সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নে সাফল্য

আপডেট : ০৪ আগস্ট ২০১৯, ২১:২৯

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বিশ্বের উল্লেখযোগ্য আলোচিত বিষয়। আমাদের বিস্ময়কর জিডিপি প্রবৃদ্ধির পিছনে বন্দরসমূহের অবদান অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বিশেষ করিয়া এই দেশের উন্নয়নের এক সুবর্ণ রেখাচিত্র হইতেছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর। ইহা আমাদের প্রধান সমুদ্রবন্দর এবং গত এক দশকে এই বন্দরের প্রভূত উন্নয়ন হইয়াছে। মূলত চট্ট্রগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে ৩০ বত্সরব্যাপী মহাপরিকল্পনা গ্রহণের পর পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন হইয়াছে। বন্দর আইনের সংস্কার, প্রশাসনিক সংস্কার, বন্দর অটোমোশন, ভিটিএমআইএসের মাধ্যমে কর্ণফুলী চ্যানেলে জাহাজের চলাচল, ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে নূতন ইয়ার্ড নির্মাণ, নূতন নূতন প্রযুক্তির প্রচলন, মেরিন একাডেমির আধুনিকায়ন ইত্যাদি উদ্যোগের ফলে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে অভূতপূর্ব গতিময়তা ফিরিয়া আসিয়াছে। তাহারই প্রমাণ হইল শিপিং-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘লয়েডস লিস্ট’-এর সর্বশেষ স্বীকৃতি। লন্ডনভিত্তিক বিশ্বের সবচাইতে পুরাতন এই সাময়িকী গত বৃহস্পতিবার জানাইয়াছে যে, কনটেইনার উঠানামা ও প্রবৃদ্ধি বিবেচনায় বিশ্বের ১০০টি শীর্ষ সমুদ্রবন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান বর্তমানে ৬৪তম। গত বত্সর ২০১৮ সালে ইহার অবস্থান ছিল ৭০তম। এক বত্সরের ব্যবধানে এই ছয় ধাপ উন্নতি বাংলাদেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরও একটি স্মারক নিঃসন্দেহে।

২০০৯ সালে লয়েডস লিস্টের তালিকা অনুযায়ী বিশ্বের ১০০ সেরা বন্দরের তালিকায় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের অবস্থান ছিল ৯৮তম। এই হিসাবে এই সমুদ্রবন্দর গত ৯ বত্সরে ৩৬ ধাপ আগাইয়াছে। এই উন্নতির ফলে সারা বিশ্বে চট্টগ্রাম বন্দরের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হইতে উজ্জ্বলতর হইয়াছে। বিশ্বের শীর্ষ জাহাজ কোম্পানি ও কনটেইনার পরিবহন সংস্থাগুলো পণ্য পরিবহনে এই বন্দরকে বাছিয়া নিতেছে। গত বত্সর এই বন্দরে ২৯ লক্ষ ৩ হাজার একক কনটেইনার উঠানামা করিয়াছে। প্রবৃদ্ধির হার প্রায় ৯ শতাংশ। জার্মানির হামবুর্গ পোর্ট কনসাল্ট চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়নে যে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে, তাহাতে চট্টগ্রাম বন্দরের সব জেটি টার্মিনাল মিলাইয়া ২০১৯ সালে ২৬ লক্ষ ৬৬ হাজার একক এবং ২০২০ সালে ২৯ লক্ষ একক কনটেইনার উঠানামা করিবার কথা। কিন্তু দুই বত্সর আগেই আমরা সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করিতে সক্ষম হইয়াছি। লয়েডস লিস্ট প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী প্রথম ১০টি বন্দরের সাতটিই চীনের বন্দর। সুতরাং বন্দর ব্যবস্থাপনায় আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ চীনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানো যাইতে পারে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে ওভার ফ্লো ইয়ার্ড, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, বে টার্মিনালসহ অনেক প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এইগুলি চালু হইলে ২০২৫ সালের মধ্যে আমরা বিশ্বের শীর্ষবন্দরের তালিকায় ৫০তম স্থানের মধ্যে চলিয়া আসিতে সক্ষম হইব বলিয়া আশা করা যায়।

স্থল, নৌ, বিমান ও সমুদ্রবন্দর হইল একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে অন্যতম চালিকা শক্তি। শুধু চট্টগ্রাম বন্দরই নহে, সাম্প্রতিককালে আমাদের দ্বিতীয় সমুদ্রবন্দর মোংলারও ব্যাপক উন্নয়ন হইয়াছে। তাহার চাইতেও বড়ো কথা হইল, বাংলাদেশের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যের সম্প্রসারণে সরকার পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা সমুদ্রবন্দর নামে তৃতীয় ও নূতন একটি সমুদ্রবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নিয়াছে। ২০২৩ সালের মধ্যে ইহা একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হিসাবে পুরাদমে কাজ শুরু করিলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে শিল্পোন্নয়নের নূতন দিগন্ত উন্মোচিত হইবে। ব্লু-ইকোনমি বা সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা ও গুরুত্ব বাড়িবার কারণেও সমুদ্রবন্দরের উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা রহিয়াছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নতি ও সাফল্য লাভ সেই একই সূত্রে গাঁথা। সরকারের দূরদর্শী পদক্ষেপই এই উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করিতেছে।