থেকে ১২টি ডিম দেয়।

‘সাপ বেঁচে থাকুক আমাদের প্রয়োজনে’—শ্লোগান নিয়ে বাংলাদেশে সাপ নিয়ে মানুষকে সচেতন করতে কাজ করেছেন কামরুজ্জামান বাবু এবং প্রসেনজিত্ দেববর্মা। তারা বলেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষার জন্য সাপকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন। কিন্তু জীববৈচিত্র্যের  গুরুত্বপূর্ণ এ সাপটি নিয়ে রয়েছে আমাদের অজ্ঞতা। নাগ-নাগিনী বলতে কোনো সাপ নেই, এই সুন্দরীকে সাপকেই বলা হয় নাগ-নাগিনী। এদের বিষ নেই। কুসংস্কার ও বিভিন্ন সিনেমায় সাপটিকে ভুলভাবে উপস্থাপনের কারণে মানুষের মনে ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে। সাপটিকে দেখলেই মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলছে। ফলে দিনদিন হারিয়ে যাচ্ছে সাপটি। নাগ-নাগিনী বা কাল নাগিনী নাম দিয়ে এ সাপকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে এদের জীবন বিপণ্ন করে ফেলা হচ্ছে। এ সাপের বিষক্রিয়া নেই। এ সাপের কারণে কারো মৃত্যু হয়েছে এমন তথ্য নেই কারো কাছে।

সম্প্রতি শ্রীমঙ্গল পৌরসভার মেয়র মো. মহসিন মিয়ার বাসভবনের একটি কলাগাছে একটি নাগ নাগিনী সাপ দেখতে পেয়ে স্থানীয়রা বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে খবর দিলে তারা এসে সাপটি উদ্ধার করে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করে।