শিফারুল শেখ
যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ এখন পর্যন্ত শুল্ক আরোপের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো অর্থনীতির দুই দেশ পরস্পরের ওপর বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। তবে সবচেয়ে আঘাত এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন থেকে। গত জানুয়ারি মাস থেকে চীনের কয়েকশ পণ্যের বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধে দুই দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ‘এশিয়ান টাইগার’ নামে পরিচিত চার দেশ।
দেশগুলো হচ্ছে— তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়া। যুক্তরাষ্ট্র এবং চীন বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। দুইটি দেশের অর্থনীতি উন্নতি-অবনতির ওপর নির্ভর করে এর মিত্র কিংবা প্রতিবেশী দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি-অবনতি। চীনের অর্থনীতির ওপর বেশি নির্ভরশীল তাইওয়ান, হংকং, সিঙ্গাপুর এবং দক্ষিণ কোরিয়া।
ক্ষতিগ্রস্ত তাইওয়ান
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত তাইওয়ানে রপ্তানি আদেশ কমেছে ৪ দশমিক ৫ ভাগ যা ৩৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের সমান। গত আট মাস ধরে এই পরিস্থিতি অব্যাহত আছে। দুই দেশের বাণিজ্য যুদ্ধে সারা বিশ্বেই রপ্তানি আদেশ কমেছে। তাইওয়ানে সবচেয়ে বেশি কমেছে যন্ত্রপাতির রপ্তানি আদেশ যা ২২ দশমিক ৩ ভাগ, ইলেক্ট্রনিক্সের রপ্তানি আদেশ হ্রাস পেয়েছে ৪ দশমিক ৩ ভাগ। এক্ষেত্রে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ৬ দশমিক ৮ ভাগ বেড়েছিল। কিন্তু অন্যান্য ক্ষেত্রে অবনতি হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মূল ভূমি চীনের রপ্তানি আদেশ গত জুলাইয়ে ১৪ দশমিক ৬ ভাগ কমেছে যা আগের মাসে ছিল ১৩ দশমিক ৯ ভাগ। এই সময়ে ইউরোপ এবং জাপানিদের ক্রয়াদেশ যথাক্রমে কমেছে ৫ দশমিক ৩ ও ৭ দশমিক ৯ ভাগ। মূলত চীনের অর্থনৈতিক অবনতি হওয়ায় তাইওয়ানের এই পরিস্থিতি। স্ট্যান্ডার্ন্ড চার্টার্ড ব্যাংক জানিয়েছে, অর্থবছরের শুরুতে জিডিপি ছিল ২ দশমিক ৪ ভাগ যা এখন কমে ২ দশমিক ১ ভাগে দাঁড়িয়েছে।
কেমন আছে হংকং
তাইওয়ানের মতো হংকংও চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এক সময় বলা হতো চীনের অর্থনীতির ভাগ্যই বরণ করতে হয় হংকংয়ের অর্থনীতিকে। গত এপ্রিলে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, তাইওয়ানের রপ্তানির ৩৭ ভাগই গেছে চীন ও হংকংয়ে যেখানে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি মাত্র ১৩ দশমিক ৪ ভাগ। হংকংয়ের পরিস্থিতিও একই। কিন্তু হংকংয়ের শিল্প বিভিন্ন প্রকৃতির হওয়ায় কিছুটা পার্থক্য আছে তাইওয়ানের সঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে হংকংয়ে বাণিজ্য বিস্তার ঘটাচ্ছে চীন। তবে কিছু ক্ষেত্রে রপ্তানি কমায় হংকংয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে। স্ট্যান্ডার্ন্ড চার্টার্ড ব্যাংকের তথ্যানুসারে, হংকংয়ের প্রবৃদ্ধি ২ দশমিক ২ ভাগ থেকে কমে ১ দশমিক ৪ ভাগে এসে পৌঁছেছে।
ক্ষতির শিকার সিঙ্গাপুরও
সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি তাইওয়ান ও হংকংয়ের মতো চীনের ওপর ততটা নির্ভরশীল নয়; কিন্তু অঞ্চলগতভাবে চীনের প্রভাব সিঙ্গাপুরেও পড়েছে। চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় ধাপে সিঙ্গাপুরের প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ১ ভাগ বেড়েছে যা গত বছরে একই সময়ে বেড়েছিল ১ দশমিক ১ ভাগ। তেলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় এমন পণ্যের রপ্তানি গত মে মাসে ১৫ দশমিক ৯ ভাগ কমেছে যা এপ্রিলে কমেছিল ১০ ভাগ। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে সিঙ্গাপুর লাভবান হতে পারত; কিন্তু ব্রিটেনের অর্থনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের মতে, বিশ্বে চাহিদা কমে যাওয়ায় সেটা হয়নি। সিঙ্গাপুরের উত্পাদন শিল্প বর্তমান অর্থবছরের দ্বিতীয় ধাপে ৩ দশমিক ৮ ভাগ পড়ে গেছে যা প্রথম ভাগের চেয়ে ৬ ভাগ হ্রাস পেয়েছে। দেশটির শিল্প ও সেবা খাতের প্রবৃদ্ধিও কমেছে।
ভালো নেই দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনীতি
সিঙ্গাপুরের তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়ার অবস্থা আরো উদ্বেগের। দেশটির মূল রপ্তানি পণ্য তথ্য ও যোগাযোগ সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি। এক তথ্যে দেখা যায়, গত জুনে এ খাতে রপ্তানি কমেছে ২২ দশমিক ৪ ভাগ। গত বছরের নভেম্বর থেকে এই পরিস্থিতি অব্যাহত আছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্যযুদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার ইলেক্ট্রনিক চিপসের চাহিদা কমেছে। দেশটির পত্রিকা চোসান এলবো গত ১০ জুন এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দুই বৃহত্ দেশের অর্থনৈতিক যুদ্ধে কঠিন সময় পার করতে হচ্ছে দক্ষিণের কোম্পানিগুলোকে। চীনের হুয়াওয়ে নিষিদ্ধে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি কোম্পানিও কিছু ক্ষেত্রে বিপাকে পড়েছে। এমনকি এসব কোম্পানি যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে না চলে সেই ধরনের হুমকিও চীনের কাছ থেকে এসেছে।
